‘কস্তিয়া, বলে দাও তো, রিয়াবিনির বেনিয়া যদি আসে—আমি ওকে আসতে বলেছি আজ—তাহলে ওকে যেন বসিয়ে অপেক্ষা করতে বলা হয়।’
‘তুমি বন বিক্রি করছ রিয়াবিনিনকে ‘
‘হ্যাঁ, ওকে তুমি চেনো নাকি?’
‘চিনব না কেন। ওর সাথে ‘উত্তম আর চূড়ান্ত’ একটা কাজ ছিল আমার।’
অব্লোন্স্কি হেসে ফেললেন। ‘উত্তম আর চূড়ান্ত’ ছিল বেনিয়াটির প্রিয় বুলি।
‘হ্যাঁ, কথা ও বলে আশ্চর্য হাস্যকরভাবে। বুঝেছে যে মনিব কোথায় যাচ্ছে!’ লাস্কার পিঠ চাপড়ে লেভিন যোগ করলেন, কুকুরটা গোঁ-গোঁ করে ঘুরঘুর করছিল লেভিনের কাছে, কখনো তাঁর হাত, কখনো বুট, কখনো বন্দুকটা চাটছিল।
ওঁরা যখন বেরোলেন, গাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল বারান্দার কাছে।
‘গাড়ি জুততে বলেছিলাম যদিও বিশেষ দূর নয়। নাকি পায়ে হেঁটেই যাব?’
অব্লোন্স্কি গাড়ির দিকে যেতে যেতে বললেন, ‘না, গাড়িতেই যাওয়া যাক।’ গাড়িতে উঠে বাঘের চামড়ার কম্বলে পা ঢেকে চুরুট ধরালেন তিনি, ‘কেন যে চুরুট খাও না! চুরুট—এ শুধু তৃপ্তিই নয়, এ হল পরিতৃপ্তির পরাকাষ্ঠা আর লক্ষণ। একেই বলে জীবন! কি সুন্দর! ঠিক এভাবেই আমার বাঁচার সাধ!
লেভিন হেসে বললেন, ‘কিন্তু বাধা দিচ্ছে-টা কে?’
‘নাঃ, তুমি সুখী লোক। তুমি যা ভালোবাসো, সবই তোমার আছে। ঘোড়া ভালোবাসো, তা আছে, কুকুর—তাও আছে, শিকার—আছে, চাষবাস—তাও রয়েছে।’
‘বোধ হয় সেটা এজন্য যে আমার যা আছে তাতেই আমার আনন্দ যার নেই তা নিয়ে গুমরে মরি না’, লেভিন বললেন কিটির কথা মনে করে
অব্লোন্স্কি বুঝলেন, তাকিয়ে দেখলেন তাঁর দিকে, কিন্তু কিছুই বললেন না।
শ্যেরবাৎস্কিদের কথা উঠবে বলে লেভিন ভয় পাচ্ছেন এটা লক্ষ্য করে অবলোন্স্কি তাঁর বরাবরের মাত্রাবোধে সে নিয়ে কিছুই বললেন না দেখে লেভিন কৃতজ্ঞ বোধ করেছিলেন তাঁর প্রতি; কিন্তু যা তাঁকে অত কষ্ট দিয়েছিল, সেটা এখন জানার ইচ্ছে হচ্ছিল তাঁর, তবে তা বলার সাহস হল না।
তা তোমার ব্যাপার-স্যাপার এখন কেমন?’ শুধু নিজের কথা ভাবা তাঁর পক্ষে কত খারাপ, সে কথা ভেবে লেভিন বললেন।
অব্লোন্স্কির চোখ আমোদে চকচক করে উঠল। ‘তুমি তো মানো না যে পেট ভরা থাকলেও আরো একটা মিষ্টি রুটির লোভ সম্ভব; তোমার মতে এটা অপরাধ; আর ভালোবাসা ছাড়া জীবন আমি স্বীকার করি না’, লেভিনের প্রশ্নটা নিজের ধরনের বুঝে উনি বললেন, ‘কি করা যাবে, ওইভাবেই জন্মেছি, তা ছাড়া সত্যি, এতে কারো ক্ষতি হয় কম, অথচ নিজের কত তুষ্টি…
লেভিন বললেন, ‘তার মানে, নতুন কেউ নাকি?’
