.
দ্বিতীয়বার নামকরা গায়িকার অনুষ্ঠান হচ্ছিল, গোটা উচ্চ সমাজ গিয়েছিল থিয়েটারে। প্রথম সারির আসন থেকে ফুফাতো বোনকে দেখে ভ্রন্স্কি বিরতি পর্যন্ত অপেক্ষা না করেই গেলেন তাঁর কাছে বক্সে।
বেত্সি বললেন, ‘খেতে এলেন না যে? প্রেমিকযুগলের আলোকদর্শনক্ষমতায় অবাক মানতে হয়।’ তারপর হেসে এমনভাবে যোগ দিলেন যাতে আর কারও কানে না যায় : ‘সেও আসেনি। কিন্তু আসুন অপেরার পরে।’
ভ্রন্স্কি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চাইলেন তাঁর দিকে। উনি মুখ নিচু করলেন। হাসি দিয়ে তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে ভ্রন্স্কি বসলেন তাঁর কাছে।
‘আপনার উপহাসগুলো আমার কি যে মনে পড়ে!’ এই প্রেমাবেগের সাফল্য দর্শনে বিশেষ একটা পরিতৃপ্তি লাভ করে কাউন্টেস বেত্সি বলে চললেন, ‘সে সব গেল কোথায়? আপনি ধরা পড়ে গেছেন বাপু।’
‘ধরা পড়তেই শুধু আমি চাই’, নিজের প্রশান্ত সদাশয় হাসিতে ভ্রন্স্কি জবাব দিলেন, ‘নালিশ করবার কিছু থাকলে সেটা শুধু এই যে সত্যি বলতে আমি ধরা পড়েছি বড়ই কম। আমি নিরাশ হয়ে উঠছি।’
‘কিন্তু কি আশা থাকতে পারে আপনার?’ বন্ধুর জন্য ক্ষুব্ধ বোধ করে বেত্সি ফরাসি ভাষায় বললেন, ‘দুজন দুজনকে বুঝব।’ কিন্তু তাঁর চোখে যে ঝিলিক দিচ্ছিল তাতে বোঝা যাচ্ছিল উনি ঠিক ভ্রন্স্কির মতই বোঝেন কি আশা তাঁর আছে।
‘কোন আশাই নেই’, হেসে তাঁর নিটোল দাঁতের সারি উদ্ঘাটিত করে ভ্রন্স্কি বললেন। তারপর যোগ করলেন, ‘মাপ করবেন’, ওঁর হাত থেকে দূরবীনটা নিয়ে তাঁর অনাবৃত কাঁধের ওপর দিয়ে দেখতে লাগলেন সামনের সারির বক্সগুলোকে। ‘ভয় হচ্ছে, নিজেকে হাস্যকর করে তুলছি।’
ভ্রন্স্কি ভালোই জানতেন যে বেত্সি বা গোটা সমাজের চোখে হাস্যকর হবার ভয় তাঁর কিছু ছিল না। তাঁর খুব ভালোই জানা ছিল যে এ সব লোকেদের কাছে কোন কুমারী বা সাধারণভাবেই কোন বন্ধনহীন মহিলার হতভাগ্য প্রণয়ীর ভূমিকাটা হাস্যকর লাগতে পারে, কিন্তু যে একজন বিবাহিতা নারীর পিছু নিয়েছে এবং যে করেই হোক তাকে আত্মদানে টেনে আনাতেই জীবন পণ করেছে, তার ভূমিকায় সুন্দর, অপরূপ কিছু-একটা আছে, কখনোই তা হাস্যকর ঠেকতে পারে না, আর তাই সগর্বে, খুশি হয়ে, মোচের তলে লীলাময় হাসি নিয়ে দূরবীন নামিয়ে চাইলেন চাচাতো বোনের দিকে মুগ্ধ হয়ে বোন বললেন, ‘কিন্তু খেতে এলেন না যে?’
‘সেটা আপনাকে বলা দরকার। আমি ব্যস্ত ছিলাম। স্ত্রীকে অপমান করেছে এমন একটা লোকের সাথে মিটমাট করিয়ে দিচ্ছিলাম স্বামীর। সত্যি বলছি!’
‘মিটমাট হল?’
