‘আরে পেয়ে গেছিস! সাবাস!’ লাস্কার মুখ থেকে উষ্ণদেহী পাখিটাকে টেনে বের করে তাঁর প্রায় ভরে ওঠা ঝোলায় পুরতে পুরতে তিনি বললেন। হাঁক দিলেন, ‘পাওয়া গেছে, স্তিভা!’
ষোলো
লেভিন ঘরে ফেরার পথে কিটির অসুখ এবং শ্যেরবাৎস্কিদের পরিকল্পনার খুঁটিনাটি জিজ্ঞাসাবাদ করতে লাগলেন এবং যদিও ব্যাপারটা স্বীকার করতে তাঁর লজ্জা হচ্ছিল, তাহলেও যা জানলেন তাতে প্রীতি বোধ হল তাঁর। প্রীতি বোধ হল, কারণ এখনো তাহলে আশা আছে এবং আরো বেশি প্রীতিকর লাগল, কারণ তাঁকে যে অত কষ্ট দিয়েছে, নিজেই সে কষ্ট পাচ্ছে এখন। কিন্তু অব্লোন্স্কি যখন কিটির পীড়ার কারণ বলতে শুরু করে ভ্রন্স্কির নাম উল্লেখ করলেন লেভিন থামিয়ে দিলেন তাঁকে।
‘পারিবারিক খুঁটিনাটি জানার কোন অধিকার নেই আমার, আর সত্যি বলতে কি, আগ্রহই নেই।’
লেভিনের মুখের যে ভাবপরিবর্তন অব্লোন্স্কির অতি পরিচিত, মুহূর্তের মধ্যে যা তাঁর মুখকে করে তুলেছে ঠিক ততটাই বিমর্ষ যতটা প্রফুল্ল ছিল এক মিনিট আগেও, সেটা চোখে পড়তে প্রায় অলক্ষ্য একটা হাসি ফুটল অব্লোন্স্কির মুখে। লেভিন জিজ্ঞেস করলেন, ‘বনের ব্যাপারটা রিয়াবিনিনের সাথে একেবারে ঠিকঠাক করে ফেলেছ?’
‘হ্যাঁ, চুকিয়ে দিলাম। দাম চমৎকার, আটত্রিশ হাজার। আট হাজার অগ্রিম, বাকিটা ছয় বছরের কিস্তিতে। বহু ঝামেলা গেছে, এর চেয়ে বেশি আমাকে কেউ দিচ্ছে না।’
‘তার মানে, পানির দরে ছেড়ে দিলে’, লেভিন বললেন মুখ ভার করে।
‘পানির দরে কেন?’ ভালোমানুষি হাসি নিয়ে বললেন অব্লোন্স্কি, জানতেন যে এবার সবই বিছ্ছিরি লাগতে থাকবে লেভিনের।
‘কারণ, বনটার দাম দেসিয়াতিনা পিছু অন্তত পাঁচশ’ রুল’, লেভিন বললেন।
‘আহ্, গাঁয়ের যত ভদ্রলোক!’ অব্লোন্স্কি বললেন ঠাট্টার সুরে, শহুরে লোকদের কি যে ঘৃণা তোমাদের!… অথচ কাজের ব্যাপারে আমরা কিন্তু সব সময়ই ব্যবস্থা করি তোমাদের চেয়ে ভালো। বিশ্বাস কর, সব খতিয়ে দেখেছি’, তিনি বললেন, ‘বন বিক্রি হচ্ছে খুবই লাভে, বরং ভয়ই হচ্ছে আবার বেঁকে বসে। এ তো আর সরেস কাঠের বন নয়, সরেস কাঠ কথাটা দিয়ে লেভিনের সমস্ত সন্দেহের অসারতায় তাঁকে একেবারে নিশ্চিত করে তোলার আশায় তিনি বললেন, ‘এতে লাকড়ি কাঠের গাছই বেশি। দাঁড়াবে দেসিয়াতিনা পিছু তিরিশ সাজেনের (সাজেন—রাশিয়ায় প্রচলিত সাবেকী দৈর্ঘ্যের মাপ–২.১ মিটারের মত। এখানে লাকড়ি কাঠের ঘন সাজেনের কথা বলা হচ্ছে) বেশি নয়। অথচ ও আমাকে দিচ্ছে দুশ’ রুব্ল করে।’
লেভিন অবজ্ঞাভরে হাসলেন। ভাবলেন, ‘জানি, জানি, এ তো শুধু ওর একার চালিয়াতি নয়, সব শহুরেদেরই ও-ই, যারা গাঁয়ে আসে দশ বছরে বার দুয়েক, দুটো-তিনটা গ্রাম্য লব্জ নজরে পড়ায় প্রসঙ্গে-অপ্রসঙ্গে তা ব্যবহার করে একেবারে নিশ্চিত হয়ে ওঠে যে তারা সবই জানে। সরেস কাঠ, তিরিশ সাজেন দাঁড়াবে। যে সব শব্দ বলছে নিজেই তার কিছু জানে না।’
লেভিন বললেন, ‘তোমার দপ্তরে তুমি যা-সব লেখো তা আমি তোমাকে শেখাতে যাব না। দরকার পড়লে তোমার কাছেই পরামর্শ চাইব। অথচ তোমার একেবারে দৃঢ় বিশ্বাস যে বনের বিদ্যা তোমার সবই জানা। এ বিদ্যা সহজ নয়। গাছগুলো তুমি গুণে দেখেছ?’
