সবার ওপরেই একটা অপ্রীতিকর ছাপ পড়ছে লক্ষ্য করে প্রিন্সেস বেত্সি, কারেনিনর কথা শুনে যাবার জন্য তাঁর নিজের জায়গায় আরেকজনকে বসিয়ে গেলেন আন্নার কাছে।
বললেন, ‘আপনার স্বামীর কথায় স্পষ্টতা আর যথাযথতা আমাকে সব সময়ই অবাক করে দেয়। উনি যখন বলেন, সবচেয়ে তূরীয় ব্যাপারগুলোও তখন বোধগম্য হয়ে ওঠে আমার কাছে। ‘
‘ও, হ্যাঁ!’ সুখের হাসিতে জ্বলজ্বল করে উঠে এবং বেত্সি যা বলছিলেন তার একটা কথাও না বুঝে আন্না বললেন। বড় টেবিলটায় উঠে এলেন তিনি, যোগ দিলেন সাধারণ কথাবার্তায় 1
কারেনিন আধঘণ্টাখানেক থেকে স্ত্রীর কাছে এসে তাঁর সাথে বাড়ি যেতে বললেন, তাঁর দিকে না তাকিয়েই আন্না জবাব দিলেন যে নৈশাহারের জন্য তিনি থেকে যাবেন। কারেনিন মাথা নুইয়ে বেরিয়ে গেলেন।
ম্যাডাম কারেনিনার কোচোয়ান, স্থূলকায় বৃদ্ধ তাতারের পক্ষে গেটের কাছে ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া বাঁয়ের ছাইরঙা ঘোড়াটাকে সামলে রাখা কঠিন হচ্ছিল। দরজা খুলে দাঁড়িয়ে ছিল চাপরাশি, খানসামা দাঁড়িয়ে ছিল বাইরের দরজাটা ধরে। ছোট্ট ক্ষিপ্র হাতে তাঁর ফারকোটের হুকে আটকে যাওয়া আস্তিনের লেস ছাড়াতে ছাড়াতে মাথা নিচু করে উৎফুল্ল হয়ে আন্না শুনছিলেন তাঁকে গাড়িতে তুলে দিতে এসে যা বলছিলেন ভ্রন্স্কি।
তিনি বলছিলেন, ‘আপনি কিছু বললেন না; ধরা যাক আমিও কিছু দাবি করছি না, কিন্তু আপনি তো জানেন, বন্ধুত্বে আমার কাজ নেই, জীবনের একটা সুখই আমার পক্ষে সম্ভব, এটা সেই শব্দ যা আপনার এত অপছন্দ… হ্যাঁ, ভালোবাসা…’
‘ভালোবাসা…’, ধীরে ধীরে, আভ্যন্তরীণ কোন কণ্ঠস্বরে পুনরুক্তি করলেন আন্না, তারপর হঠাৎ হুকটা ছাড়ানো মাত্র তিনি যোগ দিলেন, ‘কথাটা আমি ভালোবাসি না কারণ ওর তাৎপর্য আমার কাছে বড় বেশি, আপনার পক্ষে যা বোঝা সম্ভব তার চেয়েও অনেক’, তারপর ওঁর মুখের দিকে তাকালেন তিনি, ‘আসি!’
ওঁর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন আন্না। তারপর শান্ত পদক্ষেপে খানসামার পাশ দিয়ে অন্তর্ধান করলেন গাড়ির ভেতরে।
তাঁর দৃষ্টিপাত, হাতের স্পর্শ যেন আগুন ছুঁইয়ে দিল ভ্রন্স্কির দেহে। তাঁর হাতের যেখানটা আন্না স্পর্শ করেছিলেন, সেখানে চুমু খেলেন তিনি, তারপর সুখাবেশে এই চেতনা নিয়ে বাড়ি ফিরলেন যে গত দু’মাসে যা হয়েছে তার চেয়ে তাঁর লক্ষ্যের অনেক কাছাকাছি তিনি এসে গিয়েছেন আজ সন্ধ্যায়।
আট
ভ্রন্স্কির সাথে তাঁর স্ত্রী আলাদা একটা ছোট টেবিলের কাছে বসে কি নিয়ে যেন সজীব কথাবার্তা বলছিলেন, এতে আলেকসেই আলেক্সান্দ্রভিচ কারেনিন অস্বাভাবিক বা অশোভন কিছু দেখেননি; কিন্তু তাঁর নজরে পড়েছিল যে ড্রয়িং- রুমের অন্যান্যদের কাছে এটা কেন জানি অস্বাভাবিক এবং অশোভন ঠেকেছিল, সুতরাং তাঁর কাছেও এটা মনে হল অশোভন। ঠিক করলেন, স্ত্রীকে সে কথা বলা দরকার।
