কিন্তু তিন মাস কেটে গেলেও তিনি ব্যাপারটায় নির্বিকার হয়ে উঠতে পারলেন না, ও কথা মনে পড়লেই সেই প্রথম দিনগুলোর মতই কষ্ট হত তাঁর। শান্ত হতে তিনি পারছিলেন না, কারণ দীর্ঘ দিন ধরে তিনি পারিবারিক জীবনের স্বপ্ন দেখে এসেছেন, নিজেকে তার জন্য পরিণত বলে মনে করেন, অথচ বিয়ে তাঁর হয়নি, আগের চেয়েও বিবাহ তাঁর কাছে সুদূরপরাহত। তাঁর আশেপাশের সবাই বা অনুভব করতেন, তাঁর নিজেরই তেমন একটা পীড়িত অনুভূতি ছিল যে তাঁর বয়সে একা থাকা ভালো নয়। তাঁর মনে পড়ল, মস্কো যাওয়ার আগে তিনি তাঁর গোপালক, সাদাসিধে চাষী নিকোলাই, যার সাথে গল্প করতে তিনি ভালোবাসতেন, তাকে বলেছিলেন, —তা নিকোলাই, ভাবছি বিয়ে করে ফেলা যাক।’ নিকোলাই চট করে জবাব দিয়েছিল যেন ব্যাপারটায় সন্দেহের কোন অবকাশই নেই, ‘অনেকদিন আগেই করতে হত কনস্তান্তিন দৃদ্মিত্রিচ।’ কিন্তু বিয়ে এখন তাঁর কাছে আগের চেয়েও সুদূর হয়ে দাঁড়িয়েছে। দখল হয়ে গেছে জায়গাটা, আর এখন কল্পনায় সে জায়গায় তাঁর পরিচিত মেয়েদের কাউকে বসাতে গেলে টের পান যে সেটা একেবারেই অসম্ভব। তাছাড়া প্রত্যাখ্যানের ব্যাপারটা আর তাতে তিনি যে ভূমিকা নিয়েছিলেন সে কথা মনে হতেই গ্লানির যন্ত্রণা ভোগ করতেন তিনি। নিজেকে তিনি যতই বোঝান যে তাঁর কোন দোষ নেই, এই ঘটনা এবং এই ধরনের অন্যান্য লজ্জাকর ঘটনার স্মৃতিতে তিনি কেঁপে উঠতেন, লাল হয়ে উঠতেন। সমস্ত লোকের মত অতীতে তিনিও এমন কাজ করেছেন যা তিনি খারাপ বলে মানেন, যার জন্য তাঁর বিবেকদংশন হতে পারত, কিন্তু কুকীর্তির স্মৃতি মোটেই এসব তুচ্ছ কিন্তু লজ্জাকর ঘটনাগুলোর মত যন্ত্রণা দিত না। এই ক্ষতগুলো সারছিল না কখনো। এসব স্মৃতির সাথে এখন যোগ হয়েছে কিটির প্রত্যাখ্যান এবং সে সন্ধ্যায় অন্যের চোখে তাঁর অবস্থাটা কি করুণ প্রতিভাত হয়েছে তার কথা। কিন্তু কালস্রোতে আর কাজে ফল হয়েছে। দুঃসহ স্মৃতি ক্রমেই চাপা পড়েছে গ্রাম্য জীবনের ঘটনায়, যা চোখে পড়বার মত না হলেও গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তাহে সপ্তাহে তিনি কিটির কথা ভাবতে লাগলেন ক্রমেই কম। কিটির বিয়ে হয়েছে বা দিনকয়েকের মধ্যে হতে চলেছে, এই খবরের জন্য তিনি রইলেন অধীর অপেক্ষায়, তাঁর আশা ছিল দাঁত তুলে ফেলার মত এরকম একটা খবর তাঁকে একেবারে সারিয়ে তুলবে।
