‘আমি কি জানি না যে কাজটা খারাপ হয়েছে? কিন্তু অমন যে হল তার কারণ কে?’
‘এ কথা আমাকে বলছেন কেন?’ কঠোর দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে আন্না বললেন।
‘আপনি জানেন কেন’, অসংকোচে, সানন্দে জবাব দিলেন ভ্রন্স্কি, চোখ না নামিয়ে গ্রহণ করলেন তাঁর দৃষ্টি।
ভ্রন্স্কি নন, আন্নাই থতমত খেলেন।
‘এতে শুধু প্রমাণ হয় যে আপনার হৃদয় বলে কিছু নেই’, আন্না বললেন। কিন্তু তাঁর দৃষ্টি বলছিল, ওঁর যে হৃদয় আছে সেটা তিনি জানেন আর সেই জন্য ভয় করেন তাঁকে।
‘আপনি এখন যে কথাটা বললেন ওটা ভ্রম, ভালোবাসা নয়।’
‘মনে রাখবেন যে ঐ শব্দটা, ঐ অমানুষিক শব্দটা উচ্চারণ করতে আমি আপনাকে মানা করেছি’, আন্না বললেন কেঁপে উঠে; কিন্তু তৎক্ষণাৎ টের পেলেন যে ‘বারণ করেছি’ এই একটা কথাতেই ওঁর ওপর নিজের খানিকটা অধিকার তিনি স্বীকার করে নিচ্ছেন এবং তাতে করে ভালোবাসার কথা বলতে উৎসাহিত করছেন ওঁকে। ‘অনেকদিন থেকে আপনাকে বলব ভাবছিলাম’, দৃঢ়ভাবে ওঁর চোখের দিকে তাকিয়ে মুখ দগ্ধানো লালিমায় আরও রাঙা হয়ে তিনি বলে গেলেন, ‘আজ ইচ্ছে করেই আমি এখানে এসেছি আপনার দেখা পাব জেনে। এলাম আপনাকে বলতে যে এটা শেষ হয়ে যাওয়া উচিত। কারো সামনে আমাকে কখনো লাল হয়ে উঠতে হয়নি অথচ কিসের জন্য যেন নিজেকে অপরাধী বলে ভাবতে আপনি আমাকে বাধ্য করছেন।’
ভ্রন্স্কি ওঁর দিকে তাকিয়ে অভিভূত হলেন তাঁর মুখের নতুন একটা আত্মিক লাবণ্যে।
‘আমাকে কি করতে বলেন?’ সহজভাবে গুরুত্বসহকারে জিজ্ঞেস করলেন ভ্রন্স্কি।
আন্না বললেন, ‘আমি চাই যে আপনি মস্কোয় গিয়ে কিটির কাছে ক্ষমা চাইবেন।’
ভ্রন্স্কি বললেন, ‘সেটা আপনি চান না।’
তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন যে আন্না যা চাইছেন সেটা নয়, জোর করে নিজেকে দিয়ে যা বলাচ্ছেন সেটাই বলছেন। ‘আমাকে যদি আপনি ভালোবাসেন যা আপনি বলছেন’, আন্না বললেন ফিসফিসিয়ে, ‘তাহলে এমন করুন যাতে আমি শান্তিতে থাকি।’
ভ্রন্স্কির মুখ জ্বলজ্বল করে উঠল।
‘আপনি কি জানেন না যে আমার কাছে আপনিই আমার গোটা জীবন, কিন্তু শান্তি আমার নেই, আপনাকে তা দিতেও পারব না। আমার গোটাটাই, ভালোবাসা—হ্যাঁ। আমি আপনাকে আর নিজেকে পৃথক বলে ভাবতে পারি না। আমার কাছে আপনি আর আমি একই। আর ভবিষ্যতে শান্তির কোন সম্ভাবনা আমি দেখতে পাচ্ছি না; আপনার জন্য ও নয়, আমার জন্যও নয়, আমি দেখতে পাচ্ছি কেবল নিরাশার, দুঃখের সম্ভাবনা… অথবা দেখছি সুখের সম্ভাবনা, আহ্ কি সে সুখ! সে কি সম্ভব নয়?’ এই কথাটা তিনি বললেন শুধু তাঁর ঠোঁট নেড়ে, কিন্তু আন্না শুনতে পেলেন।
যা উচিত সেটা বলার জন্য চিত্তের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করলেন আন্না, কিন্তু তার বদলে প্রেমাকুল দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন ভ্রন্স্কির ওপর এবং কিছুই বললেন না।
