উনি ফরাসি অভিনেত্রীর নাম করে কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু রাষ্ট্রদূতপত্নী সরস সভয়ে বাধা দিলেন : ‘ওই ভয়াবহ কাণ্ডটার কথা বলবেন না দয়া করে!
‘বেশ, বলব না, বিশেষ করে এই ভয়াবহতাটা যখন সকলেরই জানা।’
‘এবং অপেরার মত মনোহর হলে সবাই আমরা সেখানে যেতাম’, খেই ধরে বললেন প্রিন্সেস মিয়াকায়া।
সাত
দরজায় পায়ের আওয়াজ শোনা গেল, সেটা যে ম্যাডাম কারেনিনার তা জানা থাকায় প্রিন্সেস বেত্সি তাকালেন ভ্রন্স্কির দিকে। ভ্রন্স্কি দরজার দিকে তাকালেন, মুখে তাঁর একটা নতুন বিচিত্র ভাব ফুটে উঠল। যিনি এলেন, তাঁর দিকে তিনি সানন্দে, একদৃষ্টে, সেই সাথে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে রইলেন। আসন থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। ড্রয়িং- রুমে ঢুকলেন আন্না। দৃষ্টিপাত না বদলে, বরাবরের মত খাড়া দাঁড়িয়ে, উঁচু সমাজের অন্যান্য নারীর চলন থেকে আলাদা তাঁর দ্রুত, দৃঢ়, লঘু কয়েকটা পদক্ষেপে গৃহস্বামিনীর কাছ থেকে তাঁর দূরত্বটা উত্তীর্ণ হয়ে তাঁর করমর্দন করলেন তিনি এবং সেই হাসি নিয়েই তাকালেন ভ্রন্স্কির দিকে। ভ্রন্স্কি অনেকখানি মাথা নুইয়ে তাঁর দিকে চেয়ার এগিয়ে দিলেন।
আন্না শুধু মাথা নুইয়ে তার প্রত্যুত্তর দিলেন এবং লাল হয়ে উঠে ভুরু কোঁচকালেন। কিন্তু সাথে সাথেই পরিচিতদের উদ্দেশে দ্রুত মাথা নেড়ে এবং এগিয়ে দেওয়া হাতে চাপ দিয়ে তিনি কর্ত্রীকে বললেন, ‘কাউন্টেস লিদিয়ার কাছে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম আগেই আসব কিন্তু বসে থাকতে হল। ওখানে ছিলেন স্যার জন। ভারি আকর্ষণীয় লোক।’
‘ও, সেই মিশনারি?’
‘হ্যাঁ, ভারতীয় জীবন সম্পর্কে উনি খুব আগ্রহ জাগাবার মত গল্প করছিলেন।
তাঁর আগমনে ছিন্ন আলাপ ফুঁ দিয়ে নেবানো দীপশিখার মত আবার দপদপিয়ে উঠল।
‘স্যার জন! হ্যাঁ, স্যার জন। আমি ওঁকে দেখেছি। কথা বলেন চমৎকার। ম্যাডাম ভ্লাসিয়েভা একেবারে তাঁর প্রেমে পড়ে গিয়েছেন। ‘
‘আচ্ছা, ভ্লাসিয়েভার ছোট মেয়ে নাকি তপোভকে বিয়ে করছে, সত্যি?’
