তাঁর জন্য কেবিনেটে ইতিমধ্যে বাতির ওপর শেড আর চেয়ারের কাছে একপাত্র পানি রাখা হয়েছিল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আন্না বললেন, ‘তা যাও, পড়ো গে। আমি চিঠি লিখব মস্কোয়।’
আন্নার হাতে চাপ দিয়ে উনি আবার চুমু খেলেন।
নিজের ঘরে এসে আন্না মনে মনে ভাবলেন, ‘যতই বল, উনি ভালো মানুষ, সত্যনিষ্ঠ, সহৃদয়, নিজের ক্ষেত্রে বিশিষ্ট’, যেন কেউ ওঁর দোষ ধরে বলেছে যে ওঁকে ভালোবাসা চলে না, তার বিরুদ্ধে আন্না সমর্থন করছেন ওঁকে 1 ‘কিন্তু কানটা অমন অদ্ভুতভাবে বেরিয়ে আছে কেন? নাকি চুল কেটেছেন বলে?’
ঠিক বারোটার সময় আন্না যখন তখনো লেখার টেবিলে ডল্লির কাছে চিঠি শেষ করছেন, শোনা গেল ঘরোয়া পাদুকার মাপা তালে শব্দ, কারেনিন এসে দাঁড়ালেন তাঁর কাছে—হাত-মুখ ধোয়া, চুল আঁচড়ানো, বগলে একটা বই।
‘শেষ কর তো, রাত হল’, বিশেষ ধরনের একটা হাসি হেসে এই কথা বলে তিনি শোবার ঘরে গেলেন।
‘কিন্তু ওঁর দিকে অমন করে চাইবার কি অধিকার আছে ওর?’ কারেনিনের দিকে ভ্রন্স্কির চাহনিটা মনে পড়ায় আন্না ভাবলেন।
আন্না পোশাক ছেড়ে ঢুকলেন শোবার ঘরে, কিন্তু মস্কো থাকার সময় যে সজীবতা তাঁর চোখে আর হাসিতে ছলকে উঠছিল তা আর ছিল না শুধু তাই নয়; বরং মনে হল আগুন তাঁর মধ্যে এখন নিবে গেছে অথবা দূরে কোথায় যেন লুকিয়ে পড়েছে।
চৌত্রিশ
ভ্রন্স্কি পিটার্সবুর্গ থেকে চলে যাবার সময় তাঁর মস্কায়া রাস্তার বড় ফ্ল্যাটখানা তাঁর বন্ধু ও প্রিয়পাত্র পেত্রিৎস্কির হেফাজতে রেখে গিয়েছিলেন।
একজন নবীন লেফটেন্যান্ট হলেন পেত্রিৎস্কি। কোন বংশমর্যাদা বিশেষ নেই, ধনী তো ননই। দেনায় আকণ্ঠ ডোবা। সন্ধ্যায় সব সময় মাতাল, প্রায়ই নানা হাস্যকর এবং নোংরা ঘটনাদির জন্য হাজতে যেতে হয়। তবে বন্ধু- বান্ধব আর ওপরওয়ালার প্রিয়পাত্র। রেল স্টেশন থেকে বারোটার সময় নিজের ফ্ল্যাটের কাছে এসে ভ্রন্স্কি দেখলেন গেটের কাছে তাঁর পরিচিত একটা ভাড়াটে গাড়ি। ঘণ্টি দিতে তিনি শুনলেন ভেতর থেকে পুরুষের হো-হো হাসি, মেয়েলী গলায় বকবকানি, আর পেত্রিৎস্কির চিৎকার, ‘বদমায়েশদের কেউ হলে ঢুকতে দিয়ো না!’ চাপরাশিকে তাঁর আসার কথা জানাতে না বলে ভ্রন্স্কি ঢুকলেন প্রথম ঘরখানায়। পেত্রিৎস্কির বান্ধবী ব্যারনেস শিলতন তাঁর বেগুনি রেশমি গাউন আর কোঁকড়া চুলের লালচে মুখখানা ঝলমলিয়ে তাঁর প্যারিসী বুলিতে ক্যানারি পাখির মত গোটা ঘরখানা মুখরিত করে গোল টেবিলের সামনে বসে কফি বানাচ্ছিলেন। ওভারকোট পরা পেত্রিৎস্কি আর পুরো উর্দি পরা ক্যাপ্টেন কামেরোভস্কি, নিশ্চয় সোজা ডিউটি-ফেরত, বসে আছেন ব্যারনেসকে ঘিরে।
‘ব্রেভো! ভ্রন্স্কি!’ সশব্দে চেয়ার ঠেলে লাফিয়ে উঠে চেঁচালেন পেত্রিৎস্কি, ‘খোদ গৃহকর্তা! ব্যারনেস, ওর জন্য নতুন কফিপট থেকে কফি। আশাই করিনি! আশা করি তোর কেবিনেটের নতুন শোভাটিতে তুই খুশি’, ব্যারনেসকে দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘তোমাদের পরিচয় আছে?’
