‘কোন্টাকে?’
‘ধর কলপিককেই।’
‘জ্বি আচ্ছা।’
ঘোড়ায় যখন জিন পরানো হচ্ছে, তখন তাঁর দৃষ্টিপথে গোমস্তাকে ঘুরঘুর করতে দেখে তিনি তাকে আবার ডাকলেন মিটমাট করে নেবার জন্য, বসন্তের কাজ আর খামারের পরিকল্পনাদি নিয়ে তার সাথে কথা বলতে লাগলেন। গোবর সার দিতে হবে তাড়াতাড়ি যাতে প্রথম বিচালি কাটার আগেই সব শেষ হয়ে যায়। দূরের মাঠে হাল দিতে হবে না-থেমে যাতে কালো ভাপে তা ধরে রাখা চলবে। ঘাস কাটাতে হবে ভাগ-চাষী দিয়ে নয়, খেতমজুর দিয়ে।
গোমস্তা মন দিয়ে সব শুনল। বোঝা যায়, জোর করে চেষ্টা করছিল কর্তার প্রস্তাবে সায় দিতে; তাহলেও চেহারায় তার লেভিনের অতি পরিচিত পিত্তি-জ্বালানো নৈরাশ্য আর নিরানন্দের ছাপ। সে চেহারা বলছিল, এসবই বেশ ভালো, তবে সৃষ্টিকর্তা যা করেন।
এই মনোভাবে লেভিন যেমন দুঃখ পেতেন তেমন আর কিছুতে নয়। কিন্তু যত গোমস্তা তাঁর এখানে থেকেছে তাদের সবারই মনোভাব ছিল একই। তাঁর প্রস্তাবাদি তারা সবাই নিয়েছে একই ধরনে। তাই এখন আর তিনি চটে ওঠেন না। তবে দুঃখ হয় তাঁর, এবং এই যে কেমন একটা ভৌত শক্তিকে তিনি সৃষ্টিকর্তা যা করেন ছাড়া অন্য কোন নাম দিতে পারছেন না, সব সময়ই যা তাঁর প্রতিবন্ধকতা করছে, তার বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য আরো বেশি উত্তেজনা বোধ করতেন তিনি।
গোমস্তা বলল, ‘যতটা পেরে উঠব কনস্তান্তিন দদ্মিত্রিচ।
‘পেরে না ওঠার কি আছে?’
‘আরো পনেরজনের মত খেতমজুর নিতেই হবে। কিন্তু আসতে চায় না। আজ এসেছিল, সারা গ্রীষ্মের জন্য চাইছে সত্তর রুব্ল করে।’
লেভিন চুপ করে রইলেন। আবার ঐ শক্তিটার প্রতিবন্ধকতা। তিনি জানতেন যে যত চেষ্টাই করা যাক, বর্তমান দরে চল্লিশ, সাঁইত্রিশ, আটত্রিশ জনের বেশি খেতমজুর লাগাতে পারবেন না। চল্লিশ জন লাগিয়েছেন, তবে তার বেশি নয়। কিন্তু তাহলেও লড়াই না করে তিনি পারেন না।
‘খেতমজুর নিজেরা না এলে সুরীতে, চেফিরোভকায় লোক পাঠান। খোঁজ করতে হবে।’
‘পাঠাতে হয় পাঠাব’, মন-মরার মত বলল ভাসিলি ফিওদরোভিচ, ‘তারপর ঐ ঘোড়াগুলোও আবার হয়েছে দুবলা।’
‘কিনব। আরে আমি তো জানি’, হেসে যোগ করলেন তিনি, ‘যত কম, আর যত খারাপ আপনি তার পক্ষে। কিন্তু এ বছর আমি আপনাকে আপনার মতে চলতে দেব না। সব করব আমি নিজে।’
‘আপনার দেখছি ঘুম হচ্ছে না। কর্তার নজরে থেকে খাটতে তো আমাদের ফুর্তিই লাগবে…’
‘বার্চ নাবালের ওপাশে তাহলে ক্লোভার বোনা হচ্ছে? যাই, গিয়ে দেখে আসি’, কোচোয়ান যে ঘি-রঙা ছোট্ট কলপিককে নিয়ে এসেছিল, তার ওপর চেপে তিনি বললেন।
কোচোয়ান চিৎকার করল, ‘স্রোত পেরিয়ে যেতে পারবেন না, কনস্তান্তিন দদ্মিত্রিচ।’
