‘তোর কষ্টের ব্যাপারটা ছাড়া আর কি নিয়ে?’
‘আমার কোন কষ্ট নেই।’
‘খুব হয়েছে কিটি। তুই কি ভাবিস আমি জানতে পারি না? সব জানি। বিশ্বাস কর আমাকে, ওটা কিছু না… সবাই আমরা এ জিনিসের মধ্যে দিয়ে গেছি।
কিটি চুপ করে রইল, কঠোরতা ফুটে উঠল মুখে।
‘তুই ওর জন্য কষ্ট পাবি, ও তার যোগ্য নয়’, সোজাসুজি আসল কথাটা তুললেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা।
‘কারণ ও আমাকে অবহেলা করেছে’, কাঁপা কাঁপা গলায় কিটি বলল, ‘বলো না ও কথা! দয়া করে বলো না!’
‘কে তোকে বলতে যাচ্ছে? কেই বলেনি। আমার কোন সন্দেহ নেই যে তোকে ও ভালোবেসেছিল এবং বাসছে, তবে…’
‘উঃ, এসব দরদ আমার কাছে ভয়ংকর লাগে!…’ হঠাৎ রেগে মেগে চেঁচিয়ে উঠল কিটি। চেয়ারে ঘুরে বসল সে, লাল হয়ে উঠল, কোমরবন্ধের বকলসটা কখনো এ-হাতে কখনো ও-হাতে চেপে ধরে দ্রুত আঙুল নাড়াতে লাগল। রেগে উঠলে কিছু একটা চেপে ধরার এই যে এক অভ্যাস আছে কিটির, ডল্লির জানা ছিল। এও তিনি জানতেন যে উত্তেজনার মুহূর্তে কিটি অনাবশ্যক ও অপ্রীতিকর অনেক কিছুই বলে ফেলতে পারে। তাকে শান্ত করতে চেয়েছিলেন ডল্লি কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গিয়েছিল।
‘কি, কি আমাকে বোঝাতে চাস তুই, কি?’ দ্রুত বলে গেল কিটি, ‘এই তো যে আমি একজনের প্রেমে পড়েছিলাম, সে আমাকে পাত্তাই দিল না, আর তার ভালোবাসার জন্য আমি হেদিয়ে মরছি? আর সে কথা বলছে কিনা বোন, যে ভাবছে যে… যে…যে আমাকে দরদ দেখাচ্ছে!… এসব করুণা আর ভানে আমার দরকার নেই!
‘কিটি, ওটা ঠিক নয়।’
‘কেন যন্ত্রণা দিচ্ছ আমাকে?’
‘আরে না, বরং উল্টো… আমি দেখছি তুই কষ্ট পাচ্ছিস…’
কিন্তু উত্তেজনায় কিটি শুনল না ওঁর কথা।
‘দুঃখ করার, সান্ত্বনা পাবার কিছু নেই। আমাকে যে ভালোবাসে না তাকে যে আমি ভালোবাসতে যাব না, এ গর্ববোধ আমার আছে।’
‘আরে না, আমি তা বলছি না… কিন্তু একটা কথা, সত্যি করে বল তো’, কিটির হাত ধরে দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা বললেন, ‘আচ্ছা, লেভিন তোকে কিছু বলেছিল?…’
লেভিনের উল্লেখে কিটি তার শেষ আত্মসংযমটুকুও হারাল বলে মনে হল; চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে বকলসটা মেঝেয় আছড়ে ফেলে ঘন ঘন হাত নেড়ে কিটি বলল, ‘এখানে লেভিনের কথা আবার আসে কেন? বুঝি না, আমাকে যন্ত্রণা দেবার কি দরকার পড়ল তোমার? আমি বলেছি এবং আবার বলছি, আমার গর্ববোধ আছে, তুমি যা করছ তা আমি কখনো করব না, কখনো না—যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, অন্য মেয়েকে ভালোবেসেছে, ফিরব না তার কাছে। এ জিনিস আমি বুঝি না, বুঝি না। তুমি পারো, কিন্তু আমি পারি না :’
এই বলে কিটি তাকাল বোনের দিকে আর ডল্লি বিষণ্ণভাবে মাথা নুইয়ে চুপ করে আছে দেখে যা ভেবেছিল তার বদলে ঘর থেকে বেরিয়ে না গিয়ে দরজার কাছে বসে রুমালে মুখ ঢেকে মাথা নিচু করল।
