খাওয়ার সময় তিনি মস্কোর ব্যাপার নিয়ে কথা বললেন স্ত্রীর সাথে। একটু ঠাট্টার হাসি ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করলেন অব্লোন্স্কির খবর; তবে কথাবার্তা হল প্রধানত সাধারণ প্রসঙ্গ, পিটার্সবুর্গের চাকরি-বাকরি আর সামাজিক ব্যাপার নিয়ে। খাবারের পর তিনি অতিথিদের সাথে কাটালেন আধ ঘণ্টা, তারপর হাসিমুখে বৌয়ের হাতে চাপ দিয়ে বেরিয়ে গেলেন পরিষদ সভায় যাবার জন্য। আন্না এবার প্রিন্সেস বেত্সি ভেস্কায়ার কাছেও গেলেন না, আন্না ফিরেছেন শুনে তিনি সন্ধ্যায় ডেকেছিলেন তাঁকে, গেলেন না থিয়েটারেও, আজ সেখানে তাঁর জন্য একটা বক্স রাখা হয়েছিল। গেলেন না প্রধানত এজন্য যে পরবেন বলে যা ভেবেছিলেন সে গাউনটা তখনো তৈরি হয়নি। অতিথিরা চলে যাবার পর নিজের বেশভূষা দেখতে গিয়ে খুবই বিরক্তি ধরেছিল আন্নার। খুব দামী সাজপোশাক না করায় আন্না পারদর্শিনী। মস্কো যাবার আগে তিনি তিনটে গাউন দর্জি মেয়েকে দিয়েছিলেন ঢেলে সাজাবার জন্য। এমনভাবে তাদের খোল-নলচে পালটাবার কথা যাতে পুরানো বলে চেনা না যায়, আর তা তৈরি হয়ে যাওয়া উচিত ছিল তিন দিন আগেই। দেখা গেল দুটো গাউন একেবারেই তৈরি হয়নি, আর যেটা তৈরি হয়েছে সেটাও আন্না যা চেয়েছিলেন তেমনভাবে নয়। দর্জি মেয়ে এসেছিল কৈফিয়ত দিতে, বোঝালে যে এটাই বেশি ভালো হবে, আন্না এমন ক্ষেপে উঠলেন যে পরে সে কথা মনে করতেও লজ্জা হচ্ছিল তাঁর। একেবারে শান্ত হবার জন্য তিনি গেলেন শিশুকক্ষে, সারা সন্ধে কাটালেন ছেলের সাথে, নিজেই তাকে শোয়ালেন, ক্রুশ করে ঢেকে দিলেন লেপ দিয়ে। কোথাও যাননি বলে আনন্দ হল তাঁর, সন্ধ্যাটা তাঁর কাটল চমৎকার। নিজের ভারি হালকা আর নিশ্চিন্ত মনে হচ্ছিল তাঁর, পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলেন যে রেলগাড়িতে তাঁর কাছে যা খুবই তাৎপর্যময় মনে হয়েছিল তা কেবল সমাজ-জীবনের এটা মামুলি অকিঞ্চিৎকর ঘটনা মাত্র, কারো কাছে, নিজের কাছেও লজ্জায় মাথা হেঁট করার মত কিছু নেই। একটা ইংরেজি উপন্যাস নিয়ে ফায়ারপ্লেসের কাছে বসে তিনি স্বামীর অপেক্ষা করতে লাগলেন। ঠিক সাড়ে নটায় তাঁর ঘণ্টি শোনা গেল। ঘরে ঢুকলেন তিনি।
আন্না তাঁর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘অবশেষে এলে যা হোক।
হাতে চুমু দিয়ে উনি বসলেন তাঁর কাছে। বললেন, ‘দেখতে পাচ্ছি তোমার যাত্রাটা বেশ ভালোই উৎরেছে।’
‘খুবই ভালো’, জবাব দিয়ে আন্না সব কিছু বলতে লাগলেন গোড়া থেকে : মিসেস এস্কায়ার সাথে তাঁর যাওয়া, পৌঁছানো, রেললাইনে দুর্ঘটনা। পরে বললেন প্রথমে ভাইয়ের জন্য, পরে ডল্লির জন্য তাঁর যে কষ্ট হয়েছিল সে কথা।
‘তোমার ভাই হলেও অমন লোককে ক্ষমা করা চলে বলে আমি মনে করি না’, কড়া করে বললেন কারেনিন।
আন্না হাসলেন। তিনি বুঝেছিলেন যে কথাটা তিনি বললেন এটা দেখাবার জন্য যে আত্মীয়তার কথা ভেবে নিজের অকপট অভিমত জানানো থেকে তিনি বিরত থাকতে পারেন না। স্বামীর চরিত্রের এই দিকটা আন্না জানতেন এবং সেটা তাঁর ভালো লাগতো।
