মুখখানা তাঁর অসুন্দর, বিষণ্ণ, আন্না আগে যা কখনো দেখেননি। মাথা পেছনে আর পাশে হেলিয়ে ক্ষিপ্র হাতে চুলের কাঁটা খুলতে লাগলেন। ‘তা, শুনছি যা বলবেন’, আন্না বললেন ধীরভাবে, কৌতুক করে, ‘এমন কি সাগ্রহেই শুনছি, কেননা বুঝতে চাই কি ব্যাপার।
কথা বলার সময় আন্নার অবাক লাগল তাঁর কথার স্বাভাবিক সুস্থির সুনিশ্চিত সুরে আর শব্দনির্বাচনে।
আলেক্সেই আলেক্সান্দ্রভিচ কারেনিন শুরু করলেন, ‘তোমার হৃদয়াবেগের সমস্ত খুঁটিনাটিতে যাবার অধিকার আমার নেই, এবং মোটের ওপর সেটাকে নিষ্ফল, এমনকি ক্ষতিকর বলেই আমি মনে করি। নিজের প্রাণের ভেতরটা খুঁড়তে গিয়ে আমরা এমন জিনিস খুঁড়ে বার করি যা অলক্ষ্যে থাকলেই ভালো। তোমার হৃদয়াবেগ, সেটা তোমার বিবেকের ব্যাপার; কিন্তু তোমার দায়-দায়িত্ব দেখিয়ে দিতে আমি তোমার কাছে, নিজের কাছে, সৃষ্টিকর্তার কাছে বাধ্য। আমাদের দুজনের জীবন বাঁধা আর তা বেঁধে দিয়েছেন লোকে নয়, সৃষ্টিকর্তা। এ বাঁধন ছেঁড়া সম্ভব কেবল পাপে আর এ ধরনের পাপের শাস্তি গুরুতর।’
‘কিছুই বুঝছি না। আহ্ সৃষ্টিকর্তা, কি যে ঘুম পাচ্ছে!’ আটকে থেকে যাওয়া কাঁটার খোঁজে চুলে আঙুল চালাতে চালাতে আন্না বললেন।
‘আন্না, দোহাই তোমার, অমন করে বলো না’, নম্রভাবে বললেন স্বামী, ‘হয়ত ভুল হচ্ছে আমার, কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি যা বলছি, সেটা বলছি যেমন নিজের জন্য তেমনি তোমার জন্যও। আমি তোমার স্বামী এবং তোমাকে ভালোবাসি।’
মুহূর্তের জন্য বিশীর্ণ হয়ে উঠল আন্নার মুখ, দৃষ্টিতে কৌতুকের ফুলকি নিবে গেল। কিন্তু ‘ভালোবাসা’ কথাটা আবার ক্ষুব্ধ করে তুলল তাঁকে। মনে মনে ভাবলেন, ‘ভালোবাসে? ভালোবাসতে ও পারে নাকি? ভালোবাসা নামে কিছু- একটা হয়ে থাকে এ কথাটা না শুনলে কখনো সে শব্দটা ব্যবহার করত না। ও যে জানেই না ভালোবাসা কি জিনিস।’
বললেন, ‘কারেনিন, সত্যিই কিছু বুঝতে পারছি না। সুনির্দিষ্ট করে বলো কি তোমার মনে হচ্ছে…’
‘দয়া করে সবটা বলতে দাও। আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু আমি নিজের কথা বলছি না; এক্ষেত্রে প্রধান ব্যক্তি হল আমাদের ছেলে আর তুমি নিজে। খুবই সম্ভব, আবার বলছি, আমার কথাগুলো তোমার কাছে একেবারেই অযথা এবং অপ্রাসঙ্গিক লাগতে পারে; খুবই সম্ভব যে তা আসছে আমার বিভ্রান্তি থেকে। সেক্ষেত্রে অনুরোধ, মাপ কর আমাকে। কিন্তু তুমি নিজে যদি অনুভব কর যে অন্তত খানিকটা ভিত্তি এর আছে, তাহলে মিনতি করি, ভেবে দেখো এবং তোমার অন্তর যদি বলে, তাহলে আমাকে বলো…’
যা বলার জন্য কারেনিন তৈরি হয়েছিলেন তা যে তিনি বললেন না, সেটা খেয়ালই হল না তাঁর।
‘আমার বলবার কিছু নেই, আর সত্যি…’ বহু কষ্টে হাসি চেপে তাড়াতাড়ি বললেন আন্না, ‘সত্যি ঘুমাবার সময় হয়েছে।’
কারেনিন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন এবং আর কিছু না বলে গেলেন শোবার ঘরে।
