আর এই চমৎকার বসন্তের দিনে তিনি টের পেলেন যে কিটির কথা স্মরণ করে তাঁর কষ্ট হচ্ছে না।
‘কি, আশা করনি তো?’ স্লেজ থেকে নেমে অবলোনস্কি বললেন, নাকে-গালে-ভুরুতে তাঁর কাদার দলা, কিন্তু ফুর্তিতে আর স্বাস্থ্যে জ্বলজ্বল করছেন। লেভিনকে আলিঙ্গন আর চুম্বন করে বললেন, ‘চলে এলাম। এক : তোমাকে দেখতে; দুই : কিছু পাখি শিকার করতে; তিন : এগুশোভোর বনটা বেচে দিতে।’
‘চমৎকার! কেমন বসন্ত দেখেছ? তা স্লেজে করে এলে কেমন?’
‘গাড়িতে আসা আরও খারাপ হত, কনস্তান্তিন দ্দ্মিত্রিচ’, পরিচিত কোচোয়ান জবাব দিল।
‘যাক, তোমাকে দেখে আমি ভারি, ভারি খুশি হলাম’, আন্তরিকভাবেই শিশুর মত সানন্দে হেসে লেভিন বললেন।
অভ্যাগতরা এলে যে ঘরে ওঠে, সেখানে অতিথিকে নিয়ে গেলেন লেভিন। সেখানেই আনা হল অব্লোন্স্কির মালপত্র : ব্যাগ, কেসে রাখা বন্দুক, চুরুটের বটুয়া। হাত-মুখ ধুয়ে পোশাক বদলে নেবার জন্য বন্ধুকে রেখে লেভিন সেরেস্তায় গেলেন হাল-চাষ আর ক্লোভারের কথা বলতে। গৃহের মান-মর্যাদা নিয়ে সদা উদ্বিগ্ন আগাফিয়া মিখাইলোভনা প্রবেশ কক্ষে তাঁকে ধরে খাবার-দাবারের কথা জিজ্ঞেস করলেন।
‘যা ভালো বোঝেন করুন, তবে একটু তাড়াতাড়ি’, এই বলে তিনি চলে গেলেন গোমস্তার কাছে।
যখন ফিরলেন, হাত-মুখ ধুয়ে চুল আঁচড়িয়ে হাসিতে ঝলমল করে অব্লোন্স্কি বেরিয়ে আসছিলেন তাঁর ঘর থেকে, দুজনে তাঁরা ওপরে উঠলেন।
‘তোমার কাছে আসতে পারলাম বলে কি ভালোই না লাগছে! এবার বোঝা যাবে কি-সব গুহ্য কাণ্ড তুমি এখানে করে থাকো। না, সত্যি, তোমাকে হিংসে হচ্ছে আমার। কি একখান বাড়ি রে, সব কিছুই কি চমৎকার! আলো ঢালা’, প্রাণ-মাতানো অব্লোন্স্কি বললেন এটা ভুলে গিয়ে যে বসন্ত আর আজকের মত ঝকঝকে দিন আসে না সব সময়। ‘আর তোমার আয়াটিও কি চমৎকার! অ্যাপ্রন-আঁটা সুন্দরী একটা দাসী থাকলে অবশ্য মন্দ হত না, কিন্তু তোমার যা সন্ন্যাসী স্বভাব আর কড়া ধরনধারণ, তাতে এই-ই ভালো।’
নানা আগ্রহোদ্দীপক খবর দিলেন অব্লোন্স্কি, তার ভেতর লেভিনের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই সংবাদ যে তাঁর ভাই কজ্নিশেভ এই গ্রীষ্মে তাঁর কাছে গ্রামে আসার উদ্যোগ করছেন।
কিটি এবং সাধারণভাবে শ্যেরবাৎস্কিদের নিয়ে একটা কথাও অব্লোন্স্কি বললেন না; শুধু স্ত্রীর পক্ষ থেকে অভিবাদন জানালেন। তাঁর মার্জিত সূক্ষ্মতাবোধে কৃতজ্ঞ লেগেছিল লেভিনের, খুশি হয়েছিলেন এমন অতিথি পেয়ে বরাবরের মত একাকিত্বের সময়ে লেভিনের মনে যত ভাবনা আর অনুভূতি জমে উঠেছিল, তা তিনি আশেপাশের কাউকে জানাতে পারতেন না। এখন অব্লোন্স্কির কাছে তিনি উজাড় করে দিতে