উনি বলে চললেন, ‘যাক, সব ভালোয় ভালোয় ঢুকল। তুমিও এসে গেলে। এতে আমি খুশি। তা পরিষদে আমি যে ব্যবস্থাটা পাশ করিয়ে নিয়েছি, সে সম্পর্কে ওখানে কি বলছে লোকে
ওই ব্যবস্থাটার কথা আন্না কিছুই শোনেননি। ওঁর কাছে যা অত গুরুত্বপূর্ণ সেটা তিনি অমন অনায়াসে ভুলে যেতে পেরেছিলেন ভেবে তাঁর লজ্জা হল।
‘এখানে কিন্তু ওটা প্রচুর সোরগোল তুলেছে’, স্বামী বললেন আত্মতৃপ্ত হাসিমুখে।
আন্না বুঝতে পারছিলেন যে কারেনিন এই ব্যাপার নিয়ে তাঁর নিজের কাছে প্রীতিকর কিছু একটা জানাতে চান, আন্নাও প্রশ্ন করে করে তাঁকে সেই প্রসঙ্গে টেনে আনলেন। উনিও সেই একই আত্মতৃপ্ত হাসি নিয়ে বললেন ব্যবস্থাটা পাশ হবার পরে কি জয়ধ্বনি লাভ করেছিলেন তিনি।
‘অত্যন্ত, অত্যন্ত আনন্দ হয়েছিল আমার। এতে প্রমাণ হয় যে ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের একটা বুদ্ধিমন্ত দৃঢ় দৃষ্টিভঙ্গি দানা বাঁধছে।’
ক্রিম আর রুটি সহযোগে দ্বিতীয় কাপ চা শেষ করে তিনি কেবিনেটে গেলেন। বললেন : ‘কিন্তু, তুমি কোথাও গেলে না যে; নিশ্চয় একম্বেয়ে লেগেছে।’
‘না, না!’ উঠে দাঁড়িয়ে হল দিয়ে ওঁকে কেবিনেটে এগিয়ে দিতে দিতে আন্না জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি এখন কি পড়ছ?
‘এখন পড়ছি ডিউক দ্য লিল, নরকের কবিতা, চমৎকার বই।‘
আন্না হাসলেন যেভাবে লোকে হাসে প্রিয়জনের দুর্বলতায়। বাহুলগ্ন করে তিনি ওঁকে পৌঁছে দিলেন কেবিনেটের দরজা পর্যন্ত। আন্না জানতেন ওঁর অভ্যাস সন্ধ্যায় পড়া, যা একটা আবশ্যিকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জানতেন যে চাকরির কাজে তাঁর প্রায় সমস্তটা সময় খেয়ে গেলেও মনীষার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সমস্ত ঘটনা অনুসরণ করা তাঁর কর্তব্য বলে তিনি গণ্য করতেন। আন্না এও জানতেন যে তাঁর সত্যকার আকর্ষণ ছিল রাজনৈতিক, দার্শনিক, ধর্মতাত্ত্বিক বইয়ে, কান্তিকলা একেবারেই তাঁর প্রকৃতিবিরুদ্ধ, কিন্তু তা সত্ত্বেও, কিংবা বলা ভালো সেই কারণেই এক্ষেত্রে যা কোলাহল তুলেছে তার কিছুই কারেনিন বাদ দিতেন না, সব কিছু পড়া তাঁর কর্তব্য বলে তিনি ভাবতেন। আন্না জানতেন যে রাজনীতি, দর্শন, ধর্মতত্ত্বের ক্ষেত্রে তাঁর মনে প্রশ্ন উঠত অথবা কিছু-একটার সন্ধান করতেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও, কিংবা বলা ভালো সেই কারণেই এক্ষেত্রে যা কোলাহল তুলেছে তর কিছুই ‘কারেনিন বাদ দিতেন না, সব কিছু পড়া তাঁর কর্তব্য বলে তিনি ভাবতেন। আন্না জানতেন যে রাজনীতি, দর্শন, ধর্মতত্ত্বের ক্ষেত্রে তাঁর মনে প্রশ্ন উঠত অথবা কিছু- একটার সন্ধান করতেন, কিন্তু শিল্প বা কবিতা, বিশেষ করে সঙ্গীতের বোধ কারেনিনের কিছুই ছিল না, এগুলো সম্পর্কে খুবই সুনির্দিষ্ট ও দৃঢ় মতামত পোষণ করতেন তিনি। শেপীয়র, রাফায়েল, বেঠোফেনকে নিয়ে, কবিতা ও সঙ্গীতের নতুন ধারা নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসতেন তিনি এবং খুব সুস্পষ্ট সঙ্গতিতে এগুলো তিনি ভাগ করে রাখতেন।
