মস্কোর একেবারে ভিন্ন জগতের অভিজ্ঞতার পর ভ্রন্স্কি বিমূঢ় হয়েছিলেন শুধু প্রথম মুহূর্তটাতেই। কিন্তু তখনই যেন পুরনো জুতায় পা ঢোকালেন, চলে গেলেন নিজের পূর্বতন, আমুদে, প্রীতিকর জগতে।
কফি কিন্তু আর তৈরি হল না। উথলে উঠে তা ছিটকে পড়ল সবার গায়ে এবং তাই ঘটাল যার প্রয়োজন ছিল, যথা হাসি ও হুল্লোড়ের উপলক্ষ, দামী গালিচা ও ব্যারনেসের গাউন ভিজিয়ে দিল তা।
‘তাহলে এবার বিদায়, নইলে কখনোই আপনি গা ধোবেন না আর আমার বিবেকে বিঁধে থাকবে সজ্জন লোকের যা প্রধান অপরাধ—অপরিচ্ছন্নতা। তাহলে আপনি বলছেন গলার কাছে ছোরা ধরে রাখতে?’
‘অবশ্যই এবং এমনভাবে যাতে আপনার হাতখানা থাকে তার ঠোঁটের কাছে। ও আপনার হাতে চুমু খাবে এবং সব ভালোয় ভালোয় মিটে যাবে’, জবাব দিলেন ভস্কি।
‘তাহলে আজ ফরাসি থিয়েটারে!’ গাউন খসখস করে ব্যারনেস উধাও হলেন।
কামেরোভস্কিও উঠে দাঁড়ালেন। ভ্রন্স্কি তাঁর হাতে চাপ দিয়ে তাঁর চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা না করেই গোসলখানা ঢুকলেন। তিনি যখন হাতমুখ ধুচ্ছিলেন, পেত্রিৎস্কি সংক্ষেপে তাঁকে বললেন তাঁর অবস্থার কথা, ভ্রন্স্কি চলে যাওয়ার পর কতটা তা বদলেছে। টাকা একেবারে নেই। বাপ বলে দিয়েছে টাকা দেবে না, তাঁর ধারও শুধবে না। দর্জি তাঁর নামে মামলা করতে চায়, অন্যেরাও সোজাসুজি ভয় দেখাচ্ছে মামলার। রেজিমেন্ট কমান্ডার জানিয়ে দিয়েছেন, কেলেঙ্কারিগুলো না থামালে ইস্তফা দিতে হবে কাজে। ব্যারনেস তাঁকে তিতিবিরক্ত করে তুলেছে, বিশেষ করে এই জন্য যে অনবরত তাঁকে টাকা দিতে চান। আরেকটি আছে, ভ্রন্স্কিকে দেখাবেন, অপরূপ, অনিন্দ্য, নিখুঁত পুরবিয়া ছাঁদ, ‘ক্রীতদাসী রেবেকার জাত, বুঝেছিস।’ বেরকশেভের সাথেও কাল একচোট গালাগালি হয়ে গেছে। ও ডুয়েলের জন্য দোসর পাঠাতে চেয়েছিল, তবে বুঝতেই পারছিস, কিছুই ও সব হবে না। মোটের ওপর সবই চমৎকার, ফুর্তিতে চলছে। এবং বন্ধুকে নিজের অবস্থার খুঁটিনাটিতে ঢুকতে না দিয়ে পেত্রিৎস্কি তাঁকে জানাতে লাগলেন আকর্ষণীয় সমস্ত খবর। নিজের তিন বছরের পুরনো অতি পরিচিত ফ্ল্যাটে পেত্রিৎস্কির অতি পরিচিত কাহিনীগুলো শুনতে শুনতে অভ্যস্ত ও নিশ্চিন্ত পিটার্সবুর্গী জীবনে ফিরে আসার একটা মনোরম অনুভূতি হল ভ্রন্স্কির।
‘বলিস কি!’ যে ওয়াশ-বেসিনে তিনি তাঁর লালচে সবল ঘাড়ে পানি ঢালছিলেন, তার পাদানি ছেড়ে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘বলিস কি!’ চেঁচিয়ে উঠলেন এই খবর শুনে যে লোরা ফেটিসফকে ছেড়ে দিয়ে মিলেয়েভের সাথে জুটেছে। ‘ও সেই তেমনি বোকা আর খুশি হয়েই আছে? আর বুজুলুকভের খবর কি?’
‘আর বুজুলুকভের যা কাণ্ড, তোফা!’ চিৎকার করলেন পেত্রিৎস্কি, ‘ওর নেশা তো বলনাচ, দরবারের একটা আসরও সে বাদ দেয় না। এলাহি এক বলনাচে সে যায় নতুন হেলমেট পরে। নতুন হেলমেটগুলো দেখেছিস? অতি চমৎকার, হালকা। ও তো দাঁড়িয়েই আছে… আর শোন, শোন!
