‘যাচ্ছেতাই কাণ্ড, তবে দারুণ মজাদার। কেন্দ্রভের পক্ষে তো আর এই ভদ্রলোকের সাথে লড়া সম্ভব নয়! অমন খেপে উঠেছিল?’ হেসে আবার জিজ্ঞেস করলেন তিনি। ‘কিন্তু ক্লেয়ারকে আজ কেমন দেখছেন? অপূর্ব!’ নতুন ফরাসি অভিনেত্রী সম্পর্কে বললেন তিনি, ‘যতই দেখি না কেন, প্রতিদিনই নতুন। ওটা শুধু ফরাসিরাই পারে।’
ছয়
প্রিন্সেস বেত্সি শেষ অংক সমাপ্ত না হতেই থিয়েটার থেকে চলে গেলেন। ড্রেসিং-রুমে গিয়ে নিজের দীর্ঘ পাণ্ডুর মুখে পাউডার ছিটিয়ে এবং তা মুছে কবরী ঠিক করে নিয়ে প্রকাণ্ড ড্রয়িং-রুমটায় চা এনে দেবার হুকুম দিতে না দিতেই বলশায়া মস্কায়া রাস্তায় তাঁর বিশাল বাড়িটার গেটের সামনে গাড়ি এসে দাঁড়াতে থাকল একটার পর একটা। অতিথিরা গাড়ি থেকে নেমে যেতে লাগলেন প্রবেশপথের দিকে এবং পথচারীদের জ্ঞানদানার্থে যেসব খবরের কাগজ টাঙানো থাকা কাচের ফ্রেমে, রোজ সকালে তা পড়তে অভ্যস্ত দশাসই চাপরাশি নিঃশব্দে মস্ত দরজাটা খুলে অতিথিদের ভেতরে পথ করে দিতে থাকল।
কালচে দেয়ালের প্রশস্ত ড্রয়িং-রুমে ফুঁয়ো-ফুয়ো গালিচা, আলোকোজ্জ্বল টেবিল, মোমবাতির আলোয় ঝকঝকে সাদা টেবিলক্লথ, রুপার সামোভার, চীনা মাটির স্বচ্ছ টি-সেট। প্রায় একই সাথে ঘরখানার এক দরজা দিয়ে তাজা কবরী আর তাজা মুখে ঢুকলেন গৃহস্বামিনী, অন্য দরজা দিয়ে অতিথিরা
গৃহস্বামিনী বসলেন সামোভারের কাছে, দস্তানা খুললেন। অলক্ষ্য পরিচারকদের সাহায্যে চেয়ার সরিয়ে সরিয়ে সমাজ স্থান নিল দু’ভাগে ভাগ হয়ে : একদল সামোভারের কাছে গৃহস্বামিনীর সাথে, অন্য দল ড্রয়িং-রুমের বিপরীত প্রান্তে জনৈক রাষ্ট্রদূতের সুন্দরী পত্নীর কাছে, পরনে তাঁর কালো মখমলের পোশাক, চোখে তীক্ষ্ণ কালো ভুরু। প্রথমটায় বা সব সময়ই হয় অতিথি আগমন, সম্ভাষণ, চায়ের আপ্যায়নে বাধাপ্রাপ্ত আলাপ দুলতে লাগল যেন কোন প্রসঙ্গে নিবন্ধ হওয়া যায় তার অন্বেষণে।
‘অভিনেত্রী হিসেবে উনি অসাধারণ ভালো; বোঝাই যায় কাউলবাখের শিষ্যা’, বললেন রাষ্ট্রদূতপত্নীর চক্রস্থ একজন কূটনীতিক, ‘লক্ষ্য করেছিলেন কিভাবে পড়ে গেলেন… ‘
‘আহ্ নিলসনের কথা থাক। ওঁর সম্পর্কে নতুন কি আর বলার আছে’, বললেন সাবেকী রেশমী গাউন পরা, সোনালি-চুল, ভ্রূহীন, পরচুলা-হীন, রক্তবর্ণা স্থূলাঙ্গী মহিলা। ইনি হলেন বিখ্যাত প্রিন্সেস মিয়াগ্কায়া, স্পষ্টভাষণ আর রূঢ়তার জন্য তাঁর উপনাম জুটেছিল ভয়ংকরী শিশু (গেছো খুকি ফরাসি ভাষায়)। প্রিন্সেস মিয়াকায়া বসেছিলেন দু’মহলের মাঝামাঝি, এবং কখনো এ-দল কখনো ও-দলের কথা শুনে যোগ দিচ্ছিলেন দু’পক্ষেরই আলাপে। ‘কাউলবাখ সম্পর্কে ঠিক এই কথাই আমাকে আজ বলেছে তিনজন, যেন নিজেদের মধ্যে আগে কথা হয়ে গিয়েছিল। অথচ কেন যে বুলিটা ওদের মনে ধরে গেল, জানি না।’
