সিঁড়িতে নারীর পদশব্দ। কারেনিন তাঁর বক্তব্যে প্রস্তুত হয়ে গিঁটে গিঁটে আঙুল জড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, আশা করছিলেন আরেকটা আঙুল মটকানির শব্দ। মটকাল।
সিঁড়িতে পদশব্দ শোনার আগেই তিনি টের পাচ্ছিলেন আন্নার কাছিয়ে আসা, আর নিজের বক্তব্যে তিনি তুষ্ট বোধ করলেও আসন্ন কথোপকথনে তাঁর ভয় হচ্ছিল।
নয়
আন্না হুডের থুপি নাড়তে নাড়তে মাথা নিচু করে আসছিলেন। মুখ তাঁর জ্বলজ্বল করছিল, কিন্তু তার ঝলকটা আনন্দের নয়, ঘোর অন্ধকার রাতে অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহ ঝলকের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল তা। স্বামীকে দেখে আন্না মাথা তুললেন, হাসলেন যেন ঘুম ভেঙ্গে উঠছেন।
·
‘এখনো তুমি শোওনি? আশ্চর্য ব্যাপার!’ বলে, হুড খুলে ফেলে না থেমে গেলেন তাঁর ড্রেসিং-রুমে। দরজার পেছন থেকে বললেন, ‘সময় হয়ে গেছে কারেনিন।’
‘আন্না, তোমার সাথে কিছু কথা বলার আছে।’
‘আমার সাথে?’ অবাক হয়ে আন্না বললেন, দরজার পেছন থেকে বেরিয়ে এসে তাকালেন স্বামীর দিকে। ‘কি ব্যাপার? কি নিয়ে?’ বসে জিজ্ঞেস করলেন তিনি, ‘বেশ, এত দরকার পড়েছে যখন, কথা বলা যাক। তবে ঘুমনোই ছিল ভালো।’
আন্না জিবের ডগায় যা আসছিল তাই বলছিলেন, আর নিজেই সে কথা শুনে অবাক মানছিলেন তাঁর মিথ্যে বলার সামর্থ্যে। কি সহজ, স্বাভাবিক তাঁর কথা, তাঁকে দেখাচ্ছেও ঠিক যেন তাঁর ঘুম পাচ্ছে। তিনি টের পাচ্ছিলেন যে মিথ্যার দুর্ভেদ্য বর্মে তিনি আবৃত। টের পাচ্ছিলেন কি একটা অদৃশ্য শক্তি তাঁকে সাহায্য করছে, সহায়তা করছে।
‘আন্না, তোমাকে সাবধান করে দিতে হচ্ছে আমাকে’, উনি বললেন।
‘সাবধান?’ আন্না বললেন, ‘কিসের জন্য?’
আন্না এমন সহজে, এত হাসি-খুশিতে তাকিয়ে ছিলেন যে তাঁর স্বামী ওঁকে যেমন জানতেন তেমন যাঁরা জানতেন না, তাঁদের কাছে তাঁর কথার ধ্বনিতে বা অর্থে অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ত না। কিন্তু ওঁকে যিনি জানেন, যিনি জানেন যে শুতে পাঁচ মিনিট দেরি হলে আন্না তা লক্ষ্য করেন, তার কারণ বলেন, যিনি জানেন যে সব কিছু আনন্দ, ফুর্তি, দুঃখের কথা তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁকে জানান,—তাঁর যে এখন চোখে পড়ল যে আন্না তাঁর অবস্থা লক্ষ্য করতে চাইছেন না, নিজের সম্পর্কে একটা কথাও বলতে চাইছেন না, তার তাৎপর্য অনেক। তিনি দেখতে পেলেন তাঁর প্রাণের যে গহন আগে সব সময় ছিল তাঁর কাছে উন্মুক্ত, তা এখন রুদ্ধ। শুধু তাই নয়, তাঁর গলার সুর থেকে তিনি দেখতে পেলেন যে আন্না এতে বিব্রত বোধ করছেন না, বরং সোজাসুজি যেন বলছেন : হ্যাঁ রুদ্ধ, তাই হওয়া উচিত, ভবিষ্যতেও তা রুদ্ধ থাকবে। এখন তাঁর নিজেকে সেই লোকের মত মনে হল যে বাড়ি ফিরে এসে দেখে যে বাড়ি তালাবন্ধ। ‘কিন্তু হয়ত চাবিটা এখনো পাওয়া যেতে পারে’, ভাবলেন কারেনিন।
