ভাসিলি বলল, ‘ভাবনা নেই হুজুর, সিধে হয়ে যাবে।’
লেভিন বললেন, ‘তর্ক করো না দয়া করে, যা বলা হচ্ছে কর।’
‘যে আজ্ঞে’, বলে ভাসিলি ঘোড়ার মাথা ধরে টানতে লাগল। ‘আর মাটি কি কনস্তান্তিন দ্দ্মিত্রিচ’, মন ভেজাবার জন্য ভাসিলি বলল, ‘একেবারে পয়লা নম্বরের। শুধু হাঁটাটা বড় মুশকিল। পুদ খানেক করে কাদা টানতে হচ্ছে।’
লেভিন বললেন, ‘তোমরা মাটি ছাঁকোনি কেন?
‘ও আমরা গুঁড়িয়ে নেব’, বলে ভাসিলি একদলা বীজ নিয়ে মাটি গুঁড়ো করল হাতে।
তাকে যে না-ছাঁকা মাটি দেওয়া হয়েছে, সেটা ভাসিলির দোষ নয়, তাহলেও বিরক্ত লাগল লেভিনের।
নিজের বিরক্তি চেপে যা খারাপ মনে হচ্ছে তার মধ্যে ভালো দেখার একটা পরীক্ষিত পদ্ধতি ছিল লেভিনের। এবারও সে পদ্ধতি তিনি কাজে লাগালেন। দু’পায়েই লেপটে যাওয়া বিরাট দু’দলা মাটি টেনে টেনে কিভাবে চলছে মিকা সেটা তিনি দেখলেন তাকিয়ে তাকিয়ে তারপর ঘোড়া থেকে নেমে ভাসিলির কাছ থেকে বীজের টুকরি নিয়ে বুনতে গেলেন।
‘কতদূর থেমেছ?’
পা দিয়ে জায়গাটা দেখিয়ে দিল ভাসিলি। লেভিনও যেমন পারেন মাটিতে বীজ ছড়াতে লাগলেন। হাঁটা কঠিন হচ্ছিল, জলা জমিতে যেমন হয়; একটা খাত কেটে লেভিন ঘেমে উঠলেন, দাঁড়িয়ে পড়ে বীজের টুকরিটা দিয়ে দিলেন।
ভাসিলি বলল, ‘তা সাহেব, ওই খাতটার জন্য গ্রীষ্মকালে আমাকে যেন না বকেন।’
‘কিন্তু কেন বকব?’ ফূর্তি করেই লেভিন জিজ্ঞেস করলেন, টের পাচ্ছিলেন তাঁর পদ্ধতিটায় কাজ হয়েছে।
‘গ্রীষ্মকালে দেখবেন। জানানি দেবে। গত বসন্তে আমি যেখানে বুনেছিলাম তাকিয়ে দেখুন। কেমন রুয়েছি! আমি কনস্তান্তিন দদ্মিত্রিচ, নিজের বাপের জন্য লোকে যেমন খাটে, তেমনি খেটেছি তো। আমি নিজে খারাপ করে কাজ করতে ভালোবাসি না, অন্যকেও বলি না তা করতে। মালিকেরও মঙ্গল, আমাদেরও মঙ্গল। ওই তো তাকিয়ে দেখলেই’, ক্ষেতটা দেখিয়ে ভাসিলি বলল, ‘মন খুশি হয়ে ওঠে।’
‘বসন্তটা কিন্তু সুন্দর হয়েছে ভাসিলি।’
‘আজ্ঞে এমন বসন্তের কথা বুড়োদেরও মনে পড়ে না। এই তো বাড়ি গিয়েছিলাম। আমাদের বুড়ো কর্তাও গম বুনেছে বেশ খানিক। বলে, রাই থেকে কম যাবে না।’
‘তোমরা গম বুনছ কতদিন?’
‘ও বছর আপনিই তো আমাদের শিখিয়েছিলেন গো। দুই মাপ বীজ দিয়ে দিলেন, তার সিকি খানেক বেচে দিয়ে বাকিটা বুনলাম!
