পোশাক না ছেড়ে সমতাল পদক্ষেপে উনি পায়চারি করছিলেন একটামাত্র বাতিতে আলোকিত খাবার ঘরের শব্দিত পার্কেটে, অন্ধকার ড্রয়িং-রুমের গালিচার ওপর দিয়ে, যেখানে আলো প্রতিফলিত হচ্ছিল কেবল সোফার ওপরে টাঙানো সম্প্রতি আঁকানো তাঁরই বৃহৎ পোর্ট্রেটটায়, গেলেন আন্নার কেবিনেট পেরিয়ে, সেখানে দুটো মোমবাতির আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে আন্নার বান্ধবী আর আত্মীয়-স্বজনের প্রতিকৃতি, লেখার টেবিলে তাঁর বহুপরিচিত সুন্দর সুন্দর আভরণ। সে ঘর পেরিয়ে তিনি যাচ্ছিলেন শোবার ঘরের দরজা পর্যন্ত, তারপর আবার ফিরছিলেন।
প্রত্যেকটা পাড়ির শেষে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আলোকিত ডাইনিং-রুমের পার্কেটের ওপর তিনি থামছিলেন, মনে মনে বলছিলেন, ‘হ্যাঁ, এটার একটা সমাধান করা উচিত, বন্ধ করা দরকার, নিজের অভিমত দিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত জানাতে হবে।’ তারপর ফিরছিলেন। ‘কিন্তু কি অভিমত? কিসের সিদ্ধান্ত?’ ড্রয়িং-রুমে নিজেকে তিনি বললেন কিন্তু কোন উত্তর খুঁজে পেলেন না। ‘হ্যাঁ’, কেবিনেটে ঢোকার মুখে ভাবলেন, ‘শেষ পর্যন্ত ঘটেছে-টা কি? অনেকক্ষণ ধরে আন্না কথা বলেছে ওর সাথে। কিন্তু কি হল তাতে? সমাজে নারীরা তো কতরকম লোকের সাথেই কথা বলে থাকে। তা ছাড়া, ঈর্ষা করার অর্থ ওকে আমাকে, দুজনকেই হীন করা’, আন্নার কেবিনেটে ঢুকে তিনি নিজেকে বোঝালেন। কিন্তু এ যুক্তি আগে তাঁর কাছে বেশ ভারিক্কি বোধ হলেও এখন তার আর কোন ভার ছিল না, অর্থ ছিল না। শোবার ঘরের দরজা থেকে তিনি আবার এলেন হলে; কিন্তু, যেই তিনি পেছন ফিরে ঢুকলেন অন্ধকার ড্রয়িং-রুমে, অমনি কি একটা কণ্ঠস্বর তাঁকে বলল ওটা ঠিক নয়, যখন অন্য লোকেদের নজরে পড়েছে, তখন কিছু একটা আছে। ডাইনিং- রুমে তিনি আবার নিজেকে বললেন, ‘হ্যাঁ, এটার একটা সমাধান করে, বন্ধ করে নিজের অভিমত দেওয়া দরকার…’ এবং পুনরায় ড্রয়িং-রুমে মোড় ফেরার সময় উনি নিজেকে বললেন : কি করে সমাধান করা যায়? পরে নিজেকে প্রশ্ন করলেন, কি ঘটেছে? এবং জবাব দিলেন : কিছুই না, স্মরণ করলেন যে ঈর্ষা হল স্ত্রীর পক্ষে অপমানকর একটা মনোভাব, কিন্তু ড্রয়িং-রুমে আবার নিশ্চিত হয়ে উঠলেন যে ঘটেছে কিছু একটা। তাঁর দেহের মত ভাবনাও নতুন কিছুতে উপনীত না হয়ে পাক খাচ্ছিল একই বৃত্তে। সেটা তাঁর খেয়াল হল, কপাল রগড়ে তিনি বসলেন আন্নার কেবিনেটে।
