‘দেখতে চান? তবে আপনি ওর মর্ম বুঝবেন না।’
‘দেখান। ওই ওদের, কি যেন বলে ওদের… ওই ব্যাংকারদের কাছে আমি শিখেছি… ওদের চমৎকার চমৎকার এনগ্রেভিং আছে। আমাদের ওরা দেখায়।’
‘সে কি, আপনারা শিউট্সবুর্গদের ওখানে গিয়েছিলেন?’ সামোভারের ওখান থেকে জিজ্ঞেস কররেন কী ‘গিয়েছিলাম ma chere। আমার স্বামীর সাথে আমাকে তারা নিমন্ত্রণ করেছিল। বলল, ডিনারটার সসের দাম হাজার রুল’, সবাই তাঁর কথা শুনছেন টের পেয়ে উচ্চকণ্ঠে বললেন প্রিন্সেস মিয়াঙ্কায়া, ‘কিন্তু অতি ভারি বিছ্ছিরি সস, কেমন সবজেটে। ওদেরও ডাকতে হয় তো, আমি সস বানালাম পঁচাশি কোপেকে, সবাই ভারি খুশি। হাজার- রুলী সস বানানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
কর্ত্রী বললেন, ‘এ শুধু মিয়াগ্কায়াই পারেন!’
‘আশ্চর্য!’ কে যেন মন্তব্য করলেন।
প্রিন্সেস মিয়াগ্কায়ার উক্তিতে সব সময়ই প্রভাব পড়ত একই রকম, আর সে প্রভাবের গোপন রহস্য এই যে এখনকার মত বিশেষ প্রাসঙ্গিক না হলেও বলতেন সহজ কথা যার অর্থ আছে। যে সমাজে তাঁর চলাফেরা, সেখানে এমন কথায় ফল হত অতি সুরসিক টিপ্পনির মত। প্রিন্সেস মিয়াকায়া বুঝতে পারতেন না কেন তাঁর কথা এমন প্রভাব ফেলছে, কিন্তু জানতেন যে ফেলছে এবং সেটা কাজে লাগাতেন।
প্রিন্সেস মিয়াগ্কায়া যখন কথা বলছিলেন তখন সবাই তা শুনছিলেন এবং রাষ্ট্রদূতপত্নীর ওখানে আলাপ থেমে গিয়েছিল বলে গৃহস্বামিনী চাইলেন গোটা সমাজকে একজায়গায় জড়ো করতে, রাষ্ট্রদূতপত্নীকে তিনি বললেন, ‘সত্যিই আপনার আর চা লাগবে না? আমাদের এখানে আপনারা উঠে এলে পারেন।’
‘না-না, আমরা এখানে বেশ আছি’, হেসে জবাব দিলেন রাষ্ট্রদূতপত্নী এবং যে আলোচনাটা শুরু হয়েছিল তা চালিয়ে গেলেন।
আলোচনাটা খুবই প্রীতিকর। স্বামী-স্ত্রী কারেনিনদের নিন্দে হচ্ছিল।
‘মস্কো থেকে ফেরার পর আন্না অনেক বদলে গেছে। কি একটা অদ্ভুত জিনিস ঘটেছে ওর ভেতর’, বলছিলেন আন্নার বান্ধবী।
‘প্রধান বদলটা এই যে উনি আলেকসেই ভ্রন্স্কির ছায়াকে সাথে নিয়ে এসেছেন’, বললেন রাষ্ট্রদূত পত্নী।
‘তাতে কি? গ্রিমের একটা উপকথায় আছে : একটা লোকের ছায়া নেই, ছায়া সে হারিয়েছে; কিসের জন্য যেন এটা তার শাস্তি। আমি কখনো বুঝতে পারিনি শাস্তিটা কেন। কিন্তু নারীর পক্ষে ছায়া না থাকাটা ভালো লাগার কথা নয়।’
‘তা ঠিক, কিন্তু যে নারীর পেছনে ছায়া থাকে, সাধারণত তার পরিণাম হয় খারাপ’, বললেন আন্নার বান্ধবী। এ কথা কানে যেতে হঠাৎ বলে উঠলেন প্রিন্সেস মিয়াঙ্কায়া, ‘জিব আপনার খসে পড় ক। কারেনিনা চমৎকার লোক। ওঁর স্বামীকে আমার ভালো লাগে না কিন্তু ওঁকে ভারি ভালোবাসি।’
রাষ্ট্রদূতপত্নী বললেন, ‘কেন ভালোবাসেন না স্বামীকে? অতি সজ্জন লোক। আমার স্বামী বলেন, এরকম রাজপুরুষ ইউরোপে কমই আছে।’
‘আমার স্বামীও আমাকে তাই বলেছেন, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি না’, বললেন প্রিন্সেস মিয়াগ্কায়া, ‘আমাদের স্বামীরা ওসব না বললে আমরা দেখতে পেতাম ব্যাপারটা সত্যিই কি। আমার মতে কিন্তু আলেকসেই আলেক্সান্দ্রিভিচ কারেনিন একটা বোকার হদ্দ। আমি এটা চুপি চুপি বলছি… কিন্তু সব পরিষ্কার হয়ে উঠছে তা কি সত্যি নয়? আগে যখন ওঁকে বুদ্ধিমান বলে ভাবতে আমাকে বলা হয়, আমি তন্ন তন্ন করে সব দেখেশুনে বুঝলাম আমিই বোকা, কেননা ওঁর মধ্যে বুদ্ধি কিছু খুঁজে পাচ্ছি না। তারপর যেই আমি চুপি চুপি বললাম, উনি বোকা, অমনি সব পরিষ্কার হয়ে গেল, তাই না?’