থাকলেন তাঁর বসন্তের কাব্যিক পুলক, কৃষিকর্মের অসাফল্য আর পরিকল্পনা, পঠিত পুস্তকাদি নিয়ে তাঁর ভাবনা আর মন্তব্য, বিশেষ করে তাঁর রচনাটির বিবরণ, যার মূল কথাটা হল, তিনি নিজে খেয়াল না করলেও, কৃষিকাজ নিয়ে সমস্ত পুরানো পুস্তকের সমালোচনা। অব্লোন্স্কি অতি মনোরম মানুষ, আভাস মাত্রেই সবই বুঝতে পারেন, এবার তাঁকে লাগল আরো মনোরম, লেভিন তাঁর ভেতরে লক্ষ্য করলেন নিজের আত্মপ্রসাদ লাভের মত নতুন একটা শ্রদ্ধা আর কমনীয়তা।
খাওয়াটা যাতে চমৎকার হয়, এ নিয়ে আগাফিয়া মিখাইলোভনা আর বাবুর্চির চেষ্টা-চরিত্রের ফল হল এই যে ক্ষুধার্ত দু’বন্ধুই নাশতা বসে পেট ভরালেন রুটি-মাখন, নোনা মাছ, তার ওপর মাংসের যে পুলি পিঠে দিয়ে বাবুর্চি অতিথিকে অবাক করে দিতে চেয়েছিল, তা বাদ দিয়েই স্যুপ আনতে বললেন লেভিন। কিন্তু অন্য ধরনের ভোজনে অভ্যস্ত হলেও অব্লোন্স্কির কাছে সবই লাগল চমৎকার আর অপূর্ব—নানারকম ঘাস-গাছড়ায় জারানো ভোদ্কা, রুটি, মাখন, বিশেষ করে নোনা মাছ আর ব্যাঙের ছাতা, সাদা সস সহযোগে মুরগি, ক্রিমিয়ার সাদা সুরা।
তিনি গরম খাবারটার পর একটা মোটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, ‘চমৎকার, চমৎকার, আমি তোমার কাছে এলাম যেন গোলমাল আর ঝাঁকুনির পর জাহাজ থেকে নামলাম একটা শান্ত তীরে। তাহলে তুমি বলছ যে মেহনতির ব্যাপারটাকেই বিচার করে দেখতে হবে আর কৃষিকাজের প্রণালী নির্বাচনে চলতে হবে সেই অনুসারে। আমি অবশ্য এ ব্যাপারে নেহাৎ অজ্ঞ, তবে আমার মনে হয় তত্ত্ব আর তার প্রয়োগ মেহনতিকেও প্রভাবিত করবে।’
‘আরে দাঁড়াও : আমি অর্থশাস্ত্রের কথা বলছি না, বলছি কৃষিবিদ্যার কথা। এটা হওয়া উচিত নিসর্গ-বিজ্ঞানের মত, নির্দিষ্ট ঘটনাটাকে আর মেহনতিকে তার অর্থনৈতিক, নরকৌলিক…’
এই সময় জ্যাম নিয়ে এলেন আগাফিয়া মিখাইলোভনা।
অব্লোন্স্কি নিজের ফুলো ফুলো আঙুলের ডগায় চুমু খেতে বললেন, ‘আহ্ আগাফিয়া মিখাইলোভনা, কি চমৎকার আপনার নোনা মাছ, কি চমৎকার আপনার ভোদ্কা!… কি কস্তিয়া, সময় হয়নি কি?’ যোগ দিলেন তিনি
জান্লা দিয়ে গাছগুলোর ন্যাড়া-চূড়ার ওপাশে ডুবন্ত সূর্যের দিকে তাকালেন লেভিন।
বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, সময় হয়ে গেছে! কুজ্মা, গাড়ি ঠিক কর!’
অব্লোন্স্কি নিজে নিচে নেমে তাঁর বার্নিশ করা বাক্স থেকে ক্যানভাসের ঢাকনি খুলে জুড়ে তুলতে লাগলেন নতুন ফ্যাশনের পেয়ারের বন্দুকটা। কুজ্মা মোটা একটা বকশিসের গন্ধ পেয়ে অব্লোন্স্কিকে ছাড়ছিল না, মোজা আর হাইবুট দুই-ই পরিয়ে দিল তাঁকে, অবলোন্স্কিও সেটা তাকে করতে দিলেন।