‘হ্যাঁ ভায়া!… বিষণ্ন-মধুর মেয়েদের তো তুমি জান… যে মেয়েদের তুমি দেখো স্বপ্নে… তা এই মেয়েরা হয়ে ওঠে বাস্তব… ভয়ংকর এই মেয়েরা। কি জান, নারী হল এমন বস্তু যে যতই তাদের খতিয়ে দেখা যাক, সবই নতুন লাগবে।’
‘তাহলে খতিয়ে না দেখাই ভালো।’
উঁহু। কে-একজন গণিতজ্ঞ বলেছিলেন, আনন্দটা সত্য আবিষ্কারে নয়, তার সন্ধানে।’
লেভিন শুনছিলেন চুপ করে আর নিজের ওপর যতই জোর খাটান না কেন বন্ধুর জায়গায় নিজেকে কল্পনা করতে পারছিলেন না, বুঝতে পারছিলেন না কি তাঁর অনুভূতি, এমন মেয়েদের অধ্যয়ন করায় কিই-বা আনন্দ।
আন্না কারেনিনা – ২.১৫
পনেরো
ছোট নদীটার ওপরে অদূরের একটা ছোট অ্যাম্পেন কুঞ্জে পাখি উড়ে আসার জায়গাটা। বনে এসে লেভিন গাড়ি থেকে নেমে অব্লোন্স্কিকে নিয়ে গেলেন শ্যাওলা-পড়া চ্যাটচেটে মাঠের এক কোণে, এর মধ্যেই বরফ সেখানে গলে গেছে। নিজে তিনি ফিরলেন অন্য প্রান্তে, যমজ বার্চ গাছের কাছে, নিচু দিককার শুকনো ডালের ফাঁকে বন্দুক রেখে কাফতান (শেরওয়ানির মত পুরুষের রুশী জাতীয় পোশাক) খুলে ফেললেন, বেল্ট টান করে পরখ করলেন হাতের সচলতা।
তাঁদের পেছন পেছন বুড়ি, ধূসর লাস্কা এসেছিল। সতর্ক হয়ে সে বসল লেভিনের সামনে, উৎকর্ণ হয়ে। বড় বনটার পেছনে সূর্য ঢলে পড়ছে; অ্যাম্পেন গাছগুলোর মধ্যে ছড়ানো ছিটানো গোটাকয়েক বার্চ তাদের স্ফীত, ফাটো- ফাটো কোরক নিয়ে প্রকট হয়ে উঠেছে গোধূলির আলোয়।
বনের যেখানে এখনো বরফ লেগে আছে, সেখান থেকে কানে আসছিল আঁকাবাঁকা সংকীর্ণ স্রোতোরেখায় পানির ঝিরঝির। কিচির-মিচির করে ছোট ছোট পাখিরা মাঝে মাঝে উড়ে যাচ্ছিল গাছ থেকে গাছে।
নিঝুম স্তব্ধতার ফাঁকে ফাঁকে শোনা যাচ্ছিল বরফ-গলা মাটি আর বেড়ে ওঠা ঘাসের চাপে নড়ে-ওঠা গত বছরের ঝরা পাতার খসখস।
‘কি কাণ্ড! ঘাস যে বেড়ে উঠছে তা শোনা যাচ্ছে, দেখা যাচ্ছে!’ কচি একটা ঘাসের ফলার কাছে সীসে রঙের সিক্ত, সঞ্চরমাণ অ্যাম্পেন পাতাটা লক্ষ্য করে মনে মনে ভাবলেন লেভিন। নিচের দিকে, কখনো ভেজা, শৈবালাচ্ছন্ন মাটি, কখনো উৎকর্ণ লাস্কা, কখনো টিলার নিচে, তাঁর সামনেকার বনের ন্যাড়া চূড়াগুলো, কখনো সাদা মেঘে ছেঁড়া ছেঁড়া নিবে আসা আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। আলস্যে ডানা নেড়ে বনের অনেক ওপর দিয়ে উড়ে গেল একটা বাজপাখি; আরেকটা বাজপাখি ঠিক একইভাবে একই দিকে উড়ে গিয়ে উধাও হয়ে গেল। বনের মধ্যে আরো সজোরে, শশব্যস্তে কাকলী, তুলল পাখিরা। অদূরে ডেকে উঠল বন-পেঁচা, চমকে উঠে লাস্কা কয়েক পা সাবধানে এগিয়ে মাথা পাশে হেলিয়ে কান পেতে রইল। নদীর ওপার থেকে শোনা গেল কোকিলের ডাক। দু’বার স্বাভাবিকের মত কুহু ডাকার পর গলা ভেঙে, ব্যতিব্যস্ত হয়ে সব গোলমাল করে ফেলল।
