আন্না কফি খাওয়া শেষ করে উঠতে না উঠতেই কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনার আগমনবার্তা এল। কাউন্টেস দীর্ঘ স্থূলাঙ্গী মহিলা, মুখের রঙ কেমন অসুস্থ, হলদেটে, চিন্তামগ্ন অপূর্ব কালো চোখ। আন্না তাঁকে ভালোবাসতেন, এখন তাঁকে যেন এই প্রথম দেখলেন তাঁর সমস্ত খুঁত সমেত।
‘তা কি ভাই, অলিভ শাখা দিলে?’ ঘরে ঢুকেই কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা জিজ্ঞেস করলেন।
‘হ্যাঁ, সব চুকে গেছে, তবে আমরা যা ভেবেছিলাম তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়’, আন্না ফরাসি ভাষায় জবাব দিলেন, ‘আমার ভাবী বড় বেশি গোঁয়ার টাইপের।
কিন্তু যার সাথে তাঁর সংস্পর্শ নেই এমন সব কিছুতে আগ্রহী হলেও যাতে তাঁর আগ্রহ তা না শোনার একটা অভ্যাস ছিল কাউন্টেসের। আন্নাকে বাধা দিয়ে তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ দুনিয়ায় দুঃখ-কষ্ট অনেক, আজ আমি একেবারে জেরবার হয়ে গেছি।
‘কেন, কি হল?’ হাসি চাপার চেষ্টা করে জিজ্ঞেস করলেন আন্না।
‘সত্যের জন্য খামোকা লড়তে গিয়ে আমি হাঁপিয়ে উঠি, একেবারেই জেরবার হয়ে পড়ি মাঝে মাঝে ‘ভগিনীগণের’ ব্যাপারটা (এটা হল লোকহিতৈষী ধর্মীয়-দেশপ্রেমিক একটা প্রতিষ্ঠান) বেশ চমৎকার শুরু হয়েছিল, কিন্তু এই ভদ্রলোকদের দিয়ে কিছুই করা সম্ভব নয়’, ভাগ্যের কাছে ব্যঙ্গাত্মক আত্মসমর্পণের সুরে কাউন্টেস যোগ দিলেন, ‘ভাবনাটা ওঁরা লুফে নিলেন, তাকে বিকৃত করলেন, এখন তুচ্ছ অকিঞ্চিৎকর সব যুক্তি দিচ্ছেন। দু’তিনজন লোক, আপনার স্বামী তাঁদের একজন—ব্যাপারটার গুরুত্ব বোঝেন, অন্যেরা জানেন কেবল পণ্ড করতেই। কাল প্রাভদিনের চিঠি পেয়েছি।’
প্রাভদিন হলেন বিদেশের একজন নামকরা নিখিল-স্লাভপন্থী, কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা বলতে লাগলেন চিঠিতে কি আছে।
তারপর গির্জাগুলোকে সম্মিলিত করার বিরুদ্ধে কি সব বিচ্ছিরি ব্যাপার আর ঘোঁট চলছে তার কথা বললেন এবং তাড়াহুড়া করে চলে গেলেন, কেননা সেই দিনই তাঁকে একটা সমিতির অধিবেশনে যোগ দিতে এবং স্লাভ কমিটিতে যেতে হবে।
আন্না মনে মনে ভাবলেন, ‘এ সবই তো আগেও হয়েছে অথচ তখন লক্ষ্য করিনি কেন? নাকি আজ বড় চটে আছেন? আসলে কিন্তু হাস্যকর : ওঁর লক্ষ্য লোকহিত, খ্রিস্টান উনি, অথচ সব সময় উনি রেগে আছেন, সবাই ওঁর শত্রু, আর শত্রু কিনা খ্রিস্টধর্ম আর পরহিতের ব্যাপারেই।’
কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনার পর এলেন আন্নার বান্ধবী, ডিরেক্টরের স্ত্রী, শহরের সমস্ত খবর দিলেন। তিনটের সময় তিনিও চলে গেলেন, কথা দিলেন ডিনারের সময় আসবেন। কারেনিন ছিলেন মন্ত্রী দপ্তরে। একা থেকে আন্না ডিনার পর্যন্ত সময়টুকু কাটালেন ছেলের খাওয়ার সময় উপস্থিত থাকার জন্য (ছেলে সব সময়ই খায় একা), তা ছাড়া নিজের জিনিসপত্র গোছানো, যেসব চিঠিপত্র টেবিলে জমেছে তা পড়ে জবাব দিতেও সময় গেল।
