‘কি কাণ্ড! এর মধ্যেই কোকিল।’ ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসে বললেন অব্লোন্স্কি।
‘হ্যাঁ, শুনছি’, নিজের কানেই যা খারাপ লাগছে, নিজের সে কণ্ঠস্বরে বনের নীরবতা ক্ষুণ্ণ হওয়ার বিরক্তির সাথে বললেন লেভিন, ‘আর দেরি নেই।’
অব্লোন্স্কির মূর্তি আবার অদৃশ্য হল ঝোপের পেছনে। লেভিনের চোখে পড়ল কেবল একটা দেশলাইয়ের কাঠির আগুন, তারপর জ্বলন্ত সিগারেটের লাল ঝলক, নীলাভ ধোঁয়া।
খট! খট! শব্দ করল অব্লোন্স্কির ট্রিগার।
‘কি ওটা ডাকছে?’ টানা একটা আওয়াজের দিকে লেভিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে অব্লোন্স্কি বললেন। যেন খেলা করতে করতে চিহিহি করে ডাকছে কোন ঘোড়ার বাচ্চা।
‘জান না? ও হল গিয়ে মর্দা খরগোশ। যাক, আর কথা নয়! শুনছ, উড়ে আসছে!’ ট্রিগার ঠিক করে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন লেভিন।
শোনা গেল দূর থেকে ভেসে আসা মিহি শিস, আর শিকারীদের কাছে যা খুব পরিচিত, তেমনি মাপা তালে দ্বিতীয়, তৃতীয়, আর তৃতীয় শিসের পর শোনা গেল কোঁকোঁ ডাক।
লেভিন ডানে-বাঁয়ে চোখ ফেরালেন, তারপর ঠিক সামনে ঝাপসা নীল আকাশের পটে অ্যাম্পেন গাছগুলোর চূড়ায় উদ্গত কোমল অংকুরের ওপরে দেখা দিল উড়ন্ত পাখি। উড়ে আসছিল সে সোজা লেভিনের দিকে। কাছেই খাপী কাপড় ছেঁড়ার মত সমতাল আওয়াজ শোনা গেল কানের ওপরেই; বেশ দেখা যাচ্ছিল পাখিটার লম্বা ঠোঁট আর গ্রীবা, এদিকে লেভিন যখন তাক করছেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই যে ঝোপের পেছনে অব্লোন্স্কি দাঁড়িয়ে ছিলেন সেখান থেকে ঝলকাল লাল বিদ্যুৎ; পাখিটা তীরবেগে পড়তে পড়তে আবার উঠে গেল। আবার বিদ্যুৎ ঝলক দিল শোনা গেল গুলির শব্দ; ডানা নেড়ে যেন বাতাসে ভেসে থাকবার চেষ্টায় পাখিটা এক মুহূর্ত থেমে রইল, তারপর ধপ করে পড়ল প্যাচপেচে মাটিতে।
‘ফসকে গেল নাকি?’ অব্লোন্স্কি চেঁচিয়ে উঠলেন, ধোঁয়ার জন্য কিছুই দেখা যাচ্ছিল না।
‘এই যে!’ লাস্কাকে দেখিয়ে লেভিন বললেন। একটা কান খাড়া করে ফুঁয়ো ফুঁয়ো লেজের ডগাটা উঁচিয়ে নাড়তে নাড়তে লাস্কা মৃদু পদক্ষেপে, যেন পরিতৃপ্তিটা দীর্ঘায়ত করার বাসনায় নিহত পাখিটাকে নিয়ে আসছিল মনিবের কাছে যেন হাসি ফুটেছে মুখে। ‘যাক, তুমি পারলে বলে আনন্দ হচ্ছে, লেভিন বললেন, তবে স্নাইপটাকে তিনি শিকার করতে পারলেন না বলে ঈর্ষাও হচ্ছিল তাঁর।
‘ডান নলটার গুলি ফসকে যায় বিছ্ছিরি ভাবে’, বন্দুকে টোটা ভরে অবলোন্স্কি বললেন, ‘শ্শ্… উড়ে আসছে।’
সত্যিই শোনা গেল কর্ণভেদী, একের পর এক দ্রুতসঞ্চারী শিস। দুটো স্নাইপ কোঁকোঁ না করে শুধু শিস দিয়ে খেলতে খেলতে এ ওর পাল্লা ধরে উড়ে গেল শিকারীদের একেবারে মাথার ওপর দিয়ে। চারটা গুলির শব্দ উঠল, স্নাইপরা ঝট করে সোয়ালোর মত বাঁক নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
.