এমন সময় তাঁর টেবিলে ম্যালাকাইট লিখন-সরঞ্জাম আর শুরু করা একটা চিরকুটের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বদলে গেল তাঁর চিন্তা। আন্না সম্পর্কে, কি তিনি ভাবেন, অনুভব করেন, সে নিয়ে ভাবনা হল তাঁর। এই প্রথম স্পষ্ট করে তাঁর কল্পনায় ভেসে উঠল আন্নার ব্যক্তিগত জীবন, তাঁর ভাবনাচিন্তা, তাঁর আকাঙ্ক্ষা, আর ওঁর যে নিজস্ব একটা জীবন থাকতে পারে, থাকার কথা, এ কথা ভেবে তাঁর এত ভয় হল যে তিনি তাড়াতাড়ি করে সে চিন্তা তাড়াতে চাইলেন। এটা সেই ঘূর্ণিজল যেখানে তাকাতে তাঁর আতঙ্ক হয়। মনে মনে এবং অনুভূতিতে অন্য একজনের স্থলে নিজেকে বসানো, এমন একটা আত্মিক উদ্যোগ কারেনিনের কাছে বিজাতীয়। এরূপ আত্মিক উদ্যোগকে তিনি মনে করতেন ক্ষতিকর, বিপজ্জনক কল্পচারিতা।
তিনি ভাবলেন, ‘সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার এই যে এখন, আমার ব্যাপারটা যখন ঢুকতে চলেছে’ (যে প্রকল্পটা তিনি এখন পাশ করিয়ে নিতে যাচ্ছিলেন, তাঁর কথা ভাবছিলেন তিনি) ‘যখন আমার দরকার একান্ত শান্তি আর প্রাণের সমস্ত শক্তি, এখনই কিনা আমার ওপর ভেঙে পড়ল এই অর্থহীন উদ্বেগ। কিন্তু কি করি? আমি তেমন লোক নই যে অস্থিরতা আর উদ্বেগে ভোগে অথচ সোজাসুজি তাকাবার শক্তি ধরে না।’
‘আমাকে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং চুকিয়ে দিতে হবে’; তিনি বললেন শব্দ করেই।
‘ওর হৃদয়াবেগের প্রশ্ন, কি তার অন্তরে ঘটেছে এবং ঘটতে পারে, সেটা আমার নয়, তার বিবেকের ব্যাপার, ধর্মের ব্যাপার’, মনে মনে তিনি ভাবলেন এবং এই উপলব্ধিতে তাঁর হালকা লাগল যে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য বিধিবিধানের ধারাটি তিনি খুঁজে পেয়েছেন।
‘তাহলে’, স্থির করলেন তিনি, ‘হৃদয়াবেগ ইত্যাদি মূলত ওর বিবেকের প্রশ্ন, ওটা আমার কোন ব্যাপার হতে পারে না। আমার কর্তব্য পরিষ্কার, পরিবারের কর্তা হিসেবে ওকে চালানো আমার কর্তব্য, সুতরাং অংশত আমার দায়িত্ব থাকছে; যে বিপদটা আমি দেখতে পাচ্ছি সেটা দেখাতে হবে ওকে, সাবধান করে দিতে হবে, এমনকি অধিকারও খাটাতে হবে। এ সব ওকে বলতে হবে আমাকে।’ কারেনিন স্ত্রীকে কি বলবেন সেটা পরিষ্কার দানা বেঁধে উঠল তাঁর মাথায়। আর কি বলবেন তা ভেবে তাঁর এই জন্য আফসোস হল যে এমন একটা অলক্ষ্য গার্হস্থ্য ব্যাপারে তাঁর সময় আর চিত্তশক্তি ব্যয় করতে হচ্ছে; কিন্তু তাহলেও একটা প্রতিবেদনের আকারে তাঁর বক্তব্য এবং পরবর্তী ভাষণ তাঁর মাথায় একটা পরিষ্কার সুস্পষ্ট রূপ নিল।
‘আমাকে এই কথা বলতে এবং বোঝাতে হবে : প্রথমত, সামাজিক মতামত ও শোভনতার তাৎপর্যের ব্যাখ্যা; দ্বিতীয়ত, বিবাহের ধর্মীয় ব্যাখ্যা; তৃতীয়ত, যদি প্রয়োজন হয়, ছেলের কি দুর্ভাগ্য হতে পারে তার উল্লেখ; চতুর্থত, তার নিজের দুর্ভাগ্যের কথা।’ এবং হাত নিচু করে আঙুলে আঙুলে গিঁট বেঁধে কারেনিন আঙুল মটকালেন। হাতে হাত দিয়ে আঙুল মটকানো—এই বিছ্ছিরি অভ্যাসটা সব সময়ই তাঁকে শান্ত করে আনত, পৌঁছে দিত একটা সুনির্দিষ্ট অভিমতে, যা এখন তাঁর নিতান্ত প্রয়োজন। গেটের কাছে গাড়ি আসার শব্দ শোনা গেল। কারেনিন হলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
