একটু থতমত খেল কিটি; এর পরে সে বলতে চেয়েছিল যে তার ভেতর এসব বদল ঘটার পর থেকে অব্লোন্স্কিকে তার অসহ্য রকমের বিরক্তিকর লাগছে, তাঁকে দেখলেই যত রূঢ় আর বিতিকিছিরি ভাবনা মনে আসে। সে বলে চলল, ‘হ্যাঁ, সব কিছু আমার চোখে দেখা দিচ্ছে অতি কদর্য, জঘন্য চেহারায়। এই আমার রোগ, হয়ত কেটে যাবে…’
‘তুই বরং ও সব নিয়ে ভাবিস না…’
‘পারি না যে। শুধু ছেলেমেয়েদের সাথে, তোমাদের ওখানে ভালো বোধ করি।
‘দুঃখের কথা যে আমাদের ওখানে তোর আসা চলছে না।’
‘না, যাব। আমার স্কার্লেট জ্বর হয়েছিল তো, মায়ের অনুমতি চেয়ে নেব।
কিটি তার জেদ ধরে রইল আর স্কার্লেট জ্বরের যে হিড়িকটা সত্যিই এসেছিল, তার গোটা সময়টা সেবাযত্ন করল ছেয়েমেয়েদের। দু’বোনে মিলে সারিয়ে বুলল ছয়টি শিশুকে কিন্তু কিটির স্বাস্থ্য ভালো হল না, লেন্ট পরবের সময় শ্যেরবাৎস্কিরা গেলেন বিদেশে।
চার
আসলে পিটার্সবুর্গের উঁচু মহল একটাই; সেখানকার সবাই সবাইকে চেনে, সবারই সবার বাড়িতে যাতায়াত। কিন্তু এই বড় মহলটার আবার নিজ নিজ উপবিভাগ আছে। আন্না আর্কাদিয়েভনা কারেনিনার বন্ধু-বান্ধব ও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল তিনটি বিভিন্ন মহলে। একটা ছিল রাজপুরুষদের সরকারি মহল, তাঁর স্বামীর সহকর্মী ও অধস্তনদের নিয়ে, যাঁরা অতি বৈচিত্র্যে ও খামখেয়ালে সামাজিক প্রতিষ্ঠায় পরস্পর যুক্ত বা বিযুক্ত। প্রথম দিকে এসব লোকেদের প্রতি প্রায় ভক্তির মত যে শ্রদ্ধা আন্না পোষণ করতেন, তা এখন তিনি মনে করতে পারেন বহু কষ্টে। এখন এঁদের সকলকেই তিনি চেনেন, যেমন মফস্বল শহরের লোকে চেনে পরস্পরকে। জানেন কার কি অভ্যাস আর দুর্বলতা, কার কোথায় কাঁটা বিঁধছে, পরস্পরের সাথে আর নাটের গুরুর সাথে কার কেমন সম্পর্ক। জানেন কে কার পক্ষে, কিভাবে কেমন করে টিকে থাকছে, কার সাথে কার এবং কিসে মিল বা অমিল, কিন্তু কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনার চেষ্টা-চরিত্র সত্ত্বেও সরকারি পুরুষালি আগ্রহের এই মহলটা তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারেনি এবং এটাকে তিনি এড়িয়ে চলতেন।
দ্বিতীয় আরেকটা যে মহল আন্নার ঘনিষ্ঠ, কারেনিন তার সাহায্যেই প্রতিষ্ঠাপন্ন হয়েছেন। এ মহলের কেন্দ্র হলেন কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা। এটা হল বৃদ্ধ, অসুন্দর, সদাচারী, ধর্মপ্রাণ নারী আর বুদ্ধিমান, বিদগ্ধ, উচ্চাকাঙ্ক্ষী পুরুষদের চক্র। এ মহলের একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি তার নাম দিয়েছিলেন ‘পিটার্সবুর্গ সমাজের বিবেক’। কারেনিন এই মহলটা খুবই কদর করতেন এবং সবার সাথে মিশতে পটু আন্নাও তাঁর পিটার্সবুর্গ জীবনের প্রথম দিকটায় এই মহলেই তাঁর বন্ধুদের পেয়েছিলেন। এখন কিন্তু মস্কো থেকে ফেরার পর মহলটা অসহনীয় লাগল তাঁর কাছে। মনে হল তিনি নিজে এবং ওঁরা সবাই ভান করে চলেছেন এবং মহল তাঁর কাছে এত একঘেয়ে আর অস্বস্তিকর হয়ে উঠল যে কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনার ওখানে তিনি যেতে লাগলেন যথাসম্ভব কম।