কারেনিন বাড়ি ফিরে তাঁর কেবিনেটে ঢুকলেন, যা তিনি সাধারণ করে থাকেন, ইজি-চেয়ারে বসে পোপতন্ত্র সম্পর্কে একটা বইয়ের কাগজ-কাটা ছুরি চাপা দেওয়া জায়গাটা খুললেন এবং পড়ে গেলেন রাত একটা পর্যন্ত যা তাঁর অভ্যাস; শুধু মাঝে-মধ্যে তাঁর টিপ কপালখানা মুছে, মাথা ঝাঁকিয়ে কি একটা যেন তাড়াতে চাইছিলেন। নির্দিষ্ট সময়ে উঠে তিনি তাঁর নৈশ প্রসাধন সারলেন। আন্না তখনো ফেরেননি। বই বগলে করে ওপরে উঠলেন তিনি; কিন্তু তাঁর কর্মক্ষেত্রের ব্যাপার নিয়ে অভ্যস্ত ভাবনা ও পরিকল্পনাদির বদলে আজ রাতে তাঁর মন ভরে ছিল স্ত্রীর ভাবনায়, কি- একটা অপ্রীতিকর তাঁর ঘটেছে তাই নিয়ে। নিজের অভ্যাসের যা বিপরীত বিছানায় তিনি শুলেন না, পিঠের পেছনে হাতে হাত দিয়ে পায়চারি করতে লাগরেন ঘরগুলোয়। উনি শুতে পারছিলেন না, টের পাচ্ছিলেন, যে-অবস্থাটার উদ্ভব হয়েছে, সবার আগে তা নিয়ে ভাবা দরকার।
কারেনিন যখন নিজেই ঠিক করে নেন যে স্ত্রীর সাথে কথা বলা দরকার, তখন জিনিসটা তাঁর কাছে সহজ এবং সাধারণ মনে হয়েছিল; কিন্তু এখন এই নবোদ্ভূত অবস্থাটা নিয়ে ভাবতে গিয়ে ব্যাপারটা তাঁর কাছে খুবই কঠিন আর জটিল মনে হল।
কারেনিন ঈর্ষাপরায়ণ লোক নন। তাঁর ধারণা ছিল ঈর্ষাকে স্ত্রীকে অপমান করা হয়, অথচ স্ত্রীর প্রতি আস্থা থাকা উচিত। কেন আস্থা, অর্থাৎ পরিপূর্ণ এই নিশ্চিতি পোষণ করা উচিত যে তাঁর যুবতী বধূ সব সময় তাঁকে ভালোবেসে যাবে, এ প্রশ্ন তিনি নিজেকে কখনো করেননি; কিন্তু অনাস্থা তিনি রাখেননি কখনো, তাই আস্থাই রাখাতেন এবং নিজেকে বলতেন তাঁর আস্থা রাখা উচিত। এখন কিন্তু ঈর্ষা যে একটা লজ্জাকর মনোভাব, আর আস্থা রাখা উচিত তাঁর এ প্রত্যয় ভেঙে না পড়লেও অনুভব করছিলেন কেমন একটা অযৌক্তিক আর অবোধগম্য জিনিসের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছেন এবং ভেবে পাচ্ছিলেন না কি করবেন।
কারেনিন এসে দাঁড়িয়েছেন জীবনের মুখোমুখি, তাঁকে ছাড়া স্ত্রী অপর কাউকে ভালোবাসতে পারে এই সম্ভাবনার মুখোমুখি, এবং এটা তাঁর কাছে হয়ে দাঁড়াল অতি অর্থহীন আর দুর্বোধ্য, কেননা খোদ জীবনই হল এটা। সারা জীবন কারেনিন কাটিয়েছেন এবং কাজ করেছেন কাজকর্মচারীদের মধ্যে জীবনের প্রতিফলন নিয়ে যাদের কারবার। যখনই খোদ জীবনের মুখোমুখি হয়েছেন, ততবারই তা থেকে সরে এসেছেন। এখন তাঁর সেইরকম একটা বোধ হল হয় যখন কোন লোক অতল গহ্বরের ওপরকার সেতু দিয়ে নিশ্চিন্তে যেতে যেতে হঠাৎ দেখে যে সেতুটা ভেঙে পড়েছে, ঘূর্ণিজল দেখা দিয়েছে সেখানে। ঘূর্ণিজলটাই আসল জীবন, কারেনিন যে কৃত্রিম জীবন কাটিয়েছেন সেতুটা হল তাই। অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারা তাঁর স্ত্রীর পক্ষে সম্ভব, এ প্রশ্ন তাঁর সামনে দেখা দিল এই প্রথম, তাতে আতংক হল তাঁর।
