‘সে কি, বন বেচবার জন্য এখনো গাঁয়ে যায়নি সে?’
না, কেবল তোড়জোড়ই চলছে।’
‘বটে!’ প্রিন্স বললেন, ‘তাহলে আমিই যাব, নাকি?’ আসন নিয়ে তিনি স্ত্রীকে বললেন, ‘আজ্ঞা হোক। আর তুই কাতিয়া শোন’, ছোট মেয়ের দিকে ফিরলেন তিনি, ‘সুন্দর এক দিনে তুই একবার জেগে উঠে নিজেকে বলবি : আরে আমি যে একেবারে সুস্থ, হাসি-খুশি, তুহিন ঠাণ্ডায় ভোরে আবার বেড়াতে যাওয়া যাক বাপের সাথে, এ্যাঁ, কি বলিস?’
বাবা যা বললেন সেটা খুবই সহজ বলে মনে হওয়া উচিত, কিন্তু কথাগুলো কিটিকে বিব্রত আর অপ্রস্তুত করে তুলল, যেন চোর ধরা পড়েছে। ‘হ্যাঁ, উনি সব জানেন, সব বোঝেন, এই কথাগুলোতে উনি আমাকে বলতে চাইছেন লজ্জার কথা বটে, কিন্তু লজ্জা কাটিয়ে ওঠা দরকার।’ জবাব দেবার সাহস হল না তার। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ কেঁদে ফেলে ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
‘হল তো তোমার রসিকতা!’ প্রিন্সের ওপর মুখিয়ে উঠলেন প্রিন্স-মহিষী, ‘সব সময় তুমি…’ শুরু করলেন তাঁর ভর্ৎসনা-ভাষণ।
বেশ অনেকক্ষণ ধরেই প্রিন্স-মহিষীর বকুনি শুনলেন প্রিন্স, চুপ করেই ছিলেন, কিন্তু ক্রমেই ভ্রুকুটি ফুটে উঠছিল মুখে।
‘এমনিতেই বেচারা মরমে মরে আছে, আর তুমি বোঝো না যে তার কারণ নিয়ে যে কোন ইঙ্গিতেই কি কষ্ট হয় ওর। আহ্! মানুষ সম্পর্কে এমন ভুল কেউ করে!’ প্রিন্স-মহিষী বললেন এবং তাঁর গলার স্বর পরিবর্তনে ডল্লি ও প্রিন্স বুঝলেন যে উনি ভ্রন্স্কির কথা বলছেন, ‘এই ধরনের জঘন্য ইতর লোকদের বিরুদ্ধে আইন নেই কেন বুঝি না।’
‘আহ্, শুনতে না হলে বাঁচি!’ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে প্রিন্স যাওয়ায় উপক্রম করলেন, কিন্তু থেমে গেলেন দরজার কাছে, ‘আইন আছে গো, আর আমাকে যখন বলিয়ে ছাড়লে তখন বলি সমস্ত ব্যাপারটায় দোষ কার : তোমার, তোমার, একলা তোমার। এসব ছোকরাদের বিরুদ্ধে সব সময়ই ছিল আর আছে আইন! হ্যাঁ, যা হওয়া উচিত নয় তা যদি না হত, তাহলেও, বুড়ো হলেও আমি ওকে, ওই ভদ্রলোককে ডুয়েলে ডাকতাম। আর এখন যাও, সারিয়ে তোলো, ডেকে আনো যত হাতুড়েদের।’
মনে হল প্রিন্সের আরো অনেক কিছু বলার আছে কিন্তু তাঁর কথায় সুর ধরতে পারা মাত্র প্রিন্স-মহিষী তখনই নরম হয়ে অনুতাপ করতে লাগলেন, গুরুতর প্রশ্নে সব সময়ই যা হয়ে থাকে।
কাছে সরে এসে, কেঁদে ফেলে, ফিসফিস করে তিনি বললেন, ‘আলেকজান্ডার, আলেকজান্ডার।‘
উনি কাঁদতেই প্রিন্সও চুপ করে গেলেন। গৃহিণীর কাছে গেলেন তিনি।