ইতিমধ্যে বসন্ত এল, অপরূপ, সামূহিক, বসন্তের প্রতীক্ষা ও প্রতারণা ছাড়াই, এটা তেমনি একটা বিরল বসন্ত যাতে উদ্ভিদ, পশু, মানুষ সবাই খুশি হয়ে ওঠে একসাথে। অপরূপ এই বসন্ত লেভিনকে আরও চাঙ্গা করে তুলল, অতীত সব কিছু বর্জন করে নিজের সবল, স্বাধীন, নিঃসঙ্গ জীবন গড়ে তোলার সংকল্পে দৃঢ় হয়ে উঠলেন তিনি। যত পরিকল্পনা নিয়ে তিনি গাঁয়ে ফিরেছিলেন, তার অনেকগুলোই কার্যকৃত না হলেও প্রধান জিনিসটা, জীবনের শুচিতা তিনি অনুসরণ করে চললেন। পতনের পর যে লজ্জা সাধারণত পীড়া দিত তাঁকে, সেটা তিনি আর বোধ করছিলেন না, অসংকোচে তাকাতে পারতেন লোকেদের চোখের দিকে। ফেব্রুয়ারি মাসেই তিনি মারিয়া নিকোলায়েভনার কাছ থেকে এই মর্মে চিঠি পেয়েছিলেন যে নিকোলাই ভাইয়ের স্বাস্থ্য ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে, কিন্তু উনি চিকিৎসা করাতে চান না। চিঠি পেয়ে লেভিন মস্কো যান ভাইয়ের কাছে, ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া এবং খনিজ জল-চিকিৎসার্থে বিদেশে যাওয়ার জন্য তাকে বোঝান। ভাইকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে এবং তাকে না চটিয়ে টাকা দেওয়ার ব্যাপারটা এমন চমৎকার উত্রায় যে লেভিন খুশি হয়ে উঠেছিলেন। চাষবাস ছাড়াও, বসন্তে যার জন্য বিশেষ মনোযোগের দরজার হয়, বই পড়া ছাড়াও, লেভিন এ শীতে চাষবাস নিয়ে একটা রচনা লিখতে শুরু করেছিলেন। তার হুকটা হল চাষে জলবায়ু ও মৃত্তিকার মত মেহনতির চরিত্রকেও একটা অনপেক্ষ বস্তু হিসেবে ধরতে হবে, সুতরাং চাষ সম্পর্কে সমস্ত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত টানতে হবে কেবল জলবায়ু ও মৃত্তিকা থেকে নয়, জলবায়ু মৃত্তিকা এবং মেহনতির নির্দিষ্ট একটা অপরিবর্তনীয় চরিত্রের তথ্য থেকে। তাই একাকিত্ব সত্ত্বেও, অথবা একাকিত্বের দরুনই তাঁর জীবন ছিল অসাধারণ পরিপূর্ণ এবং কেবল মাঝে মধ্যে তাঁর মাথায় যে সব ভাবনা ঘুরছে তা আগাফিয়া মিখাইলোভনা ছাড়া অন্য কাউকে জানাবার একটা অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা বোধ করতেন। অবশ্য তাঁর সাথে পদার্থবিদ্যা, কৃষিতত্ত্ব এবং বিশেষ করে দর্শন নিয়ে আলোচনা কম হত না : দর্শন ছিল আগাফিয়া মিখাইলোভনার প্রিয় বিষয়।
