মেনে নিতে হল, কেননা সমস্ত ডাক্তার একই স্কুলে একই বই পড়লেও এবং একই বিদ্যা জানলেও, আর এই নামকরা ডাক্তারটি পাজি ডাক্তার এমন কথা কেউ কেউ বললেও প্রিন্স-মহিষীর বাড়িতে এবং তাঁর মহলে কেন জানি ধরে নেওয়া হয়েছিল যে একমাত্র এই নামকরা ডাক্তারটিই বিশেষ কি একটা জিনিস জানেন এবং একমাত্র তিনিই বাঁচাতে পারেন কিটিকে। হতবুদ্ধি এবং লজ্জায় আড়ষ্ট রোগীকে মন দিয়ে গা ঠুকে ঠুকে দেখে নামকরা ডাক্তার সযত্নে হাত ধুয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন ড্রয়িং-রুমে, কথা বলতে লাগলেন প্রিন্সের সাথে। প্রিন্স ভুরু কুঁচকে কাশতে কাশতে তাঁর কথা শুনছিলেন। প্রিন্স জীবনাভিজ্ঞ লোক, বোকাও নন, রুগ্নও নন, ওষুধপত্রে তাঁর বিশ্বাস ছিল না, গোটা এই প্রহসনটায় তিনি মনে মনে খেপছিলেন, এবং সেটা আরও এই জন্য যে একমাত্র তিনিই বোধহয় কিটির রোগের কারণ পুরো বুঝতে পারছিলেন। ‘ঘেউঘেউয়ে কুকুর’, শিকারীদের ঝুলি থেকে নেওয়া এই শব্দটা মনে মনে নামকরা ডাক্তারের উদ্দেশে প্রয়োগ করে তিনি শুনে যাচ্ছিলেন কন্যার রোগলক্ষণ নিয়ে তাঁর বকবকানি। ডাক্তারও ওদিকে বৃদ্ধ এই নবাবপুত্রের প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণা কষ্টে চেপে রেখে তাঁর বোধগম্যতার মানে নেমে আসছিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন যে বৃদ্ধের সাথে কথা বলে লাভ নেই, এ বাড়ির প্রধান হলেন গিন্নি। তাঁর কাছেই তিনি তাঁর মুক্তা ছড়াবেন বলে ঠিক করলেন। এই সময় প্রিন্স মহিষী ড্রয়িং-রুমে এলেন গৃহচিকিৎসককে নিয়ে। গোটা এই প্রহসনটা তাঁর কাছে কত হাস্যকর সেটা কারো চোখে পড়তে না দেবার জন্য প্রিন্স করে গেলেন। প্রিন্স-মহিষী হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিলেন, বুঝতে পারছিলেন না কি করবেন। কিটির কাছে নিজেকে দোষী মনে হচ্ছিল তাঁর। বললেন, ‘আমাদের ভাগ্য গুণে দিন ডাক্তার। সব কিছু আমার বলুন।’ বলতে চাইছিলেন, ‘আশা আছে কি?’ কিন্তু ঠোঁট তাঁর কেঁপে উঠল, প্রশ্নটা আর করতে পারলেন না, তাহলে ডাক্তার?…’
‘এখন প্রিন্সেস, আমার সহকর্মীর সাথে একটু কথা কয়ে নিই তারপর আপনাকে আমার মত জানাবার সম্মান পেতে পারব।’
‘তাহলে আপনাদের এখানে একলা রেখে যাব?’
‘আপনার যা অভিরুচি।’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রিন্স-মহিষী বেরিয়ে গেলেন।
ওঁরা একলা হতে গৃহচিকিৎসক ভয়ে ভয়ে তাঁর এই অভিমত দিয়ে শুরু করলেন যে ক্ষয়রোগ প্রক্রিয়ার শুরুটা দেখা যাচ্ছে, তবে… ইত্যাদি, ইত্যাদি। নামকরা ডাক্তার তাঁর কথা শুনতে শুনতে কথার মাঝখানেই তাকিয়ে দেখলেন তাঁর প্রকাণ্ড সোনার ঘড়িটায়।
বললেন, ‘হুঁ, তবে…’
কথার মাঝখানে সসম্ভ্রমে চুপ করে গেলেন গৃহচিকিৎসক।
‘আপনি তো জানেন, গহ্বর দেখা না দেওয়া পর্যন্ত ক্ষয়রোগ প্রক্রিয়ার শুরুটা আমরা স্থির করে বলতে পারি না। তবে সন্দেহ করতে পারি। তার লক্ষণও আছে : খাওয়ায় বেনিয়ম, স্নায়বিক উত্তেজনা, ইত্যাদি। প্রশ্নটা দাঁড়াচ্ছে এইঃ ক্ষয়রোগের সন্দেহ হলে পুষ্টি বজায় রাখার জন্য কি করা যায়?’