চমৎকার পাখি পাওয়া যাচ্ছিল। অব্লোন্স্কি আরো দুটোকে মারলেন, লেভিনও দুটো, তার একটাকে খুঁজে পাওয়া গেল না। অন্ধকার হয়ে এল। পশ্চিম আকাশের নিচুতে ঝকঝকে রূপালি শুকতারা বাচগাছগুলোর পেছন থেকে কোমল জ্যোতিতে আলো দিতে থাকল, আর পুবে বিমর্ষ আর্কতুরাস ঝলমল করে উঠল তার রক্তিম আগুনে। লেভিন তাঁর মাথার ওপর সপ্তর্ষিমণ্ডলের তারাগুলোকে কখনো ঠাহর করতে পারছেন, কখনো আবার তা হারিয়ে যাচ্ছে। স্নাইপগুলো আর উড়ে আসছে না এখন; কিন্তু লেভিন স্থির করলেন, বার্চের ডালগুলোর নিচে যে শুকতারাটা দেখা যাচ্ছে, তা ওপরে না উঠে আসা পর্যন্ত এবং সপ্তর্ষি আরও স্পষ্ট না হয়ে ওঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। ডালগুলোর ওপরে উঠে এল শুকতারা, সপ্তর্ষির রথ স্পষ্ট হয়ে উঠর কালচে-নীল আকাশে, কিন্তু লেভিন তবুও দাঁড়িয়ে রইলেন।
‘এবার ফিরলে হয় না?’ বললেন অব্লোন্স্কি।
বন ততক্ষণে নিঝুম হয়ে এসেছে, একটা পাখিরও নড়াচড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে না।
লেভিন বললেন, ‘আরো একটু থেকে যাই।’
‘তোমার যা ইচ্ছে।’
ওঁরা দাঁড়িয়ে ছিলেন পনের পা দূরে।
হঠাৎ লেভিন বললেন, ‘স্তিভা, তোমার শালী বিয়ে করল, নাকি করবে, কিছুই বলছ না যে?’
লেভিন নিজেকে এতটা শক্ত আর সুস্থির বোধ করছিলেন যে কোন জবাবেই তিনি বিচলিত হবেন না বলে তাঁর ধারণা ছিল। কিন্তু অব্লোন্স্কি যা বললেন সেটা তিনি আদৌ ভাবতে পারেননি।
‘বিয়ে করার কথা ভাবেওনি, ভাবছেও না। খুবই অসুস্থ, ডাক্তাররা তাকে বিদেশে পাঠিয়েছে। এমন কি প্রাণের আশংকাও করছেন তাঁরা।’
‘বলছ কি!’ চেঁচিয়ে উঠলেন লেভিন, ‘খুবই অসুস্থ? কি হয়েছে? কেমন করে সে?…’
ওঁরা যখন এই কথা বলছিলেন লাস্কা কান খাড়া করে প্রথমে তাকাল আকাশে, তারপর ভর্ৎসনার দৃষ্টিতে ওঁদের দিকে।
লাস্কা ভাবছিল, ‘গল্প করার খুব সময় পেলে যা হোক। ওদিকে পাখিটা উড়ছে… হ্যাঁ, ওই তো। ফস্কে যাবে…. ‘ কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই দুজনেই শুনতে পেল তীক্ষ্ণ একটা শিস, যেন কেউ চড় মারল কানে, দুজনেই হঠাৎ বন্দুক চেপে ধরল, একই সাথে দুটো ঝলক, দুটো গুলির শব্দ। উঁচুতে উড়ন্ত স্নাইপ মুহূর্তে ডানা গুটিয়ে সরু সরু কিশলয় পিষ্ট করে পড়ল ঝোপে।
‘চমৎকার! দুজনের মার।’ চেঁচিয়ে উঠে লেভিন লাস্কার সাথে ছুটলেন ঝোপের মধ্যে পাখিটাকে খুঁজতে। ও হ্যাঁ, খারাপ লাগছিল কেন?’ মনে পড়ল তাঁর। ‘হ্যাঁ, কিটি অসুস্থ… কি করা যাবে, খুবই দুঃখের কথা’, তিনি ভাবলেন।
