একসাথে আন্না এবং স্বামীর উদ্দেশ্য মাথা নুইয়ে এবং অভিনন্দনটা স্বামীরই উদ্দেশে, সেটা গ্রহণ করা বা না করা তাঁর খুশি, এটা তাঁকে বুঝতে দিয়ে ভ্রন্স্কি বললেন, ‘রাতটা ভালো কেটেছে তো?’
‘ধন্যবাদ, চমৎকার কেটেছে’, আন্না বললেন।
মুখখানা তাঁর মনে হল ক্লান্ত, কখনো হাসিতে, কখনো চোখে প্রাণোচ্ছ্বাসের যে খেলা দেখা যেত সেটা নেই। কিন্তু ভ্রন্স্কির প্রতি দৃষ্টিপাতে এক মুহূর্তের জন্য কি যেন ঝলক দিল তাঁর চোখে আর তখনই শিখাটা নিবে গেলেও ভ্রন্স্কি এই মুহূর্তটুকুর জন্যই খুশি হয়ে উঠলেন। ভ্রন্স্কিকে স্বামী চেনে কিনা জানবার জন্য আন্না তাকালেন তাঁর দিকে। কারেনিন ভ্রন্স্কির দিকে তাকালেন অসন্তোষের সাথে, ভুলো মনে ভাবতে চেষ্টা করলেন কে এটি। যোগ্যের সাথে যোগ্যের মত এক্ষেত্রে ঠোকাঠুকি হল ভ্রন্স্কির অচঞ্চলতা ও আত্মবিশ্বাস এবং কারেনিনের নিরুত্তাপ আত্মবিশ্বাসের মধ্যে।
আন্না বললেন, ‘ইনি কাউন্ট ভ্ৰন্স্কি।’
‘ও! মনে হচ্ছে আমরা পরিচিত’, হাতে বাড়িয়ে দিয়ে উদাসীনভাবে বললেন কারেনিন। ‘গেলে মাকে সাথে করে, ফিরলে ছেলেকে নিয়ে’, বললেন তিনি সুস্পষ্ট উচ্চারণে, যেন প্রতিটি শব্দে এক-একটা রুল দান করছেন। ‘আপনি বোধহয় ছুটিতে?’ কিন্তু উত্তরের অপেক্ষা না করে তাঁর রহস্যের সুরে স্ত্রীর দিকে ফিরে বললেন, ‘তা বিচ্ছেদের সময় কত চোখের পানি পড়েছিল মস্কোয়?’
স্ত্রীর দিকে ফিরে এই কথা বলে তিনি ভ্রন্স্কিকে বুঝতে দিলেন যে তাঁরা একা থাকতে চান, এবং ভ্রন্স্কির দিকে ফিরে টুপিতে হাতও ঠেকালেন। ভ্রন্স্কি কিন্তু আন্না আর্কাদিয়েভনাকে উদ্দেশ করে বললেন : ‘আশা করি আপনাদের ওখানে যাবার সম্মান পাব?’