তৃতীয় যে মহলের সাথে তাঁর যোগাযোগ ছিল, সেটাই হল আসল সমাজ—বলনাচ, ভোজ, চোখ-ঝলসানো বেশভূষার সমাজ, যা রাজদরবার আঁকড়ে ধরে থাকা যাতে অর্ধসমাজে নেমে যেতে না হয়। এই মহলের লোকেরা অর্ধসমাজকে ঘৃণা করেন বলে ভাবতেন যদিও তাঁদের রুচি ছিল শুধু সদৃশ নয়, একই। এই সমাজের সাথে আন্নার যোগাযোগ ছিল তাঁর ফুফাতো ভাইয়ের স্ত্রী প্রিন্সস বেত্সি ভেস্কায়া মারফত, যাঁর আয় ছিল এক লাভ বিশ হাজার, সমাজে আন্নার আবির্ভাব মাত্র তিনি তাঁর বিশেষ অনুরাগী হয়ে ওঠেন, তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা করতেন এবং কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনার মহল নিয়ে হাসাহাসি করে তাঁকে টেনে নিতেন নিজের মহলে।
বেত্সি বললেন, ‘আমি যখন বুড়ি আর বিছ্ছিরি হয়ে উঠব, তখন আমিও হয়ে যাব ঐরকম! কিন্তু আপনার পক্ষে, সুন্দরী যুবতী নারীর পক্ষে ঐ দাতব্যালয়ে যাবার সময় এখনো আসেনি।’
প্রথমটায় আন্না যতটা পেরেছেন কাউন্টেস ভেস্কায়ার এই সমাজটাকে এড়িয়ে যেতেন, কেননা এ সমাজে ব্যয় করতে হত তাঁর সাধ্যের বাইরে, তা ছাড়া মনে মনেও প্রথম মহলটিই ছিল তাঁর পছন্দ। কিন্তু মস্কো সফরের পর ব্যাপারটা দাঁড়াল উল্টো। তিনি তাঁর সদাচারী বন্ধুদের এড়িয়ে সেরা সমাজে যাতায়াত শুরু করলেন। সেখানে ভ্রন্স্কির সাথে তাঁর দেখা হত আর প্রতিটি সাক্ষাতেই আনন্দের দোলা অনুভব করতেন তিনি। ভ্রন্স্কিকে তিনি ঘন ঘনই দেখতেন বেত্সির ওখানে, বিয়ের আগে উনিও ছিলেন ভস্কায়া, ভ্রন্স্কির চাচাতো বোন। যেখানে আন্নার দেখা পাওয়া যেতে পারে, তেমন সবখানেই হাজির থাকতেন ভ্রন্স্কি আর সুযোগ পেলেই বলতেন তাঁর ভালোবাসার কথা। কোন সুযোগ দিতেন না আন্না, কিন্তু দেখা হলেই তাঁর ভেতর সেই প্রাণচাঞ্চল্য জেগে উঠত যা তিনি অনুভব করেছিলেন রেল কামরায় তাঁকে প্রথম দেখে। নিজেই তিনি টের পেতেন যে ওঁকে দেখলেই ওঁর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠছে আনন্দে, ঠোঁট কুঞ্চিত হচ্ছে হাসিতে, কিন্তু এই আনন্দের প্রকাশটা তিনি চাপা দিতে পারতেন না।
প্রথম প্রথম আন্না সত্যিই বিশ্বাস করতেন যে ভ্রন্স্কি ওঁর পিছু নিয়েছেন বলে উনি ওঁর ওপর অসন্তুষ্ট। কিন্তু মস্কো থেকে ফেরার কিছু পরে এক সান্ধ্য বাসরে যেখানে ভ্রন্স্কির দেখা পাবেন বলে ভেবেছিলেন অথচ তিনি ছিলেন না, সেখানে যে নৈরাশ্য তাঁকে আচ্ছন্ন করেছিল, তা থেকে তিনি পরিষ্কার বুঝলেন যে আত্মপ্রতারণা করছেন, ভ্রন্স্কির এই অনুসরণ তাঁর কাছে শুধু অপ্রীতিকর নয়, তাই নয়, এইটের তাঁর জীবনের একমাত্র আকর্ষণ।