‘আজ আপনি ভারি খাপ্পা।
‘একটুও না। আমার যে গত্যন্তর নেই। আমাদের দুজনের মধ্যে কেউ-একজন তো বোকা। আর জানেন তো, নিজের সম্পর্কে ও-কথা কখনো বলা চলে না।’
‘কেউ নিজের অবস্থায় খুশি নয়, কিন্তু সবাই খুশি নিজের বুদ্ধিতে’, ফরাসি কবিতা উদ্ধৃত করলেন কূটনীতিক।
‘যা বলেছেন’, তাড়াতাড়ি তাঁর দিকে ফিরলেন প্রিন্সেস মিয়াগ্কায়া, ‘তবে আসল কথা, আন্নাকে আমি আপনার কবলে ছেড়ে দিচ্ছি না। ভারি ভালো, মিষ্টি মেয়ে। সবাই যদি তাঁর প্রেমে পড়ে যায়, ছায়ার মত পিছু নেয় তাঁর, কি তিনি করবেন?’
‘আমিও তার দোষ ধরার কথা ভাবছিও না’, আত্মসমর্থন করলেন আন্নার বান্ধবী।
‘কেউ যদি ছায়ার মত আমাদের পিছু না নেয়, তার মানে এই নয় যে অন্যের সমালোচনা করার অধিকার আমাদের আছে।’
আন্নার বান্ধবীকে উচিতমত দাবড়ি দিয়ে প্রিন্সেস মিয়াকায়া উঠে দাঁড়ালেন এবং যে টেবিলে সাধারণ আলাপ চলছিল প্রাশিয়ার রাজাকে নিয়ে, রাষ্ট্রদূতপত্নীর সাথে গিয়ে যোগ দিলেন তাতে।
বেত্সি বললেন, ‘ওখানে আপনাদের কি পরচর্চা হচ্ছিল?’
‘কারেনিনদের নিয়ে। প্রিন্সেস আলেক্সেই আলেক্সান্দ্রভিচ কারেনিনের মূল্যায়ন করেছেন’, হেসে আসন নিয়ে বললেন রাষ্ট্রদূতপত্নী।
‘দুঃখের কথা যে শুনতে পেলাম না’, প্রবেশদ্বারের দিকে তাকিয়ে বললেন গৃহস্বামিনী। ‘আরে, শেষ পর্যন্ত এলেন তাহলে!’ আগন্তুক ভ্রন্স্কিকে তিনি হেসে বললেন।
ভ্রন্স্কি শুধু সবার সাথে পরিচিত তাই নয়, এখানে যাঁদের তিনি দেখলেন, নিত্য তাঁদের সাথে দেখা হয় তাঁর, তাই যাদের এইমাত্র ছেড়ে গিয়েছে তাদের কাছে যে অনায়াস ভঙ্গিতে লোকে ফেরে সেভাবে ভ্রন্স্কি ভেতরে ঢুকলেন। ‘কোত্থেকে আসছি?’ রাষ্ট্রদূত পত্নীর প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, ‘কি করা যাবে, কবুল করতেই হচ্ছে। বুফ অপেরা থেকে। মনে হচ্ছে শতবার গেছি, কিন্তু প্রতিবারেই পেয়েছি নতুন আনন্দ। অপূর্ব! জানি এটা লজ্জার কথা : অপেরায় আমার ঘুম পায়, কিন্তু বুক অপেরাগুলোয় আমি শেষ মিনিট পর্যন্ত বসে থাকি এবং খুশি হয়ে। যেমন আজকে…’