ক্লান্ত চোখে কারেনিন তাকালেন ভ্রন্স্কির দিকে। বললেন : ‘খুব খুশি হব। প্রতি সোমবার আমাদের বাড়ির দরজা খোলা।’ তারপর তাঁকে একেবারে উপেক্ষা করে স্ত্রীকে জানালেন, ‘কি ভালোই না হল, তোমাকে নিতে আসার, তোমার প্রতি আমার অনুরাগ দেখাবার জন্য আধ ঘণ্টা সময় পেয়ে গেছি’, বলে চললেন সেই একই রহস্যের সুরে।
‘তোমার অনুরাগের কথা তুমি এতই তুলে ধরো যে তার কদর করা আমার পক্ষে মুশকিল’, পেছন পেছন আসা ভ্রন্স্কির পদশব্দে অজান্তেই কান পেতে আন্না বললেন সেই একই রহস্যের সুরে। তারপর ভাবলেন, ‘ওতে আমার কি এসে যায়?’ এবং বলতে লাগলেন ওঁর না থাকায় সেরিওজা সময় কাটিয়েছে কেমন।
‘ওহ্ চমৎকার! মারিয়েট বলছে ভারি লক্ষ্মীর মত ছিল, আর তোমাকে একটু নিরাশ করতে হচ্ছে… তোমার স্বামীর মত ওর তেমন মন কেমন করেনি তোমার জন্য। তবে এ দিনটা যে আমাকে দিলে তার জন্য আরো একবার mersI গো। আমাদের আদরণীয়া সামোভার একেবারে আনন্দে নেচে উঠবেন।’ (খ্যাতনামী কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনাকে তিনি সামোভার বলতেন, কেননা সব সময় এবং সব কিছু নিয়েই তিনি উদ্বিগ্ন ও উত্তেজিত হয়ে উঠতেন)। ‘তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিলেন তিনি; সাহস করে একটা উপদেশ দিই, আজই ওঁর কাছে গেলে পারো। সব কিছুর জন্যই তো ওঁর মন টাটায়। এখন তাঁর অন্য সমস্ত দুর্ভাবনা ছাড়াও অলোনস্কিদের পুনর্মিলন নিয়ে তিনি ভাবিত।’
কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা আন্নার স্বামী কারেনিনের বন্ধু এবং পিটার্সবুর্গ সমাজের একটা চক্রের কেন্দ্র, স্বামী মারফত আন্না তাঁর সাথে বিশেষ ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
‘আমি তো ওঁকে চিঠি দিয়েছি।’
‘কিন্তু সমস্ত খুঁটিনাটি যে ওঁর জানা দরকার। ক্লান্ত না হয়ে থাকলে যাও-না গো। তোমাকে গাড়ি করে নিয়ে যাবে কন্দ্রাতি, আমি চললাম কমিটিতে। আবার আর একা-একা খাওয়া সারতে হবে না’, আলেকসেই আলেক্সান্দ্রিভিচ বলে চললেন, কিন্তু তাতে রহস্যের সুর আর ছিল না, ‘কি যে অভ্যেস হয়ে গেছে বিশ্বাস করবে না…’
অনেক সময় ধরে হাতে চাপ দিয়ে তিনি বিশেষ রকমের একটু হাসি হেসে গাড়িতে তুলে দিলেন আন্নাকে।
বত্রিশ
তাঁর ছেলের সাথেই বাড়িতে ফেরার পর প্রথম দেখা হল। গৃহশিক্ষিকার চেঁচামেচি সত্ত্বেও সে সোল্লাসে ‘মা, মা! বলে চিৎকার করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে ধেয়ে নেমে তাঁর গলা জড়িয়ে ধরল।
গৃহশিক্ষিকার উদ্দেশে চ্যাচাল, ‘আমি যে আপনাকে বললাম যে মা! আমি আগেই জানতাম!’
আর স্বামীর মত ছেলেকে দেখেও আন্নার যে অনুভূতি হল সেটা মোহভঙ্গের মত। আসলে সে যা, তার চেয়ে ছেলেকে ভালো বলে কল্পনা করেছিলেন তিনি। ছেলেটি যা, সেইভাবেই তাকে নিয়ে তৃপ্তি পেতে হলে তাঁকে বাস্তবতায় নেমে আসতে হয়। কিন্তু ছেলেটি যা, তাতে, তার হালকা রঙের কোঁকড়া চুল, নীল চোখ আর আঁটো মোজায় পুরুষ্টু সুঠাম পায়ে তাকে সত্যিই মিষ্টি লাগছিল। তার নৈকট্য ও আদর অনুভব করে আন্না প্রায় দৈহিক একটা পরিতৃপ্তিই বোধ করছিলেন। তার সরল, বিশ্বাসভরা স্নেহময় দৃষ্টি দেখে, তার সহজ সব প্রশ্ন শুনে একটা নৈতিক প্রশান্তি লাভ করলেন তিনি। ডল্লির ছেলেমেয়েরা যে সব উপহার পাঠিয়েছিল সেগুলো তিনি বার করলেন, ছেলেকে বললেন মস্কোয় তানিয়া নামে কেমন একটা মেয়ে আছে, সে পড়তে পারে, এমন কি অন্যদেরও শেখায়।
‘আমি কি তাহলে খারাপ ওর চেয়ে?’ সেরিওজা বলল।
‘আমার চোখে তুই দুনিয়ায় সবার সেরা।
‘আমি তা জানি’, হেসে সেরিওজা বললে।