‘গুণব কি করে?’ বন্ধুর খারাপ মেজাজ ভালো করে তোলার চেষ্টায় হেসে অব্লোন্স্কি বললেন, ‘যদিও সাগরের বালি, তারার ছটাও গুণে দেখতে পারে বড় দরের মাথা…’
‘হ্যাঁ, রিয়াবিনিনের বড় দরের মাথা তা পারে। আর তুমি যা দিচ্ছ তেমন পানির দরে না পাওয়া গেলে কোন বেনিয়াই গুনে না দেখে কিনবে না। তোমার বনটা আমার চেনা। প্রতি বছর শিকারে যাই ওখানে। তোমার বনের দাম নগদে পাঁচশ’ রুব্ল করে। আর তুমি দু’শ করে নিচ্ছ কিস্তিতে। তার মানে, তুমি ওকে দান করছ তিরিশ হাজার।’
‘নাও বাপু, তেতে উঠো না’, করুণ স্বরে বললেন অব্লোন্স্কি, ‘আর কেউ অত দিল না কেন?’
‘কারণ অন্য বেনিয়াদের সাথে ও রফা করে নিয়েছে, ঘুষ দিয়েছে। ওদের সকলের সাথেই আমার কাজকর্ম ছিল রে, চিনি ওদের। এরা তো আর কারবারী নয়, মুনাফাখোর। যাতে শতকরা দশ, পনের পাওয়া যাবে তাতে সে হাত দেবে না। ও আছে বিশ কোপেকে এক রুব্ল কেনার ধান্ধায়।’
‘নাও, হয়েছে! মেজাজ তোমার খারাপ। ‘
‘এতটুকু নয়’, বাড়ির কাছে আসতে আসতে লেভিন বললেন মুখ ভার করে
গাড়ি বারান্দার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল লোহা আর চামড়ার বেড়ে আঁট করে বাঁধাই একটা গাড়ি, তাকে চওড়া বেল্টে কষে জোতা হৃষ্টপুষ্ট একটা ঘোড়া। গাড়িতে বসে ছিল টেনে কোমরবন্ধ আঁটা রক্তোচ্ছ্বাসে রাঙা-মুখ গোমস্তা, যে রিয়াবিনিনের কোচোয়ানের কাজও করত। রিয়াবিনিন নিজে ছিল বাড়ির ভেতরে, বন্ধুদ্বয়ের সাথে তার দেখা হল প্রবেশকক্ষে। লোকটা মাঝবয়সী, ঢেঙা, রোগাটে, কামানো থুতনিটি সুপ্রকট, ফুলো ফুলো ঘোলাটে চোখ। পরনে তার লম্বা নীল ফ্রক-কোট, বোতাস নেমেছে পাছারও নিচে, পায়ে গোড়ালির কাছে কোঁচকানো, পায়ার ডিমের কাছে সটান হাইবুট, তার ওপর চড়িয়েছেন বড় বড় গালোশ। রুমাল দিয়ে গোটা মুখখানা মুছে, ফ্রক-কোট ঝাড়া দিয়ে, যা এমনিতেই বেশ সঠিক ছিল, হেসে অভিনন্দন জানালেন ওঁদের দুজনকে, অব্লোন্স্কির দিকে এমনভাবে হাত বাড়িয়ে দিলেন যেন কিছু একটা ধরতে চাইছেন।