আন্না যখন শোবার ঘরে এলেন, উনি তখন বিছানায়। শক্ত করে ঠোঁট চাপা, চোখ ফেরালেন না আন্নার দিকে। আন্না শুলেন নিজের বিছানায় এবং প্রতি মিনিট অপেক্ষা করতে লাগরেন যে উনি আরো একবার কথা বলবেন তাঁর সাথে। যা উনি বলবেন তাতে আন্নার ভয়ও হচ্ছিল, আবার সেটা চাইছিলেনও। কিন্তু উনি চুপ করে রইলেন। নিশ্চল হয়ে আন্না অপেক্ষা করলেন অনেকক্ষণ, তারপর ওঁর কথা তিনি ভুলে গেলেন। ভাবছিলেন তিনি অন্য আরেকজনের কথা, তাঁকে তিনি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলেন, টের পাচ্ছিলেন যে তাঁর কথা ভাবতে গিয়ে বুক তাঁর ভরে উঠছে আকুলতা আর অপরাধজনক আনন্দে। হঠাৎ তাঁর কানে এল মাপা তালে নাক ডাকার প্রশান্ত শব্দ। প্রথমটায় যেন কারেনিন নিজের নাক ডাকার শব্দে ভয় পেয়ে থেমে গেলেন, কিন্তু দুটো নিঃশ্বাসের পর নতুন প্রশান্ত লয়ে নাক ডাকা শুরু হল আবার।
‘দেরি হয়ে গেছে, দেরি, দেরি’, মুখে হাসি নিয়ে ফিসফিস করলেন আন্না। বহুক্ষণ চোখ মেলে নিশ্চল হয়ে শুয়ে রইলেন তিনি, তাঁর মনে হল সে চোখের দীপ্তি তিনি নিজেই অন্ধকারে দেখতে পাচ্ছেন।
আন্না কারেনিনা – ২.১০
দশ
আলেক্সেই আলেক্সান্দ্রভিচ কারেনিন এবং তাঁর স্ত্রীর সেদিন থেকে শুরু হল নতুন জীবন। বিশেষ কিছু একটা ঘটল না। বরাবরের মত আন্না যাতায়াত করতে থাকলেন সমাজে, প্রায়ই যেতেন প্রিন্সেস বেত্সির কাছে, এবং সর্বত্রই দেখা হত ভ্রন্স্কির সাথে। কারেনিনের তা চোখে পড়ত, কিন্তু কিছুই করার সাধ্য তাঁর ছিল না। আন্নার কাছ থেকে কৈফিয়ত পাবার সমস্ত চেষ্টা তাঁর কি-একটা আমুদে ভুল বোঝাবুঝির নীরন্ধ্র দেয়ালের সামনে ঠেকে যেত। বাইরেটা রইল একইরকম, কিন্তু ভেতরে ভেতরে বদলে গিয়েছিল ওঁদের সম্পর্ক। রাষ্ট্রীয় ক্রিয়াকর্মে অমন শক্তিধর লোক কারেনিন এক্ষেত্রে নিজেকে শক্তিহীন বলে অনুভব করতে থাকলেন। যে খ তাঁর ওপর উত্তোলিত বলে তিনি টের পাচ্ছিলেন, কসাইখানার বাধা ষাঁড়ের মত মাথা নামিয়ে তার অপেক্ষা করছিলেন তিনি। এ নিয়ে যতবার তিনি ভেবেছেন, ততবারই মনে হয়েছে যে আরো একবার চেষ্টা করা দরকার, সহৃদয়তা, কোমলতা, বোঝানোর শক্তিতে তাঁকে বাঁচানোর, তাঁর চৈতন্যোদয়ের আশা এখনো আছে, এবং প্রতিদিন তিনি তাঁর সাথে কথা বলার চেষ্টা করতেন। কিন্তু কথা বলা শুরু করে প্রতিবারই তিনি টের পেতেন, অকল্যাণ আর প্রতারণার যে প্রেত আন্নাকে অভিভূত করেছে, তা অভিভূত করছে তাঁকেও, এবং তিনি যা বলতে চেয়েছিলেন সেই বিষয়ে আর সেই সুরে তিনি কথা বলছেন না। তিনি যা বলছেন তা যারা বলে তাদের নিয়ে আধা-বিদ্রূপের সুরে তিনি অভ্যস্ত সেই সুরে কথা বলতেন তাঁর সাথে নিজের অজ্ঞাতে। অথচ যা আন্নাকে বলা দরকার তা এ সুরে বলা চলে না।
এগারো
আগেকার সমস্ত কামনাকে স্থানচ্যুত করে প্রায় গোটা এক বছর ধরে যা ছিল ভ্রন্স্কির জীবনের ঐকান্তিক কামনা, আন্নার কাছে যা ছিল অসম্ভব, ভয়ংকর এবং সেহেতু আরো বেশি মোহনীয় সুখস্বপ্ন, তা তৃপ্ত হল। বিবর্ণ হয়ে, নিচের কম্পমান চোয়াল নিয়ে ভ্রন্স্কি দাঁড়িয়ে ছিলেন আন্নার কাছে, মিনতি করছিলেন তাঁকে শান্ত হতে, কেন, কিসের জন্য তা তিনি নিজেও জানতেন না।