‘এই তো!’ সোল্লাসে ভ্রন্স্কি ভাবলেন, ‘যখন আমি একেবারে হতাশ হয়ে উঠেছি, যখন মনে হচ্ছিল এর বুঝি আর শেষ নেই, তখন এই তো! আমাকে ও ভালোবাসে। সেটা ও স্বীকার করছে।’
‘তাহলে আমার জন্য এটা করুন, আর কখনো বলবেন না ঐ সব কথা, ভালো বন্ধু হয়ে থাকব আমরা’, মুখে এই কথা বললেন আন্না, কিন্তু ভিন্ন কথা বলছিল তাঁর চোখ।
‘বন্ধু আমরা হব না, আপনি নিজেই তা জানেন। কিন্তু আমরা সবচেয়ে সুখী নাকি সবচেয়ে দুঃখী লোক হব, সেটা আপনার আয়ত্তে।’
কি একটা বলতে যাচ্ছিলেন আন্না, কিন্তু ভ্রন্স্কি বাধা দিলেন।
‘আমি তো শুধু একটা জিনিস চাইছি। আশা করার, এখনকার মত কষ্ট পাবার অধিকার। কিন্তু তা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে আমাকে উধাও হতে বলুন, আমি তাই হব। আমার উপস্থিতি যদি আপনার দুঃসহ লাগে, তাহলে আমাকে আর কখনো দেখতে পাবেন না আপনি।’
‘আপনাকে কোথাও তাড়িয়ে দিতে আমি চাই না।’
‘শুধু কিছুই যেন বদলাবেন না। যেমন আছে, তেমনিই সব থাক’, কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন ভ্রন্স্কি, ‘ঐ যে আপনার স্বামী।
সত্যিই এই সময় তাঁর শান্ত বিদঘুটে চলনে ড্রয়িং-রুমে ঢুকলেন কারেনিন।
স্ত্রী আর ভ্রন্স্কির দিকে দৃষ্টিপাত করে তিনি গেলেন কর্ত্রীর কাছে, এক কাপ চায়ের সামনে বসে ধীর-স্থির, সব সময় যা শ্রুতিভেদী, তাঁর সেই গলায় বরাবরকার মত রহস্যের সুরে কাকে নিয়ে যেন ঠাট্টা করতে লাগলেন।
গোটা সমাজের ওপর চোখ বুলিয়ে তিনি বললেন, ‘আপনার রামবুলিয়ে সালোঁ একেবারে জমজমাট। সমস্ত রূপদেবী আর কলালক্ষ্মীই বিরাজমান।’
কিন্তু প্রিন্সেস বেত্সি তাঁর এই সুর, যাকে তিনি অবজ্ঞাসূচক ইংরেজিতে বলতেন sneerIng তা সইতে পারতেন না, বুদ্ধিমতী গৃহকর্ত্রী হওয়ায় তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁকে টেনে আনলেন বাধ্যতামূলক সৈন্যভুক্তির গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায়। কারেনিনও অমনি কথোপকথনে মেতে উঠে গুরুত্বসহকারেই নতুন আদেশটা সমর্থন করতে লাগলেন, যাকে আক্রমণ করছিলেন প্রিন্সেস বেত্সি।
ভ্রন্স্কি আর আন্না বসেই রইলেন ছোট টেবিলটার কাছে।
ভ্রন্স্কি, আন্না এবং তাঁর স্বামীর দিকে ইঙ্গিত করে জনৈক মহিলা ফিসফিস করলেন, ‘এটা অশোভন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’
‘কি বলেছিলাম আমি?’ জবাব দিলেন আন্নার বান্ধবী।
কিন্তু শুধু এই মহিলারাই নয়, ড্রয়িং-রুমে যাঁরা ছিলেন তাঁরা সকলেই, এমন কি প্রিন্সেস মিয়াকায়া এবং স্বয়ং বেত্সিও বারকয়েক করে তাকিয়ে দেখছিলেন সাধারণ চক্র থেকে সরে যাওয়া ঐ দুজনের দিকে, এ চক্রটায় যেন ব্যাঘাত হচ্ছিল তাঁদের। শুধু কারেনিন সেদিকে একবারও তাকালেন না, যে আলাপটা শুরু হয়েছিল, বিচ্যুত হলেন না তার আকর্ষণ থেকে।
