নামকরা ডাক্তার বললেন, ‘বসুন, বসুন প্রিন্সেস।’
হাসিমুখে তার সামনে বসে তিনি নাড়ি দেখলেন, আবার সেই একঘেয়ে প্রশ্নগুলো করে যেতে থাকলেন। জবাব দিচ্ছিল কিটি, হঠাৎ রেগে উঠে দাঁড়াল।
‘মাপ করবেন ডাক্তার, কিন্তু সত্যি, এতে কোন ফল হবে না। তিনবার আপনি একই কথা জিজ্ঞেস করছেন আমাকে।’
নামকরা ডাক্তার রাগ করলেন না।
কিটি চলে যাবার পর তিনি প্রিন্স-মহিষীকে বললেন, ‘অসুস্থ বিরক্তিপ্রবণতা। তবে আমার কাজ হয়ে গেছে…’
তারপর যেন একজন অসাধারণ বুদ্ধিমতী নারীর সাথে কথা বলছেন এমনভাবে প্রিন্স-মহিষীকে তিনি তাঁর কন্যার অবস্থা সম্পর্কে একটা বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা দিলেন এবং শেষ করলেন যে পানি খাবার প্রয়োজন নেই তা কি করে খেতে হবে তার উপদেশ দিয়ে। বিদেশে যাওয়া চলবে কিনা এ প্রশ্নে ডাক্তার গভীর চিন্তায় ডুবে গিয়ে কঠিন একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে লাগলেন। অবশেষে উত্তর পাওয়া গেল : যান, তবে হাতুড়েদের যেন বিশ্বাস না করেন আর সব ব্যাপারে তাঁর উপদেশ নেবেন।
ডাক্তার চলে যাবার পর যেন খুব একটা আনন্দের ব্যাপার ঘটেছে বলে মনে হল। মা আনন্দ করে এলেন কিটির কাছে, কিটিও ভান করল যেন তারও আনন্দ হয়েছে। ওকে ঘন ঘন, প্রায় সব সময়ই ভান করতে হচ্ছে এখন।
‘সত্যি মা, আমি সুস্থ। কিন্তু আপনি যদি যেতে চান, চলুন যাওয়া যাক!’ এবং আসন্ন যাত্রায় তার আগ্রহ দেখাবার জন্য তোড়জোড়ের ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে শুরু করল।
দুই
ডল্লি এলেন ডাক্তার চলে যাবার পরই। তিনি জানতেন যে সেদিন একটা ডাক্তারি পরামর্শ হবার কথা, তাই অতি সম্প্রতি প্রসব থেকে উঠলেও (শীতের শেষে মেয়ে হয়েছে তাঁর) এবং নিজেরই তাঁর নানান দুর্ভাবনা আর ঝামেলা থাকলেও কোলের শিশুটি আর রুগ্ন একটা মেয়েকে বাড়িতে রেখে চলে এসেছেন কিটির ভাগ্য আজ কি দাঁড়াল জানতে।
তিনি ড্রয়িং-রুমে ঢুকে টুপি না খুলেই বললেন, ‘কি, তোমরা সবাই যে বড় হাসিখুশি। তাহলে ভালো?’ ডাক্তার কি বলেছেন সেটা তাঁকে বোঝাবার চেষ্টা হল, কিন্তু ডাক্তার বেশ গুছিয়ে অনেকক্ষণ ধরে ব্যাপারটা বললেও ঠিক কি যে বলেছেন সেটা বোঝানো গেল না। শুধু এটুকুই আকর্ষণীয় যে বিদেশে যাওয়া স্থির হয়েছে।
অজ্ঞাতসারে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ডল্লি। তাঁর সেরা বন্ধু, তাঁর বোন চলে যাচ্ছে। অথচ তাঁর নিজের জীবন আনন্দের নয়। মিটমাটের পর অব্লোন্স্কির সাথে সম্পর্কটা হয়ে দাঁড়িয়েছে হীনতাসূচক। আন্না যে রাং ঝালাই দিয়েছিলেন, দেখা গেল সেটা মজবুত নয়। পারিবারিক বনিবনার জোড় খুলে গেল আবার সেই একই জায়গায়। সুনির্দিষ্ট কিছু ঘটেনি