‘নাও, হয়েছে, হয়েছে! তুমিও কষ্ট পাচ্ছ আমি জানি। কিন্তু কি করা যাবে? মহাবিপদ কিছু নয়। সৃষ্টিকর্তা করুণাময়… ধন্যবাদ জানাও…’ উনি বললেন কিন্তু নিজেই জানতেন না কি বলছেন। হাতে গৃহিণীর সিক্ত চুম্বন অনুভব করে তার প্রতিদান দিলেন তিনি। এবং বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে
সাশ্রনয়নে কিটি ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই ডল্লি তাঁর মাতৃসুলভ পারিবারিক অভ্যাসবশে টের পেয়েছিলেন, এখানে নারীর হস্তক্ষেপ দরকার এবং তার জন্য তৈরি হলেন। টুপি খুলে রেখে নৈতিক দিক থেকে আস্তিন গুটিয়ে তিনি কাজে নামলেন। মা যখন বাবাকে আক্রমণ করছিলেন, তখন কন্যার পক্ষ থেকে সম্মানের মধ্যে যতটা সম্ভব, মাকে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি। বাপ যখন ফেটে পড়েন তখন তিনি চুপ করে ছিলেন। মায়ের জন্য তাঁর লজ্জা হচ্ছিল, আর তখনই সদয় হয়ে ওঠা বাপের জন্য একটা কোমলতা বোধ করেছিলেন ডল্লি। কিন্তু বাবা চলে যাবার পর প্রধান যে জিনিসটা করা উচিত তার জন্য তিনি তৈরি হলেন, অর্থাৎ কিটির কাছে গিয়ে তাকে শান্ত করা।
‘আমি আপনাকে অনেকদিন থেকে বলব ভাবছিলাম মা; গতবার লেভিন যখন এখানে এসেছিল, সে কিটির পাণিপ্রার্থনা করতে চেয়েছিল, জানেন? স্তিভাকে সে বলেছে।’
‘তাতে কি হল? আমি বুঝতে পারছি না…’
‘মানে কিটি হয়ত তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে?… আপনাকে কিছু বলেনি সে
না, ওর সম্পর্কে বা অন্যজন সম্পর্কেও কিছু সে বলেনি; বড় বেশি ওর গর্ব কিন্তু আমি জানি এ সবই ওই থেকে….
‘হ্যাঁ, ভেবে দেখুন, ও যদি লেভিনকে প্রত্যাখ্যান করে থাকে, আর প্রত্যাখ্যান করত না যদি এটা না থাকত, আমি জানি… অথচ পরে এটি ভয়ংকরভাবে ঠকাল ওকে।’
মেয়ের কাছে প্রিন্স-মহিষী কত দোষী সেটা ভাবতে আতংক হচ্ছিল তাঁর, তিনি রেগে উঠলেন।
‘আহ্ কিছুই আমি বুঝতে পারছি না! সবাই আজকাল চলতে চায় নিজের বুদ্ধিতে, মাকে কিছু বলে না, তারপর এই তো…’
‘মা, আমি ওর কাছে চললাম।’
‘যাও-না। আমি কি বারণ করেছি?’
তিন
কিটির ছোট্ট সুন্দর পুরানো স্যাক্সন চিনেমাটি পুতুলে সাজানো, দু’মাস আগেও কিটি যেমন ছিল তেমনি তারুণ্যে ভরা, গোলাপি, হাসিখুশি ঘরখানায় ঢুকে ডল্লির মনে পড়ল গত বছর দুজনে মিলে ওরা ঘরখানা কিভাবে গুছিয়েছিল কি আনন্দ করে, ভালোবেসে। গালিচার এক কোণে নিশ্চল দৃষ্টি মেলে দরজার কাছে নিচু একটা চেয়ারে কিটিকে বসে থাকতে দেখে বুক তাঁর হিম হয়ে এল। বোনের দিকে চাইল কিটি, মুখের নিরুত্তাপ, ঈষৎ রুক্ষ ভাবটা কাটল না।
তার কাছে বসে দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা বললেন, ‘আমি এখন চলে যাচ্ছি, ঘরে বসে থাকতে হবে, তোরও আমার কাছে আসা চলে না। কিছু কথা আছে তোর সাথে।’
‘কি নিয়ে?’ ভীতভাবে মাথা তুলে ক্ষিপ্র প্রশ্ন করল কিটি।
