বসন্ত হল পরিকল্পনা আর অনুমানের কাল। বসন্তের যে গাছ তখনো জানে না তার স্ফীত কোরকে ঢাকা অঙ্কুর আর শাখা-প্রশাখা কোন দিকে কিভাবে বেড়ে উঠবে, ঠিক তারই মত লেভিন বাইরে বেরিয়ে নিজে জানতেন না তাঁর প্রিয় কৃষিকর্মের কোন কোন ব্যবস্থার পেছনে তিনি লাগবেন, কিন্তু অনুভব করছিলেন যে অতি সুন্দর সুন্দর পরিকল্পনা আর অনুমানে তিনি ভরপুর। প্রথমে তিনি গেলেন গরুগুলোর কাছে। তাদের বার করে আনা হয়েছে খোঁয়াড়ে, সেখানে রোদে গা গরম করে চিকন লোমে ঝিলিক দিয়ে তারা মাঠে চরতে যাবার জন্য ডাকছিল। সমস্ত খুঁটিনাটিতে চেনা গরুগুলোকে মুগ্ধ নেত্রে লক্ষ্য করে লেভিন তাদের মাঠে নিয়ে যেতে বললেন, আর বাছুরগুলোকে বললেন খোঁয়াড়ে ছেড়ে রাখতে। রাখাল আনন্দে ছুটে গেল চরাবার তোড়জোড় করতে। রাখালিনীরা স্কার্টের খুঁট তুলে সাদা সাদা পায়ে যা এখনো রোদপোড়া হয়ে ওঠেনি, কাদায় প্যাচপ্যাচ করে সরু সরু ডাল হাতে বসন্তের আনন্দে দুরন্ত হয়ে ওঠা বাছুরগুলোর পেছনে ছোটাছুটি করে তাদের তাড়িয়ে আনতে লাগল আঙিনায়।
এ বছরের বাছুরটা হয়েছে অসাধারণ, প্রথম বাছুরগুলো হয়েছে চাষাদের গরুর মত, পাভার বকনাটা তিন মাসেই দেখতে এক বছরের মত বড়—লেভিন তাদের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখে ওদের জন্য খাবার টব বার করে আনতে এবং খোঁয়াড়ের মধ্যে ছানি দিতে বললেন। কিন্তু দেখা গেল শরতে তৈরি করা এবং শীতকালে অব্যবহৃত খোঁয়াড়ের বেড়া ভেঙে পড়েছে। ছুতোরকে ডেকে পাঠালেন তিনি যার কাজ করার কথা ছিল মাড়াই কলে। কিন্তু দেখা গেল সে মই সারাচ্ছে, যা মেরামত করা উচিত ছিল লেন্ট পরবের আগেই। এতে লেভিনের ভারি খারাপ লাগল। খারাপ লাগল কারণ যে হেলাফেলার বিরুদ্ধে তিনি তাঁর সমস্ত শক্তি নিয়ে এত বছর ধরে লড়ে আসছেন তার পুনরাবৃত্তি হল। তিনি জানতে পারলেন, খোঁয়াড়ের বেড়া শীতকালে অপ্রয়োজনীয় বোধে সরিয়ে রাখা হয় গাড়ি-লাঙল টানা ঘোড়াদের আস্তাবলে, সেখানে তা ভেঙে পড়ে, কেননা তা বানানো হয়েছিল পলকা করে, বাছুরদের জন্য। তা ছাড়া এও জানা গেল যে মই এবং সমস্ত কৃষি হাতিয়ার যা যাচাই করে দেখে শীতকালেই মেরামত করার হুকুম দেওয়া হয়েছিল এবং ঠিক এই উদ্দেশ্যেই নেওয়া হয়েছিল তিনজন ছুতোরকে, তা মেরামত হয়নি এবং যখন তাদের মাঠে নামার কথা তখন মেরামত করা হচ্ছে মইগুলো। লেভিন গোমস্তাকে ডাকতে পাঠিয়ে তক্ষুনি নিজেই গেলেন তার খোঁজে। ফার লাগানো মেষচর্ম জ্যাকেট পরে এ দিনের সবাইকার মত জ্বলজ্বলে হয়ে হাতে একটা খড় কাটি ভাঙতে ভাঙতে গোমস্তা বেরল মাড়াই ঘর থেকে।
‘ছুতোর মাড়াই কল নিয়ে কাজ করছে না কেন?