‘শুনছিই তো’, ফুঁয়ো-ফুঁয়ো তোয়ালেতে গা মুছতে মুছতে ভ্রন্স্কি বললেন।
‘কোন এক রাষ্ট্রদূতের সাথে গ্র্যান্ড ডাচেস এলেন, বেচারার কপাল খারাপ, ওঁদের কথাবার্তা চলছিল নতুন হেলমেট নিয়ে। গ্র্যান্ড ডাচেস ওঁকে নতুন হেলমেট দেখাতে চাইলেন… দেখেন, আমাদের শ্রীমানটি দাঁড়িয়ে আছে’ (পেত্রিৎস্কি দেখালেন কেমনভাবে সে দাঁড়িয়ে ছিল), ‘গ্র্যান্ড ডাচেস ওকে বললেন হেলমেটটা দিতে, ও কিন্তু দেয় না। ব্যাপার কি? সবাই ওর দিকে চোখ টেপে, মাথা নাড়ে, ভুরু কোঁচকায়। দাও হে! দেয় না। একেবারে নট নড়নচড়ন। ব্যাপার বোঝ। শুধু ঐ লোকটা রে…কি যেন নাম হেলমেটটা নিতে চায়। দেয় না!… তখন হেলমেট ছিনিয়ে নিয়ে সে দিল গ্র্যান্ড ডাচেসকে। উনি বললেন, ‘এই যে, এই হল গে নতুন।’ হেলমেট উলটিয়ে ধরলেন, আর ভাবতে পারিস, সেখান থেকে ঝুপ! পড়ল একটা নাশপাতি, বনবন, দু’পাউন্ড বনবন! শ্ৰীমান এগুলো মেরে দিয়েছিলেন!’
ভ্রন্স্কি হেসে একেবারে গড়াগড়ি। এবং তার অনেক পরেও বন্ধুর সাথে কথা বলার সময় হেলমেটের ঘটনাটা মনে পড়ে যেতে তিনি তাঁর শক্ত শ্রেণীবদ্ধ দাঁত বার করে হেসে উঠেছিলেন হো-হো করে।
সমস্ত খবর শোনার পর চাকরের সাহায্যে উর্দি পরে গেলেন দপ্তরে রিপোর্ট করতে। রিপোর্ট করে উনি ঠিক করলেন যাবেন ভাইয়ের কাছে, বেত্সির কাছে, এবং আরো কয়েকটা জায়গায় যাতে সেই সমাজে যাতায়াত শুরু করতে পারেন যেখানে কারেনিনার দেখা পাওয়া সম্ভব। পিটার্সবুর্গে থাকাকালীন সময়ে অন্যান্য বারের মতই বেশ রাত না হওয়া পর্যন্ত ফিরবেন না বলে তিনি বের হলেন।
আন্না কারেনিনা – ২.১
এক
শীতের শেষে শ্যেরবাৎস্কিদের বাড়িতে ডাক্তারদের একটা পরামর্শ সভা হল—কিটির স্বাস্থ্যের অবস্থা কেমন এবং তার শক্তি পুনরুদ্ধারের জন্য কি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার তা স্থির করার জন্য। অসুখ হয় কিটির, বসন্ত কাছিয়ে আসার সাথে সাথে স্বাস্থ্যে আরো খারাপ হতে থাকে। গৃহচিকিৎসক তাকে দিলেন কডলিভার অয়েল, তারপর লোহা, তারপর লাপিস, কিন্তু তার কোনটাতেই যেহেতু কোন ফল দিল না এবং যেহেতু তিনি বসন্তে কিটিকে বিদেশে নিয়ে যাবার পরামর্শ দিলেন, তাই নামকরা ডাক্তারকে ডাকা হল। নামকরা ডাক্তার তখনো বৃদ্ধ নন, দেখতে খুবই সুপুরুষ, রোগীকে পরীক্ষা করে দেখার দাবি করলেন তিনি। এই জেদ ধরে মনে হল তিনি বিশেষ তুষ্টি লাভ করছেন যে কুমারীর লজ্জাটা মাত্র বর্বরতার জের এবং যে পুরুষ এখনো বৃদ্ধ নয়, সে যে একজন নগ্ন তরুণীকে টিপেটুপে দেখবে, এর চেয়ে স্বাভাবিক আর কিছু হয় না। এটা তাঁর কাছে স্বাভাবিক লেগেছে, কারণ এই কাজই তিনি করছেন প্রতি দিন এবং তাতে তাঁর কিছুই মনে হত না, জিনিসটা খারাপ বলে তিনি ভাবতেন না, তাই বালিকার লজ্জাকে তিনি শুধু বর্বরতার জের নয়, নিজের প্রতি অপমানকর বলেও গণ্য করতেন।