বটে, কিন্তু অব্লোন্স্কি প্রায় কখনোই বাড়িতে থাকতেন না, টাকাও প্রায় কিছু থাকত না, তাঁর অবিশ্বস্ততার সন্দেহ ডল্লিকে অবিরাম পীড়া দিত, সেটা তিনি মন থেকে ঝেড়েও ফেলেছেন ঈর্ষার যে কষ্ট ভুগেছেন তার ভয়ে। ঈর্ষার প্রথম বিস্ফোরণ একবার কেটে গেলে তা আবার ফেরে না, এমন কি অবিশ্বস্ততা প্রকাশ পেলেও তার প্রতিক্রিয়া হয় না সেই প্রথমবারের মত। তা প্রকাশ পেলে এখন শুধু তাঁর সাংসারিক অভ্যাসগুলোই ঘুচে যেত, তাই তিনি আত্মপ্রতারণা করতেন আর এই দুর্বলতার জন্য ঘৃণা করতেন স্বামীকে এবং তার চেয়েও বেশি নিজেকে। তাঁর ওপর একটা বড় সংসারের ঝামেলা অবিরাম তাঁকে জ্বালাত : কখনো কোলেরটাকে খাওয়ানো হয় না, কখনো চলে যায় আয়া, আবার কখনো, যেমন এখন, ছেলেমেয়েদের কেউ না কেউ রোগে পড়ে।
‘আর তোমাদের খবর কি?’ মা জিজ্ঞেস করলেন।
‘আহ্ মা, আপনাদের নিজেদের দুঃখ-কষ্টই তো অনেক। লিলি অসুখে পড়েছে, আমার ভয় হচ্ছে স্কার্লেট জ্বর, আমি এলাম শুধু খবরটা জানতে, আর সৃষ্টিকর্তা না-করুন, যদি স্কার্লেট হয় তাহলে ঘরেই বসে থাকব, বেরোনো হবে না।’
ডাক্তার চলে যাবার পর বৃদ্ধ প্রিন্সও বেরিয়ে এলেন তাঁর কেবিনেট থেকে, ডল্লির দিকে গাল বাড়িয়ে দিয়ে কথা বললেন তাঁর সাথে। স্ত্রীকে বললেন : ‘কি ঠিক করলে তাহলে, যাচ্ছ? আর আমার কি করবে ভাবছ?’
স্ত্রী বললেন, ‘আমার মনে হয় তোমার থাকাই ভালো হবে আলেকজান্ডার।’
‘যা বলবে।’
কিটি বলল, ‘মা, কেনই-বা বাবা যাবেন না আমাদের সাথে? ওঁর ভালো লাগবে, আমাদেরও।
বৃদ্ধ প্রিন্স উঠে দাঁড়িয়ে হাত বোলালেন কিটির চুলে। কিটি মুখ তুলল, জোর করে হেসে চাইল তাঁর দিকে। কিটির সব সময় মনে হত পরিবারের সবার চেয়ে উনিই তাকে ভালো বোঝেন, যদিও তার সাথে কথা বলতেন কম। সবার ছোট বলে সে ছিল বাপের প্রিয়পাত্রী এবং তার মনে হত যে তার প্রতি ভালোবাসাই ওঁকে অন্তর্দর্শী করে তুলেছে। প্রিন্স একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলেন তার দিকে। তাঁর সহৃদয় নীল চোখে চোখ পড়তেই কিটির মনে হল উনি তার ভেতরটা দেখতে পাচ্ছেন, সব কিছু বুঝতে পারছেন যা খারাপ, কি হচ্ছে তার ভেতরটায়। লাল হয়ে কিটি চুমু পাবার আশায় মুখ বাড়িয়ে দিল, উনি কিন্তু শুধু তার চুল ঘেঁটে বললেন, ‘যতসব নির্বোধ পরচুলা! আসল মেয়েটা পর্যন্ত পৌঁছানোই মুশকিল, আদর করতে হচ্ছে স্থবিরা মহিলার চুলে। তা ডল্লিন্কা’, বড় মেয়ের দিকে ফিরলেন তিনি, ‘তোমার তুরুপের তাসটি কি করছে?’
‘কিছুই করছে না বাবা’, কথাটা যে তাঁর স্বামীকে নিয়ে সেটা বুঝে জবাব দিলেন ডল্লি। ‘কেবিল কোথায় বেরিয়ে যায়, দেখা পাওয়াই ভার’, একটু উপহাসের হাসি না হেসে জবাব দেওয়া অসম্ভব হয়েছিল তাঁর পক্ষে।