‘তা দেখো, ঢেলাগুলোকে গুঁড়ো কর যেন’, ঘোড়ার কাছে গিয়ে লেভিন বললেন, ‘মিশকার দিকেও চোখ রেখো। ভালো ফলন হলে দেসিয়াতিনা পিছু পঞ্চাশ কোপেক।’
‘দণ্ডবৎ করি। আমরা তো এমনিতেই আপনার কাছে কতই না পাই।’
ঘোড়ায় চেপে লেভিন গেলেন গত বছর যে মাঠে ক্লোভার বোনা হয়েছিল আর এ বছর যে মাঠে বাসন্তিক গম বোনার জন্য হাল পড়েছে সেখানে।
ক্লোভারের অঙ্কুর হয়েছে অপরূপ। গত বছরের গম গাছের নাড়ার তল থেকে তা সর্বত্র মাথা তুলেছে রীতিমত সবুজ হয়ে। ঘোড়ার গোড়ালি পর্যন্ত ডুবে যাচ্ছিল আর প্রতিবার আধগলা হিমেল মাটি থেকে পা তুলবার সময় পচ্ পচ্ শব্দ উঠছিল তাতে। চষা খেত দিয়ে যাওয়া আদপেই আর সম্ভব ছিল না। যেখানে বরফ রয়ে গিয়েছিল, শুধু সেখানেই দাঁড়ানো যাচ্ছিল, কিন্তু লাঙল-দেওয়া খাতগুলোতে কাদায় পা ডুবে যাচ্ছিল গোড়ালির ওপর পর্যন্ত। হাল দেওয়া হয়েছে চমৎকার; দিন দুয়েকের মধ্যেই মই দেওয়া আর বীজ বোনা সম্ভব হবে। সবই চমৎকার, সবই হাসিখুশি। পানি নেমে গেছে আশা করে লেভিন ফিরলেন স্রোত দিয়ে। আর সত্যিই স্রোত পেরিয়ে গেলেন তিনি, ভয় পাইয়ে দিলেন দুটো হাঁসকে। মনে মনে ভাবলেন : ‘তাহলে স্নাইপও আছে নিশ্চয়’ আর বাড়ির দিকে যাওয়ার ঠিক মোড়েই দেখা হল বনরক্ষীর সাথে, স্নাইপ সম্পর্কে তাঁর অনুমান সমর্থন করল সে।
দুলকি চালে ঘোড়া ছোটালেন তিনি যাতে বাড়ি গিয়ে খাওয়ার সময় পান এবং সন্ধ্যা নাগাদ তৈরি করে রাখতে পারেন বন্দুকটা
চৌদ্দ
লেভিন খুবই খোশমেজাজে বাড়ির দিকে যেতে যেতে প্রধান প্রবেশ পথের দিক থেকে ঘণ্টির আওয়াজ শুনতে পেলেন। ভাবলেন, হ্যাঁ, ওটা রেল স্টেশনের দিক থেকে, এখনই তো মস্কো ট্রেন আসার কথা… কিন্তু কে হতে পারে? নিকোলাই ভাই নয় তো? ও যে বলেছিল : জল-চিকিৎসাতেও যেতে পারি, তোর কাছেও যেতে পারি।’ প্রথমে তাঁর ভয় হয়েছিল এবং এই ভেবে বিছ্ছিরি লাগছিল যে, নিকোলাই ভাইয়ের উপস্থিতি তাঁর এই বাসন্তী সুখানুভূতি পণ্ড করে না দেয় আবার। কিন্তু এ কথা মনে হচ্ছে বলে লজ্জা হল তাঁর এবং তৎক্ষণাৎ তিনি যেন তাঁর প্রাণের আলিঙ্গন মেলে ধরলেন, আর মন ভিজে ওঠা আনন্দে অপেক্ষা করতে লাগলেন, সর্বান্তঃকরণে কামনা করলেন যে ভাই-ই হয় যেন। ঘোড়াকে তাড়া দিলেন তিনি, অ্যাকেসিয়া গাছগুলো পেরিয়ে দেখতে পেলেন স্টেশনের দিক থেকে একটা ভাড়াটে ত্রয়কা আসছে, তাতে ফারকোট পরা এক ভদ্রলোক। না, তাঁর ভাই নয়। ভাবলেন, ‘আহ্ ভালো লোক কেউ যদি হয়, যার সাথে গল্প করা যাবে!’
‘আরে!’ দু’হাত ওপরে তুলে সানন্দে চিৎকার করে উঠলেন লেভিন, ‘আনন্দের অতিথি যে! কি যে খুশি হলাম তোমাকে দেখে!’ অব্লোন্স্কিকে চিনতে পেরে তিনি চেঁচালেন। ভাবলেন, ‘এবার নির্ঘাৎ জানা যাবে কিটি বিয়ে করেছে কিনা অথবা কবে করবে।’