‘বেশ, তাহলে বন দিয়েই যাব।’
অনেকদিন আটক থাকা, জমা পানির ওপর ঘোঁতঘোঁত করে লাগামে টান মারা তেজী ধীরগামী ঘোড়াটাকে লেভিন চালালেন আঙিনার কাদা দিয়ে ফটকের বাইরে মাঠের মধ্যে।
লেভিনের গোয়ালে আর গোলাবাড়িতে ফূর্তি লেগেছিল, মাঠে গিয়ে ফূর্তি লাগল আরো বেশি। বনের মধ্যে যেখানে কোথাও কোথাও ধেবড়ে যাওয়া পায়ের ছাপ নিয়ে বরফ টিকে ছিল তার ওপর দিয়ে সুন্দর ঘোড়াটার ধীর লয়ে দুলতে দুলতে লেভিন বরফ আর বাতাসের তাজা গন্ধ নিচ্ছিলেন বুক ভরে। তাঁর গাছগুলোর প্রত্যেকটির গুঁড়িতে সঞ্জীবিত শ্যাওলা আর ডালে ফুলে ওঠা কোরক দেখে আনন্দ হচ্ছিল তাঁর। বন থেকে যখন বেরোলেন, সামনে তাঁর দেখা দিল বিশাল বিস্তারে সবুজের গালিচা, কোথাও কোথাও গলন্ত তুষারের অবশেষ ছাড়া একটাও খুঁত নেই তাতে। একটা চাষের ঘোড়া আর তার বাচ্চাকে তাঁর মাঠের সবুজ মাড়াতে দেখে (সামনে একজন চাষীকে পেয়ে ওদের তাড়িয়ে দিতে বলেন) কিংবা ইপাত চাষীকে দেখে ‘কি ইপাত, শিগগিরই বুনছ তো? তাঁর এই প্রশ্নে ‘আগে হাল দিতে হবে যে কনস্তান্তিন দৃদ্মিত্রিচ’, ইপাতের বোকার মত এই হাস্যকর উত্তরে—কিছুতেই তাঁর রাগ হল না। যত তিনি এগোতে থাকলেন, ততই খুশি লাগছিল তাঁর, চাষবাস নিয়ে উত্তরোত্তর ভালো ভালো এক-একটা পরিকল্পনা তাঁর মাথায় আসছিল : দ্বিপ্রাহরিক রেখা বরাবর গোটা মাঠে গাছ পুঁতে ঘিরে ফেলতে হবে যাতে তলে বরফ জমে না থাকে; ছ’টা সার-দেওয়া ক্ষেত আর তিনটা মজুত ঘেসো জমিতে ভাগ করে ফেলতে হবে, মাঠের দূর প্রান্তে বানাতে হবে গোয়াল, একটা পুকুর খুঁড়তে হবে, গোবর সারের জন্য তৈরি করতে হবে গরুদের অপসারণযোগ্য বেড়া। তাহলে বোনা যাবে তিনশ দেসিয়াতিনায় গম, একশ’তে আলু, দেড়শ’তে ক্লোভার, উর্বরতা ফুরিয়ে যাওয়া জমি পড়ে থাকবে না এক দেসিয়াতিনাও।
এসব কল্পনা নিয়ে তাঁর মাঠের সবুজ না মাড়িয়ে সাবধানে আলের ওপর ঘোড়াকে ঘুরিয়ে তিনি গেলেন খেতমজুরদের কাছে যারা ক্লোভার বুনছিল। বীজ ভরা গাড়িটা ছিল কিনারে নয়, চষা ক্ষেতের মধ্যেই, শীতকালীন গমের জমি ঢাকায় ছিন্নভিন্ন হয়ে ঘোড়ার খুরে দলে গেছে। দুজন মজুরই বসে ছিল আলের ওপর, নিশ্চয় একই পাইপ টানছিল ভাগাভাগি করে। বীজ মেশানো যে মাটি ছিল গাড়িতে তা গুঁড়ানো হয়নি, চাপ বেঁধে আছে অথবা হিমে জমে গিয়ে দলা পাকিয়েছে। কর্তাকে দেখে ভাসিলি মুনিষ গেল গাড়িটার কাছে আর মিশকা বুনতে লাগল। জিনিসটা অন্যায়, কিন্তু মুনিষদের ওপর লেভিন চটে উঠেছেন কদাচিৎ। ভাসিলি কাছে আসতে লেভিন তাকে ঘোড়া কিনারে সরিয়ে আনতে বললেন।