‘কিন্তু এসব ক্ষেত্রে সব সময়ই একটা নৈতিক, মানসিক কারণ লুকিয়ে থাকে, আপনি তো জানেন’, মৃদু হেসে গৃহচিকিৎসক কথাটা পাড়লেন।
আবার ঘড়িতে দৃষ্টিপাত করে নামকরা ডাক্তার জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, সে তো বলাই বাহুল্য।’ জিজ্ঞেস করলেন, ‘মাপ করবেন, ইয়াউজা সেতু কি বসানো হয়েছে, নাকি আবার ঘুরে যেতে হবে? বটে, বসানো হয়েছে? তবে তো আমি বিশ মিনিটে পৌঁছে যেতে পরি। তাহলে যা বলছিলাম, প্রশ্নটা এই : পুষ্টি বজায় রাখা আর স্নায়ু সুস্থ করা। একটা আরেকটার সাথে সম্পর্কিত। এগোতে হরে দুদিক থেকেই।’
গৃহচিকিৎসক জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিন্তু বিদেশে যাওয়া?’
‘আমি বিদেশযাত্রার বিরোধী। দেখুন-না, ক্ষয়রোগ প্রক্রিয়া যদি শুরু হয়ে গিয়ে থাকে, যা জানা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়, তাহলে বিদেশে গিয়েও লাভ হবে না। আমাদের এমন কিছু করতে হবে যাতে পুষ্টি বজায় থাকে আর ক্ষতি না হয়।’
এবং নামকরা ডাক্তার সোডেন পানি দিয়ে তাঁর চিকিৎসার পরিকল্পনা পেশ করলেন, এটা বরাদ্দ করার প্রধান উদ্দেশ্য, বোঝাই গেল, ওতে ক্ষতি হতে পারে না।
গৃহচিকিৎসক মন দিয়ে সসম্ভ্রমে সবটা শুনলেন।
বললেন, ‘কিন্তু আমি বলব, অভ্যাসের বদল, স্মৃতি জাগিয়ে তোলার মত পরিবেশ থেকে সরে যাওয়া হল বিদেশে যাবার উপকার। তা ছাড়া মাও তাই চাইছেন।
‘ও! তা সেক্ষেত্রে কি করা যাবে, যাক বিদেশে, শুধু এই জার্মান হাতুড়েগুলো ক্ষতিই করবে… আমাদের কথা ওঁদের শোনা উচিত… তা যাক।’
আবার ঘড়ি দেখলেন তিনি।
‘আহ্, সময় হয়ে গেছে’, বলে গেলেন দরজার দিকে।
নামকরা ডাক্তার প্রিন্স-মহিষীকে জানালেন যে (সৌজন্যবশে) রোগীকে তাঁকে আবার দেখতে হবে।
‘সে কি! আবার পরীক্ষা!’ আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠলেন মা।
‘জ্বি না, শুধু কতকগুলো খুঁটিনাটি প্রিন্সেস।’
‘চলুন তাহলে।’
ডাক্তারকে সাথে করে মা গেলেন কিটির কাছে। কিটি দাঁড়িয়ে ছিল ঘরের মাঝখানে, রোগা, মুখ রাঙা, যে লজ্জা তাকে সইতে হয়েছে তার জন্য জ্বলজ্বল করছে চোখ। ডাক্তার ঢুকতেই আবার আরক্ত হয়ে উঠল সে, চোখ ভরে উঠল পানিতে। তার সমস্ত পীড়া তার কাছে মনে হচ্ছিল নির্বোধ, এমন কি হাস্যকর একটা ব্যাপার। চিকিৎসাটা তার কাছে মনে হচ্ছিল ভাঙা ফলদানির টুকরো জোড়া দেবার মতই নিরর্থক। বুক তার ভেঙে গেছে। পিল আর পাউডার দিয়ে কি সারাতে চায় ওরা? কিন্তু মায়ের মনে ঘা দেওয়া চলে না, সেটা আরো এই জন্য যে মা নিজেকে দোষী মনে করছেন।