‘হ্যাঁ, শুনেছি এটা একেবারে স্থির হয়ে গেছে।’
‘ওর বাপ-মায়ের কথা ভেবে আমার অবাক লাগে। লোকে বলে, এটা নাকি প্রণয়ঘটিত বিয়ে।’
‘প্রণয়ঘটিত? কি মান্ধাতা আমলের ধারণা আপনার! প্রণয়ের কথা আজকাল কে বলে?’ বলেন রাষ্ট্রদূত পত্নী।
‘কি করা যাবে? এই নির্বোধ সাবেকী রীতিটা এখনো অচল হয়ে যাচ্ছে না’, বললেন ভ্রন্স্কি।
‘এ রীতিটা যারা আঁকড়ে থাকে তাদের কপাল খারাপ। শুধু কাণ্ডজ্ঞান থেকে বিয়েই আমি দেখেছি সুখী।’
‘তা ঠিক, তবে যে প্রণয়কে স্বীকৃতি দিচ্ছেন না, ঠিক তার আবির্ভাবেই কাণ্ডজ্ঞানের বিয়ে ধূলিসাৎ হয়ে যায় কত বারবার’, ভ্রন্স্কি বললেন।
কিন্তু কাণ্ডজ্ঞানের বিয়ে আমরা তাকে বলি যখন উভয় পক্ষই তাদের পাগলামির পালা শেষ করেছে। ওটা স্কার্লেট জ্বরের মত, কাটিয়ে উঠতে হয়।’
‘বসন্তের টীকা দেবার মত করে কৃত্রিমভাবে প্রণয় জাগাবার টীকা দেওয়াও শিখতে হবে তাহলে।’
প্রিন্সেস মিয়াকায়া বললেন, ‘অল্প বয়সে আমি আমাদের পাদ্রীর প্রেমে পড়েছিলাম। জানি না এতে আমার লাভ হয়েছে কিনা।’
‘না, আমার ধারণা, ঠাট্টা নয়, প্রেম কি জানতে হলে ভুল করা এবং পরে তা শুধরে নেওয়া দরকার’, বললেন প্রিন্সেস বেত্সি।
‘এমনকি বিয়ের পরেও?’ রসিকতা করে বললেন রাষ্ট্রদূত পত্নী।
ইংরেজি প্রবচন উদ্ধৃত করে কূটনীতিক বললেন, ‘অনুতাপের সময় কখনো ফুরিয়ে যায় না।’
বেত্সি খেই ধরে বললেন, ‘ঠিক এই জন্যই দরকার ভুল করা এবং শোধরানো। আপনি কি মনে করেন?’ উনি জিজ্ঞেস করলেন আন্নাকে, যিনি ঠোঁটে সামান্য লক্ষণীয় স্থির হাসি নিয়ে এই কথাবার্তাটা শুনছিলেন।
‘আমার মনে হয়’, খুলে ফেলা দস্তানা নাড়াচাড়া করতে করতে আন্না বললেন, ‘আমার মনে হয়… যতগুলো মাথা, মনও যদি ইয় ততগুলো, তাহলে যতগুলো হৃদয়, ভালোবাসাও হবে তত রকমের।’
আন্না কি বলেন তার জন্য উদ্বিগ্ন বুকে তাঁর দিকে চেয়েছিলেন ভ্রন্স্কি। আন্নার এই কথাগুলো শুনে তিনি হাঁফ ছাড়লেন যেন একটা বিপদ কাটিয়ে উঠেছেন।
হঠাৎ তাঁর দিকে তাকালেন আন্না : ‘মস্কো থেকে চিঠি পেয়েছি। লিখেছে যে কিটি শ্যেরবাৎস্কায়া খুব অসুস্থ।’
‘তাই নাকি?’ ভুরু কুঁচকে ভ্রন্স্কি বললেন।
কঠোর দৃষ্টিতে আন্না তাকালেন তাঁর দিকে।
‘এতে আপনার কোন আগ্রহ নেই?’
‘বরং উল্টো, অত্যন্ত আগ্রহী, জানতে পারি কি ঠিক কি আপনাকে লিখেছে?’
আন্না উঠে দাঁড়িয়ে বেত্সির কাছে গেলেন।
তাঁর চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘এক কাপ চা দিন।’
প্রিন্সেস বেত্সি যখন চা ঢালছিলেন, ভ্রন্স্কি এলেন আন্নার কাছে।
‘কি আপনাকে লিখেছে?’ আবার জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
‘আমার প্রায়ই মনে হয় যে পুরুষেরা বোঝে না কোনটা অনুদার যদিও প্রায়ই বলে থাকে সে কথা’, ভ্রন্স্কির প্রশ্নের জবাব না দিয়ে আন্না বললেন। ‘আমি অনেকদিন থেকে আপনাকে বলব ভাবছিলাম’, কয়েক পা এগিয়ে কোণের একটা অ্যালবাম টেবিলের কাছে বসে তিনি যোগ করলেন।
ভ্রন্স্কি তাঁকে চায়ের কাপ দিয়ে বললেন, ‘আপনার কথার অর্থ ঠিক ধরতে পারছি না।’
আন্না সোফায় তাঁর পাশে দৃষ্টিপাত করলেন, ভ্রন্স্কিও তৎক্ষণাৎ বসলেন সেখানে।
তাঁর দিকে না তাকিয়ে আন্না বললেন, ‘হ্যাঁ, আপনাকে বলতে চাইছিলাম, আপনি খারাপ কাজ করেছেন, খারাপ, অত্যন্ত খারাপ।’