এই মন্তব্যে আলাপের তাল কেটে গেল, প্রয়োজন হল নতুন প্রসঙ্গ খোঁজার।
‘কিছু-একটা মজার কথা আমাদের বলুন, তবে তাতে যেন জ্বলুনি না থাকে’, কূটনীতিক যখন ভেবে পাচ্ছিলেন না কি দিয়ে শুরু করবেন, তখন তাঁকে বললেন, রাষ্ট্রদূতপত্নী, ইংরেজিতে যাকে বলে small talk তেমন মার্জিত কথোপকথনে ইনিও অসামান্যা।
কূটনীতিক হেসে বললেন, ‘লোকে বলে সেটা বড় কঠিন, যা জ্বালায় শুধু তা-ই হাস্যকর। তবে চেষ্টা করে দেখি। একটা প্রসঙ্গ দিন-না। আসল ব্যাপারটাই হল প্রসঙ্গ নিয়ে। প্রসঙ্গ পেলে তাতে ফুল তোলা সহজ। আমার প্রায়ই মনে হয়, গত শতকের নামকরা আলাপীদের পক্ষে চাতুর্যের সাথে আলাপ করা আজকাল মুশকিল হত। চতুর সব কিছুতেই লোকের ভারি বিরক্তি ধরে গেছে… ‘
‘সে কথা তো শোনা গেছে অনেক আগেই’, হেসে বাধা দিলেন রাষ্ট্রদূত পত্নী।
আলাপের শুরুটা হল সুন্দর, কিন্তু ঠিক অতটা সুন্দর বলেই তা আবার থেমে গেল। প্রয়োজন হল নির্ভরযোগ্য, সব সময় অব্যর্থ পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া—যথা, পরচর্চা।
‘আপনাদের মনে হয় না যে তুশকেভিচের মধ্যে ১৫শ লুই গোছের কিছু-একটা আছে?’ চোখ দিয়ে টেবিলের কাছে দণ্ডায়মান পাণ্ডুরকেশ সুপুরুষ একটা যুবককে দেখিয়ে তিনি বললেন।
‘আরে হ্যাঁ! এ ড্রয়িং-রুমটার সাথে তাঁর রুচি মেলে, তাই অত ঘন ঘন তিনি দর্শন দেন এখানে।’
এ আলাপটা চলতে থাকল কেননা এ ড্রয়িং-রুমে যা বলা চলে না, তা বলে হতে লাগল, আভাষে ইঙ্গিতে অর্থাৎ
পরচর্চায় এসে গিয়ে সুস্থির হল।
‘শুনেছেন, মালতিশ্যেভাও–মেয়ে নয়, মা–সেও চটকদার গোলাপি পোশাক বানাচ্ছে।
‘বলেন কি! না, এ যে খাসা ব্যাপার!’
‘আমার অবাক লাগে, বুদ্ধিশুদ্ধি থাকলেও—উনি তো বোকা নন—দেখতে পাচ্ছেন না নিজেকে কি হাস্যকর করছেন।’
দুর্ভাগিনী মালতিশ্যেভার নিন্দায় আর ঠাট্টায় প্রত্যেকেরই বলার ছিল কিছু-না-কিছু, আলাপও ফুর্তিতে মুখর হয়ে উঠল জ্বলে ওঠা শিবিরাগ্নির মত।
প্রিন্সেস বেত্সির স্বামী, সদাশয় স্থূলকায় মানুষ, এনগ্রেভিং সংগ্রহে পাগল, স্ত্রীর অতিথি এসেছেন শুনে ক্লাবে যাবার আগে ড্রয়িং-রুমে এলেন। নরম গালিচার ওপর দিয়ে নিঃশব্দে তিনি গেলেন প্রিন্সেস মিয়াঙ্কায়ার কাছে।
বললেন, ‘নিলসনকে কেমন লাগল আপনার?
‘ওঃই, অমন চুপি চুপি কেউ আসে নাকি? আমাকে যা ভয় পাইয়ে দিয়েছেন’, জবাব দিলেন উনি। আমার কাছে অপেরার কথা বলবেন না বাপু, সঙ্গীত আপনি কিছুই বোঝেন না। আমি বরং আপনার মানে নেমে গিয়ে আপনার মাওলিকা আর এনগ্রেভিং নিয়ে কথা বলব আপনার সাথে। তা পুরানা বাজারে সম্প্রতি কি ধন কিনলেন?’