তিনি মৃদুস্বরে বললেন, ‘আমি তোমাকে সাবধান করে দিতে চাই যে নিজের অপরিণামদর্শিতা ও চিত্তচাপল্যে তুমি সমাজে তোমাকে নিয়ে কথা রটবার উপলক্ষ্য যোগাতে পার। আজ কাউন্ট ভ্রন্স্কির সাথে’ (নামটা উচ্চারণ করলেন দৃঢ়ভাবে, সুস্থির যতি দিয়ে) ‘তোমার বড় বেশি উচ্ছল কথোপকথন সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।’
তিনি কথা বলার সময় তাকিয়ে ছিলেন তাঁর হাস্যময় এবং অধুনা তার দুর্জ্ঞেয়তায় ভয়ংকর চোখের দিকে এবং কথা বলতে বলতেই টের পাচ্ছিলেন তার সমস্ত নিষ্ফলতা ও অকার্যকারিতা।
‘চিরকালই তুমি ওইরকম। আমার ব্যাজার লাগছে, কখনো-বা এটা তোমার ভালো লাগে না, আবার আমি হাসিখুশি, কখনো-বা সেটাও ভালো লাগে না তোমার। আজ আমার ব্যাজার লাগেনি। তাতে ঘা লেগেছে মনে?’ আনান বললেন যেন ওঁকে একেবারে বোঝেননি, আর উনি যা বলেছিলেন তার ভেতরে ইচ্ছে করেই বুঝি বুঝলেন শুধু শেষ কথাটা। কারেনিন কেঁপে উঠলেন, চেষ্টা করলেন আঙুল মটকাবার।
‘আহ্, আঙুল মটকিও না দয়া করে। একেবারে ভালো লাগে না আমার’, আন্না বললেন।
‘আন্না, একি তুমি?’ জোর করে হাতের চাঞ্চল্য সংযত রেখে বললেন কারেনিন।
‘কিন্তু কি হল?’ অতি অকপট এবং কৌতুকমণ্ডিত বিস্ময়ে আন্না বললেন, ‘কি চাও তুমি আমার কাছ থেকে?’
কারেনিন চুপ করে রইলেন, কপাল আর চোখ রগড়ালেন হাত দিয়ে। দেখতে পাচ্ছিলেন যে তিনি যা চেয়েছিলেন, অর্থাৎ সমাজের চোখে একটা ভুল করা থেকে স্ত্রীকে সাবধান করে দেওয়া—তার বদলে যা আন্নার বিবেকের ব্যাপার, অজ্ঞাতসারেই তাতে তিনি ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন, মাথা ঠুকছেন কল্পিত এক দেয়ালে।
তিনি ধীর-স্থির-নিরুত্তাপ গলায় বললেন, ‘তোমাকে আমি যে কথা বলতে চাই, অনুরোধ করি তার সবটা শোনো। আমি মানি, যা তুমি জানো, ঈর্ষা হল অপমানকর হীনতাসূচক একটা মনোভাব, এ মনোভাবে নিজেকে আমি কদাচ চালিত হতে দেব না; কিন্তু শোভনতার নির্দিষ্ট কতকগুলো নিয়ম আছে যা লঙ্ঘন করা চলে না বিনা শাস্তিতে। আজ আমি লক্ষ্য করিনি, কিন্তু সাধারণ যে প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল তা থেকে বলা যায় যে তুমি এমন আচরণ করেছ যা মোটেই বাঞ্ছনীয় নয়।’
‘একেবারেই কিছু বুঝতে পারছি না’, কাঁধ কুঁচকে আন্না বললেন। ভাবলেন, ‘ওঁর এতে কিছু এসে যায় না। কিন্তু সমাজের চোখে পড়েছে কিনা, তাই বিচলিত হয়ে উঠেছেন।’
‘তোমার শরীর ভালো নেই কারেনিন’, উঠে দাঁড়িয়ে বেরিয়ে যেতে গেলেন; কিন্তু স্বামী তাঁর আগে গিয়ে যেন থামাতে চাইলেন তাঁকে।