‘থাকবে না মানে!’ ফুর্তিতে হেসে ব্যারনেসের ছোট্ট হাতখানায় চাপ দিয়ে ভ্রন্স্কি বললেন, ‘আমরা যে পুরনো বন্ধু!’
ব্যারনেস বললেন, ‘আপনি পথ পাড়ি দিয়ে বাড়ি এলেন, তাহলে আমি উঠি। যদি ব্যাঘাত হয় তবে এখনই আমি যাচ্ছি।’
‘আপনি যেখানে ব্যারনেস, সেখানেই আপনি বাড়ির লোকের মত’, ভ্রনস্কি বললেন। এরপর নিরুত্তাপভাবে কামেরোভস্কির সাথে করমর্দন করে শুভেচ্ছা বিনিময় করলেন।
ব্যারনেস পেত্রিৎস্কির উদ্দেশে বললেন, ‘আপনি কিন্তু কখনো অমন চমৎকার করে কথা বলতে পারেন না।
কে বললে? ডিনারের পর আমিও কথা বলব তেমন খারাপ নয়।’
‘ডিনারের পর হলে সেটা গুণপনা নয়! নিন, আমি আপনাকে কফি দিচ্ছি, হাত-মুখ ধুয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে নিন।’ এই বলে আবার বসে পড়ে সযত্নে কফিপটের স্ক্রু ঘোরাতে লাগলেন ব্যারনেস। পেত্রিৎস্কিকে বললেন, ‘পিয়ের, আরেকটু কফি দিন তো।’ পেত্রিৎস্কিকে তাঁর উপাধি অনুসরণে তিনি ডাকতেন পিয়ের বলে, ওঁর সাথে নিজের সম্পর্ক তিনি লুকাতেন না। ‘আরেকটু কফি মেশাই।’
‘নষ্ট করে ফেলবেন।‘
‘না, নষ্ট হবে না। কিন্তু আপনার বউ কোথায়?’ বন্ধুর সাথে ভ্রন্স্কির কথাবার্তায় বাধা দিয়ে হঠাৎ বলে উঠলেন ব্যারনেস, ‘আমরা তো এদিকে আপনার বিয়ে দিয়ে রেখেছি। বউকে এনেছেন?
‘না ব্যারনেস, আমি বেদে হয়েই জন্মেছি, বেদে হয়েই মরব।’
‘সে তো আরও ভালো। আপনার হাতখানা দিন।’
এবং ভ্রন্স্কিকে না ছেড়ে দিয়ে রগড়ের ফোড়ন মিশিয়ে তিনি বলতে লাগলেন তাঁর জীবনযাত্রার সর্বশেষ পরিকল্পনার কথা, ভ্রন্স্কির পরামর্শ চাইলেন।
বিবাহবিচ্ছেদে সে রাজি নয়! কিন্তু কি যে আমি করি?’ (সে মানে তাঁর স্বামী) ‘এখন আমি মামলা আনতে চাইছি। আপনি কি বলেন? কামেরোভস্কি, কফিটা দেখবেন—উথলে উঠল। আপনি দেখছেন যে আমি ব্যস্ত! আমি ভাবছি মামলা আনব, কেননা আমার সম্পত্তি আমি পেতে চাই। জানেন কি বোকার মত কথা, আমি নাকি বিশ্বাসঘাতিনী’, বললেন শ্লেষভরে, ‘আর সেই কারণে সে আমার সম্পত্তি ভোগ করতে চায়।
ভ্রন্স্কি সন্তোষের সাথে সুন্দরী নারীর এই আমুদে বকবকানি শুনে যাচ্ছিলেন, সায় দিচ্ছিলেন তাঁর কথায়, আধারহস্যে উপদেশও বিতরণ করছিলেন এবং মোটের ওপর এই ধরনের নারীর সাথে তিনি যেভাবে কথা বলেন, সেই অভ্যস্ত সুরটায় তখনই ফিরে গেলেন। তাঁর পিটার্সবুর্গী দুনিয়ায় সমস্ত লোক ছিল একেবারে দুই বিপরীত ভাগে বিভক্ত। একদল নিচু জাতের লোক, মামুলি, হাঁদা এবং সবচেয়ে বড় কথা, হাস্যকর; এরা বিশ্বাস করে যে একজন স্বামীকে সেই একজন স্ত্রীর সাথেই থাকতে হবে, যার সাথে তার বিয়ে হয়েছে। কুমারীকে হতে হবে অপাপবিদ্ধ, নারীকে ব্রীড়াময়ী, পুরুষকে পুরুষোচিত, সংযত, দৃঢ়, ছেলেমেয়েদের মানুষ করে তুলতে, রুজি রোজগার করতে, দেনা শুধুতে এবং এই ধরনের লোক। কিন্তু আরেক ধরনের লোক আছে, আসল লোক, তাঁরা যে দলে পড়েন। এদের সর্বোপরি হওয়া চাই সুমার্জিত, রূপবান, মহানুভব, সাহসী, ফুর্তিবাজ, লজ্জায় এতটুকু লাল না হয়ে যারা যত রকম ব্যসনে আসক্ত হয় আর বাকি সব কিছু ওড়ায় হেসে।