বসন্ত অবারিত হয়ে উঠতে দেরি করছিল। লেন্ট পরবের শেষ সপ্তাহগুলোয় আবহাওয়া ছিল পরিষ্কার, তুহিন। দিনের বেলা রোদে বরফ গলত আর রাতে তাপমাত্রা নামত শূন্যাঙ্কের সাত ডিগ্রি নিচে : বরফের জমাট ত্বক হয়েছিল এমন যে লোকে স্লেজ চালাতো পথঘাট ছাড়াই। ইন্টার পরব শুরু হল তুষারপাতের মধ্যে। কিন্তু হঠাৎ ইস্টার সপ্তাহের দ্বিতীয় দিনে কালো মেঘ উড়িয়ে বইল গরম বাতাস, তারপর তিন দিন, তিন রাত ধরে চলল উদ্দাম আতপ্ত বৃষ্টি। বৃহস্পতিবার হাওয়ার বেগ কমল, এগিয়ে এল ঘন ধূসর কুয়াশা, প্রকৃতিতে যে অদল-বদল ঘটছে, যেন তার রহস্য চাপা দেবার জন্য। কুয়াশায় পানি ঝরত, ফেটে গিয়ে ভেসে যেত বরফের চাঙড়, দ্রুত বইতো ফেনিল ঘোলাটে স্রোত, আর সন্ধ্যায় ঠিক রাঙা ঢিপিতে কুয়াশা কেটে গেল, কালো মেঘকে হটিয়ে দিল হালকা পেঁজা তুলোর মত মেঘ, আকাশ ফরসা হয়ে শুরু হয়ে গেল আসল বসন্ত। সকালে উদীয়মান উজ্জ্বল সূর্য দ্রুত গ্রাস করতে থাকল পানির ওপর জমে ওঠা বরফের পাতলা চটা, আর উষ্ণ বাতাসের সবটাই কাঁপতে লাগল সঞ্জীবিত মাটির ভাপে ভরে উঠে। সবুজ হয়ে উঠল গত বছরের পুরনো, আর সম্প্রতি অঙ্কুরিত ঘাস, কোরক ফুটল গিল্ডার রোজ আর কার্যান্ট ঝোপে, বার্চ গাছে চ্যাটচেটে মদির পত্রপুট। সোনালি রং-ছিটানো উইলো শাখায় গুনগুনিয়ে উঠল উড়ে আসা মৌমাছি। মখমলি শ্যামলিমা আর তুষার লেগে থাকা ন্যাড়া মাঠের ওপর গান ধরল অদৃশ্য ভরত পাখি, নাবাল আর জলাভূমি ভাসিয়ে দেওয়া বাদামি পানির ওপর কাঁদুনি জুড়ল টিট্টিভেরা আর আকাশের উঁচু দিয়ে সারস আর হাঁসেরা উড়ে যেতে লাগল তাদের বাসন্তিক ক্রেংকার তুলে। গোষ্ঠভূমিতে হাম্বা হাম্বা ডাকতে লাগল ন্যাড়া ন্যাড়া, শুধু জায়গায় জায়গায় এখনো লোম লেগে থাকা গরু-বাছুর, ব্যা-ব্যা ডাক ছাড়া অরোমশ মায়েদের ঘিরে খেলা করতে লাগল ভেড়ার বাঁকা-ঠ্যাং বাচ্চাগুলো, পদচিহ্নে ভরা, শুকিয়ে ওঠা হাঁটা পথে ক্ষিপ্রপদ ছেলেমেয়েরা ছোটাছুটি লাগাল, পুকুরে কাপড়-চোপড় নিয়ে গালগল্প জুড়ল চাষী মেয়েরা, আঙিনায় লাঙল আর মই সারাতে ব্যস্ত চাষীদের কুড় ল খটখট শব্দ তুলল। এসে গেছে খাঁটি বসন্ত।
তেরো
লেভিন তাঁর প্রকাণ্ড হাইবুট পরে এবং এই প্রথম মেষচর্ম কোটে নয়, গায়ে সাধারণ একটা গরম জ্যাকেট চাপিয়ে রোদ্দুরে চোখ ধাঁধানো ঝলকানি দেওয়া জলস্রোত ভেঙে, কখনো বরফ কখনো চ্যাটচেটে কাদায় পা ফেলে খামার ঘুরতে গেলেন।