দু’মিনিট কাটল নীরবতায়। ডল্লি ভাবছিলেন নিজের কথা। যে হীনতা তিনি অনুক্ষণ টের পাচ্ছেন, বোন সেটা মনে করিয়ে দেওয়াতে খুবই ব্যথা লাগল তাঁর। বোনের কাছ থেকে এতটা নিষ্ঠুরতা তিনি আশা করেননি, রাগ হল তাঁর। বোনের কাছ থেকে এতটা নিষ্ঠুরতা তিনি আশা করেননি, রাগ হল তাঁর। কিন্তু হঠাৎ পোশাকের খসখস আর চাপা কান্নার শব্দ তাঁর কানে এল, নিচু থেকে কার হাত জড়িয়ে ধরল তাঁর গলা। সামনে তাঁর হাঁটু গেড়ে বসে আছে কিটি।
‘ডল্লিন্কা, আমি বড়বড় অসুখী!’ দোষীর মত সে বলল ফিসফিসিয়ে।
চোখের পানিতে ভেজা তার মিষ্টি মুখখানা সে গুঁজল ডল্লির স্কার্টে।
অশ্রু যেন সেই তৈলপ্রলেপ যা ছাড়া দু’বোনের মধ্যে আদান-প্রদানের শকট ভালোরকম চলতে পারে না। কান্নার পর নিজেদের মনের কথা বলাবলি করল না বোনেরা, কিন্তু অন্য ব্যাপার নিয়ে কথা বললেও পরস্পরকে বুঝতে তাদের অসুবিধা হল না। কিটি বুঝল যে রাগের মাথায় স্বামীর বিশ্বাসঘাতকতা এবং তাঁর হীনতা সম্পর্কে সে যে কথা বলেছে তা বেচারা বোনকে মর্মাহত করেছে, তবে তিনি ক্ষমা করেছেন তাকে। অন্যদিকে ডল্লি যা জানতে চাইছিলেন তা সবই বুঝতে পারলেন; তিনি নিশ্চিত হয়ে উঠলেন যে তাঁর অনুমানটা সঠিক। কষ্ট, কিটির অচিকিৎস্য কষ্টটা হল এই যে লেভিন পাণিপ্রার্থনা করেছিলেন কিন্তু কিটি তা প্রত্যাখ্যান করেছে, ওদিকে ভ্রন্স্কি প্রতারণা করেছেন তার সাথে, লেভিনকে ভালোবাসতে আর ভ্রন্স্কিকে ঘৃণা করতে কিটি রাজি; এ সম্পর্কে একটা কথাও কিটি বলল না, সে বলল, শুধু তার মনের অবস্থার কথা।
‘আমার কোন দুঃখ নেই’, শান্ত হয়ে কিটি বলল, ‘কিন্তু তুমি বুঝতে পারবে কি, সব কিছু আমার কাছে হয়ে দাঁড়িয়েছে জঘন্য, বিছ্ছিরি, কর্কশ, সবার আগে আমি নিজে। তুমি ভাবতে পারবে না সবার সম্পর্কে কি জঘন্য চিন্তা আমার মনে আসে।’
‘তোর আবার কি জঘন্য চিন্তা মনে আসবে?’ হেসে জিজ্ঞেস করলেন ডল্লি।
‘অতি অতি জঘন্য আর কদর্য। তোমাকে বলতে পারব না। সেটা একঘেয়েমি বা মন-পোড়ানি নয়, তার চেয়ে অনেক খারাপ। আমার মধ্যে ভালো যা কিছু ছিল সব যেন চাপা পড়েছে, রয়ে গেছে শুধু জঘন্যটা। মানে কি তোমাকে বলি? বোনের চোখে বিহ্বলতা লক্ষ্য করে কিটি বলে চলল, ‘বাবা আজ আমাকে বলতে শুরু করেছিলেন—আমার মনে হয় যে উনি কেবল ভাবেন যে আমার বিয়ে হওয়া উচিত। মা আমাকে নিয়ে যান বলনাচের আসরে, আমার মনে হয় উনি নিয়ে যান কেবল তাড়াতাড়ি আমার বিয়ে দিয়ে রেহাই পাবার জন্য। আমি জানি যে কথাটা ঠিক নয়, কিন্তু এই ভাবনাগুলো তাড়াতে পারি না। তথাকথিত পাত্রদের আমি দেখতে পারি না দু’চক্ষে। মনে হয় ওরা যেন আমার মাপ নিয়ে দেখেছে। বলনাচের পোশাক পরে কোথাও যাওয়া আগে আমার কাছে ছিল স্রেফ একটা আনন্দের ব্যাপার, নিজেকে নিয়ে মুগ্ধ হয়ে থাকতাম আমি; এখন লজ্জা হয়, অস্বস্তি লাগে, মানে কি আর বলব! ডাক্তারটি…’