‘প্ৰায়।’
‘আপনার কাছ থেকে ব্যাপারটা শোনা দরকার’, উঠে দাঁড়িয়ে উনি বললেন, ‘পরের বিরতিটার সময় আসুন।’
‘উপায় নেই; আমি যাচ্ছি ফরাসি থিয়েটারে।’
‘নিলসনকে ছেড়ে?’ আতঙ্কে জিজ্ঞেস করলেন বেত্সি, যিনি কোন কোরাস-কন্যা থেকে নিলসনকে কিছুতেই আলাদা সনাক্ত করতে পারতেন না।
‘কি করা যাবে? দেখা করার কথা আছে। সবই এই মিটমাটের ব্যাপারটা নিয়ে।’
‘ধন্য শান্তিঘটকেরা, তারা ত্রাণ পাবে’, কারো কাছ থেকে এই ধরনের কিছু-একটা শুনেছিলেন বলে স্মরণ হওয়ায় বেত্সি বললেন, ‘তাহলে বসুন-না, বলুন ব্যাপারটা কি?’
এবং তিনি আবার বসলেন।
আন্না কারেনিনা – ২.৫
পাঁচ
ভ্রন্স্কি হাসি-হাসি চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘একটু অশালীন কিন্তু এমন চমৎকার যে ভীষণ ইচ্ছে করছে বলতে। কারো নাম বলব না কিন্তু।’
‘সে তো আরো ভালো, আমি অনুমান করতে থাকব।’
‘দুটো ফুর্তিবাজ যুবক যাচ্ছে…’
‘নিশ্চয় আপনাদের রেজিমেন্টের অফিসার?’
‘অফিসার বলব না, নেহাৎ আহারান্তে দুটো লোক …‘
‘ঘুরিয়ে বলুন : মাতাল।’
‘হয়ত। যাচ্ছে বন্ধুর বাড়ি খেতে, অতি শরীফ মেজাজে। দেখে সুন্দরী এক নারী ঘোড়ার গাড়িতে করে তাদের পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে, ওদের দিকে তাকিয়ে দেখে মাথা নাড়ছে আর হাসছে, অন্তত তাই তাদের মনে হয়েছিল। বলাই বাহুল্য ওরা তার পিছু নিল, ঘোড়া ছুটাল পুরোদমে। তাদের অবাক করে দিয়ে যে বাড়িতে তারা যাচ্ছিল তারই ফটকের সামনে গাড়ি থামল সুন্দরীর। ওপরতলায় সুন্দরী ছুটে উঠল। তারা দেখল শুধু খাটো অবগুণ্ঠনের তলে রক্তিম অধর আর ছোট ছোট অনিন্দ্য চরণ।’
‘আপনি এমন অনুরাগে ঘটনাটা বলছেন যে মনে হচ্ছে আপনি নিজেই এ দুইয়ের একজন।’
‘কিন্তু কিছুক্ষণ আগে আপনি আমাকে কি বলেছেন মনে আছে তো? তা যুবকেরা তো গেল তাদের বন্ধুর কাছে, সেখানে আজ তার বিদায় ভোজ। এখানে ঠিকই তারা মদ্যপান করল, হয়ত একটু বেশিই, বিদায় বাসরে যা সব সময়ই ঘটে থাকে। আহারের সময় ওরা জিজ্ঞেস করলে এ বাড়ির ওপরতলায় কে থাকে। কারোরই জানা ছিল না। শুধু, ওপরে কি ‘মামজেলরা’ থাকে, এই প্রশ্নের উত্তরে কর্তার খানসামা জানাল থাকে অনেকগুলোই। খাওয়া-দাওয়ার পর যুবকেরা গেল গৃহকর্তার কেবিনেটে এবং চিঠি লিখলে অপরিচিতার কাছে। লিকলে হৃদয়াবেগে ভরা চিঠি, প্ৰেমঘোষণা, এবং নিজেরাই তা ওপরে নিয়ে গেল যদি চিঠির কোন কিছু বিশেষ বোধগম্য না হয় তা বুঝিয়ে দেবার জন্য।’
‘এ সব বিছ্ছিরি কথা আমাকে কেন বলছেন? তারপর?’
‘ঘন্টি দিলে। দাসী বেরিয়ে এল। মেয়েটাকে চিঠি দিয়ে দুজনেই নিশ্চয় করে বলল তারা এমন প্রেমে পড়েছে যে তখনই দ্বারদেশেই মারা যাবে। কিছু বুঝতে না পেরে মেয়েটা কথাবার্তা চালাতে লাগল। হঠাৎ বেরিয়ে এলেন এক ভদ্রলোক, চিংড়ির মত লাল, গালে সসেজ গোছের গালপাট্টা, ঘোষণা করলেন বাড়িতে তাঁর স্ত্রী ছাড়া আর কেউ থাকে না এবং ভাগিয়ে দিলেন তাদের।’