‘হ্যাঁ, গতকাল আমি জানাব ভেবেছিলাম; মই মেরামত করা দরকার। জমি তো চষতে হয়।’
‘কিন্তু শীতকালে হচ্ছিলটা কি?
তা ছুতোরকে আপনার দরকার কিসের জন্য?’
‘বাছুর খোঁয়াড়ের বেড়া কোথায়?
‘ঠিক জায়গায় বসাবার হুকুম দিয়েছিলাম। কিন্তু হুকুমে কি আর এসব লোকদের দিয়ে কিছু হয়!’ হাত দুলিয়ে গোমস্তা একটা হতাশার ভঙ্গি করল।
‘এই লোকদের দিয়ে না, এই গোমস্তাকে দিয়ে!’ ফুঁসে উঠলেন লেভিন, ‘আপনাকে আমি রেখেছি কিসের জন্য? চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি, কিন্তু এতে কোন কাজ হবে না বুঝে কথার মাঝখানে থেমে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। একটু চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তা কি বোনা যাবে?
‘তুর্কিনের ওপাশের জমিটায় কাল কি পরশু শুরু করা যেতে পারে।
‘আর ক্লোভার?’
‘ভাসিলি আর মিশকাকে পাঠিয়েছি, বুনছে। তবে মাঠে নামতে পারবে কিনা জানি না : প্যাচপেচে তো।’
‘কত দেসিয়াতিনা?’
‘ছয়।’
‘সব জমিটা বোনা হল না কেন?’ চেঁচিয়ে উঠলেন লেভিন।
ক্লোভার বোনা হচ্ছে বিশ নয়, মাত্র ছয় দেসিয়াতিনা জমিতে, এটা আরো বিরক্তিকর। তত্ত্ব এবং নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে লেভিন জানেন ক্লোভার ভালো হয় যথাসম্ভব আগে, প্রায় বরফ থাকতে থাকতে বুনতে পারলে। কিন্তু কখনোই সেটা তিনি করিয়ে উঠতে পারেননি।
‘লোক নেই। হুকুম করে কি আর এসব লোকদের দিয়ে কিছু হয়? তিনজন আসেনি। যেমন এই সেমিওন…’
‘চাল ছাওয়া থামিয়ে রাখতে পারতেন।’
‘তা থামিয়ে রেখেছি।’
‘তাহলে লোকগুলো গেল কোথায়?’
‘পাঁচজন কম্পোত বানাচ্ছে’ (অর্থাৎ কম্পোস্ট সার)। ‘চারজন ওট সরিয়ে রাখছে, পচ না ধরে আবার কনস্তান্তিন দদ্মিত্রিচ।’
লেভিন খুব ভালোই জানতেন যে ‘পচ না ধরে আবার’ মানে বিলাতি বীজ ইতিমধ্যেই নষ্ট হয়ে গেছে—আবার যা হুকুম দিয়েছিলেন, করা হয়নি।
চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি, ‘আমি যে লেন্ট পরবের সময়েই বলেছিলাম, পাইপ লাগাও!’
‘ভাবনা করবেন না, সবই হবে সময়মত।’
লেভিন রেগে হাত ঝাঁকালেন, ওট দেখবার জন্য গেলেন গোলাবাড়িতে, সেখান থেকে আস্তাবলে ফিরলেন। ওট এখনো নষ্ট হয়নি। কিন্তু খেতমজুরেরা তা সরাচ্ছে বেলচা দিয়ে যেখানে স্রেফ নিচের গোলায় ঢেলে দিলেই হত। সেই আদেশ দিয়ে এবং সেখান থেকে দুজন লোককে ক্লোভার বোনার জন্য পাঠিয়ে দিয়ে গোমস্তার ওপর লেভিনের রাগ পড়ে এল। সত্যি দিনটা এত চমৎকার যে রেগে থাকা অসম্ভব।
‘ইগ্নাত!’ কোচোয়ানের উদ্দেশে হাঁক দিলেন লেভিন, আস্তিন গুটিয়ে সে গাড়ি ধুচ্ছিল কুয়ার কাছে, ‘ঘোড়ায় জিন পারও আমার জন্য … ‘