ট্রেনে আসার সময় যে অকারণ লজ্জাবোধ আর অস্থিরতা তাঁকে পেয়ে বসেছিল তা একেবারে অন্তর্ধান করল। জীবনের অভ্যস্ত পরিস্থিতিতে আবার নিজেকে সুদৃঢ় ও ভর্ৎসনাতীত বলে মনে হল তাঁর।
তাঁর গতকালের ঘটনাগুলো মনে করে অবাক লাগল। ‘হয়েছিলটা কি! কিছুই না। বোকার মত কথা বলেছিল ব্রঙ্কি, সহজেই তা চুকিয়ে দেওয়া যায়, আমিও যা উচিতও নয়। বলা মানে যার গুরুত্ব নেই তাতে গুরুত্ব দেওয়া।’ তাঁর মনে পড়ল যে একবার পিটার্সবুর্গে তাঁর স্বামীর অধীনস্থ একটা যুবক যে তাঁর কাছে প্রেমের স্বীকৃতি জানিয়েছিল, সে কথা তিনি স্বামীকে বলেছিলেন। কারেনিন জবাব দিয়েছিলেন যে সমাজে থাকলে যে কোন নারীর ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটতে পারে, তবে আন্নার মাত্রাজ্ঞানে তাঁর পূর্ণ বিশ্বাস আছে, ঈর্ষিত হয়ে আন্নাকে এবং নিজেকে হীন হতে তিনি কখনো দেবেন না। ‘তার মানে বলার কারণ নেই কোন? সত্যি, যাক সৃষ্টিকর্তা, কিই-বা বলার আছেই’, আন্না মনে মনে ভাবলেন।
তেত্রিশ
আলেক্সেই আলেক্সান্দ্রভিচ কারেনিন মন্ত্রী দপ্তর থেকে চারটার সময় ফিরলেন, কিন্তু প্রায়ই যা ঘটে থাকে, আন্নার কাছে যাবার সময় পেলেন না। তিনি তাঁর কেবিনেটে ঢুকলেন অপেক্ষমাণ উমেদারদের সাথে কথা বলতে এবং কার্যাধ্যক্ষের পাঠানো কতকগুলো কাগজ সই করতে। ডিনারের জন্য এসেছিলেন (কারেনিনদের বাড়িতে সব সময়ই ডিনারে হাজির থাকে জনা তিনেক করে লোক) : কারেনিনের বৃদ্ধা চাচাতো বোন, ডিপার্টমেন্টের ডিরেক্টর সস্ত্রীক এবং একটা যুবক, চাকরির জন্য তাকে সুপারিশ করা হয়েছে কারেনিনের কাছে। আন্না ড্রয়িং-রুমে এলেন এঁদের নিয়ে ব্যস্ত থাকতে। ঠিক পাঁচটায় প্রথম পিটারের ব্রোঞ্জ ঘড়িতে পঞ্চম ঘণ্টা বাজতে না বাজতেই কারেনিন সাদা টাই বেঁধে দুটো তারা লাগানো ফ্রক-কোটে ভেতরে ঢুকলেন, কেননা খাওয়ার পরেই তাঁকে বেরোতে হবে। কারেনিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই কর্মব্যস্ত, সব গোনাগাঁথা। আর প্রতি দিন তাঁর যা করার কথা সেটা করে উঠতে পারার জন্য তিনি কড়া নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলতেন। তাঁর মূলমন্ত্র ছিল, ‘তাড়াহুড়াও নয়, বিশ্রামও নয়।’ হলে ঢুকে সবার উদ্দেশে মাথা নোয়ালেন তিনি, বৌয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে তাড়াতাড়ি খেতে বসলেন।
‘হ্যাঁ, আমার একাকিত্ব শেষ হল। তুমি ভাবতে পারবে না, একা-একা খাওয়া কি অস্বস্তিকর’ (‘অস্বস্তিকর’ কথাটায় জোর দিলেন তিনি)।
