তিনি কাঁপা-কাঁপা গলায় বলছিলেন, ‘আন্না, আন্না, সৃষ্টিকর্তার দোহাই, আন্না!… ‘
কিন্তু যত উচ্চ কণ্ঠে তিনি কথা বলছিলেন, ততই নিচে নেমে আসছিল আন্নার একদা গর্বিত, উৎফুল্ল, কিন্তু এখন লজ্জাবনত মাথা, যে সোফায় তিনি বসে ছিলেন, দেহ নোয়াতে নোয়াতে পড়ে গেলেন সেখান থেকে, মেঝেতে, ভ্রন্স্কির পায়ের কাছে; তিনি ধরে না ফেললে আন্না লুটিয়ে পড়তেন গালিচায়।
ভ্রন্স্কির হাত বুকে চেপে তিনি ফুঁপিয়ে উঠলেন, ‘সৃষ্টিকর্তা, ক্ষমা কর আমাকে।’
নিজেকে এত অপরাধী আর দোষী বলে তাঁর মনে হচ্ছিল যে দীনহীন হয়ে ক্ষমা চাওয়া ছাড়া তাঁর করার কিছু ছিল না; এবং এখন, জীবনে যখন ভ্রন্স্কি ছাড়া তাঁর আর কেউ নেই, তখন ক্ষমা প্রার্থনা তিনি জানালেন তাঁরই কাছে। তাঁর দিকে তাকিয়ে আন্না দৈহিকভাবে অনুভব করলেন তাঁর হীনতা, কিছু আর বলতে পারলেন না। যার প্রাণ সে হরণ করেছে তার দেহটা দেখে হত্যাকারী যা অনুভব করে, সেই অনুভূতি হচ্ছিল ভ্রন্স্কির। প্রাণ হরণ করা এই দেহটা যে তাঁদের ভালোবাসা, তাঁদের ভালোবাসার প্রথম পর্ব। লজ্জার এই ভয়ংকর মূল্য যার জন্য দিতে হয়েছে, সে কথা স্মরণ করায় বীভৎস, ন্যক্কারজনক কিছু একটা ছিল। নিজের আত্মিক নগ্নতার লজ্জা আন্নাকে পিষ্ট করছিল, সেটা সঞ্চারিত হচ্ছিল ভ্রন্স্কির মধ্যেও। কিন্তু নিহতের দেহের সম্মুখে হত্যকারীর সমস্ত আতঙ্ক সত্ত্বেও প্রয়োজন দেহটাকে খণ্ডবিখণ্ড করে লুকিয়ে ফেলা, হত্যা করে হত্যাকারী যা পেয়েছে সেটা কাজে লাগানো
আক্রোশে, যেন রিরংসায় হত্যাকারী সে দেহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাকে টেনে নিয়ে যায়, খণ্ডবিখণ্ড করে; ঠিক সেভাবেই ভ্রন্স্কি আন্নার মুখ আর বুক চুমুকে ভরে দিলেন। আন্না তাঁর হাত ধরে রাখলেন, নড়লেন না। হ্যাঁ, এ সেই চুমু যা কেনা হয়েছে লজ্জায়। হ্যাঁ, শুধু এই হাতটাই থাকবে সব সময় আমার—সহাপরাধীর হাত। সে হাত তুলে ধরে আন্না চুমু খেলেন। হাঁটু গেড়ে বসে ভ্রন্স্কি তাঁর মুখ দেখতে চাইছিলেন; কিন্তু মুখ ঢেকে রাখলেন আন্না, কিছুই বললেন না। অবশেষে, যেন নিজের ওপর জোর খাটিয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন, ঠেলে সরিয়ে দিলেন ভ্রন্স্কিকে। মুখটা তাঁর একইরকম সুন্দর, কিন্তু আরো বেশি করুণ লাগছিল তাতে করে।
বললেন, ‘সব শেষ। তুমি ছাড়া আমার কেউ আর নেই। সেটা মনে রেখো।
‘আমার যা জীবন সেটা মনে না রেখে আমি পারি কি করে? এক মিনিটের এই সুখের জন্য….
‘কিসের সুখ!’ আতংকে, বিতৃষ্ণায় আন্না বললেন, আর সে আতংক সঞ্চারিত হল অনুস্কির মধ্যেও। ‘সৃষ্টিকর্তার দোহাই, ও নিয়ে একটা কথাও নয়, একটা কথাও নয়!
দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে আন্না সরে গেলেন ভ্রন্স্কির কাছ থেকে।
‘আর একটা কথাও নয়’, পুনরুক্তি করলেন তিনি এবং ভ্রনৃস্কির কাছে যা অদ্ভূত মনে হয়েছিল, মুখে তেমন একটা নিরুত্তাপ নৈরাশ্যের ভাব নিয়ে আন্না বেরিয়ে গেলেন। তিনি টের পাচ্ছিলেন যে নবজীবনে প্রবেশের মুখে যে লজ্জা আনন্দ আর আতংক বোধ করছেন, এই মুহূর্তে তা ভাষায় প্রকাশ করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব; তা নিয়ে কথা বলার ইচ্ছে হচ্ছিল না তাঁর, অযথার্থ শব্দে অনুভূতিটাকে স্থুল করে তুলতে চাইছিলেন না। এবং পরেও, দ্বিতীয়, তৃতীয় দিনেও এই অনুভূতিগুলোর সমস্ত জটিলতা ব্যক্ত করার মত কথা তিনি খুঁজে পেলেন না তাই নয়, প্রাণের ভেতর যা রয়েছে, নিজে নিজেই তা নিয়ে চিন্তা করে দেখার মত ভাবনাও তাঁর এল না।
নিজেকে তিনি বললেন, ‘না, এখন আমি এ নিয়ে ভাবতে পারছি না; ওটা হবে পরে যখন শান্ত হতে পারব।’ কিন্তু ভাবনার জন্য এই প্রশান্তি এল না কখনো। কি তিনি করেছেন, কি তাঁর দশা হবে, কি করা উচিত সে কথা ভাবতে গেলেই প্রতিবার আতংক হত তাঁর, মন থেকে ভাবনাটা তাড়িয়ে দিতেন।
বলতেন, ‘পরে, পরে, যখন সুস্থির হব।’
কিন্তু ঘুমের মধ্যে, নিজের ভাবনার ওপর যখন তাঁর দখল থাকা না, তখন তার সমস্ত কদর্য নগ্নতায় তাঁর অবস্থাটা ভেসে উঠত তাঁর কাছে। প্রায় প্রতি রাতে একই স্বপ্ন হানা দিত তাঁকে। তিনি দেখতেন, দুজনেই ওঁরা তাঁর স্বামী, দুজনেই আদরে ছেয়ে ফেলছেন তাঁকে। কারেনিন তাঁর হাতে চুমু খেয়ে বলছেন : এখন চমৎকার হল! আলেকসেই ভ্রন্স্কিও রয়েছেন সেখানে, তিনিও তাঁর স্বামী। আগে এটা অসম্ভব মনে হত বলে অবাক লাগছে আন্নার, হেসে ওঁদের উনি বোঝালেন এটা অনেক সহজ, দুজনেই ওঁরা এখন সন্তুষ্ট আর সুখী। কিন্তু এ স্বপ্ন বিভীষিকার মত পিষ্ট করত তাঁকে, আতংকে ঘুম ভেঙে যেত।
বারো
মস্কো থেকে ফেরার পর প্রথম প্রথম, প্রত্যাখ্যানের যে গ্লানি তার কথা মনে পড়তেই লেভিন প্রতিবার কেঁপে কেঁপে লাল হয়ে উঠলেও নিজেকে বোঝাতেন : ‘পদার্থবিদ্যায় ফেল করে দ্বিতীয় কোর্সেই যখন আমাকে থেকে যেতে হয়, তখনো তো আমার দফা শেষ হয়ে গেল ভেবে এমনি করেই লাল হয়ে কেঁপে উঠতাম; বোনের যে ব্যাপারটার ভার দেওয়া হয়েছিল আমাকে, সেটা পণ্ড করে ফেলার পরও ঠিক এমনি, নিজের দফা শেষ হয়ে গেল বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু কি দাঁড়াল? এখন, সময় যখন কেটে গেছে, তখন মনে করে অবাক লাগে কি করে আমাকে তা কষ্ট দিতে পেরেছিল। এই দুঃখটার বেলাতেই তাই হবে। সময় কেটে যাবে, আমিও নির্বিকার হয়ে উঠব ব্যাপারটায়।’
