‘দেখছ তো, তোমার মমতাময় স্বামী, বিয়ের দ্বিতীয় বছরের মত মমতাময়, তোমাকে দেখার জন্য কিরকম অধীর হয়ে উঠেছিল’, উনি বললেন তাঁর ধীরে মিহি গলায়, এবং সেই সুরে স্ত্রীর সাথে ব্যবহারে যা তিনি সব সময়ই গ্রহণ করতেন—সত্যিই যারা এভাবে কথা বলে থাকে তাদের প্রতি একটা উপহাসের সুর।
আন্না জিজ্ঞেস করলেন, ‘সেরিওজা ভালো আছে তো?’
উনি বললেন, ‘আমার সমস্ত হৃদয়াবেগের এটুকু মাত্র পুরস্কার? হ্যাঁ-হ্যাঁ, ভালো আছে, খুব ভালো আছে…’
একত্রিশ
ভ্রন্স্কি সে রাতে ঘুমাবার কোন চেষ্টাই করলেন না। নিজের চেয়ারে বসে তিনি কখনো তাকিয়ে থাকছিলেন সোজা সামনের দিকে, কখনো তাকিয়ে দেখছিলেন কারা আসছে, যাচ্ছে। তাঁর অপরিচিতদের তিনি আগে যেখানে বিস্মিত ও বিচলিত করতেন তাঁর অটুট অচঞ্চলতায়, এখন সেখানে তাঁকে মনে হল আরো বেশি অহংকারী আর আত্মতৃপ্ত। লোকেদের তিনি দেখছিলেন এমনভাবে যেন তারা এক-একটা জিনিস। তাঁর সামনে উপবিষ্ট একজন স্নায়বিক যুবক, স্থানীয় আদালতের কর্মচারী, তাঁর এই চেহারার জন্য দেখতে পারছিল না তাকে। যুবকটি সিগারেট ধরাবার জন্য আগুন চাইল তাঁর কাছে, কথা চালাবার চেষ্টা করল, এমন কি তাঁকে টের পাওয়াতে চাইল যে জিনিস নয় সে, মানুষ, কিন্তু ভ্রন্স্কি তা সত্ত্বেও তার দিকে তাকিয়ে রইলেন যে একটা লণ্ঠন দেখছেন এবং যুবকটি তার মানবসত্তার এই অস্বীকৃতির চাপে নিজের আত্মসংযম হারাচ্ছে অনুভব করে মুখবিকৃতি করল।
প্রস্কি কিছুই দেখছিলেন না, কাউকেও দেখছিলেন না। নিজেকে তাঁর লাগছিল যেন রাজার মত, সেটা এ জন্য নয় যে আন্নার ওপর ছাপ ফেলেছেন বলে তাঁর বিশ্বাস হয়েছিল, না, সে বিশ্বাস তাঁর তখনো ছিল না, কিন্তু আন্না তাঁর ওপর যে ছাপ ফেলেছেন তাতে সুখ, গর্ববোধ হচ্ছিল তাঁর।
এসবের পরিণাম কি দাঁড়াবে সেটা তিনি জানতেন না, সে নিয়ে ভাবানও করছিলেন না তিনি। টের পাচ্ছিলেন যে এ যাবত স্খলিত বিক্ষিপ্ত তাঁর সমস্ত শক্তি একটা জায়গায় এসে মিলেছে এবং সাঙ্ঘাতিক উদ্যোগে ধাবিত হয়েছে একটা পরমানন্দময় লক্ষ্যের দিকে। এতেই তিনি সুখী। তিনি জানতেন যে তিনি সত্যি কথাটাই বলেছেন যে আন্না যেখানে, সেখানেই তিনি যাচ্ছেন, তাঁকে দেখতে পাওয়া, তাঁর কথা শোনার মধ্যেই তিনি এখন খুঁজে পাচ্ছেন জীবনের সমস্ত সুখ, তার একমাত্র অর্থ। সেলজার পানি খাবার জন্য বলোগোভো স্টেশনে নেমে যখন তিনি আন্নাকে দেখতে পেলেন, তখন তিনি মনে মনে যা ভাবছিলেন সেই কথাটাই নিজে অজ্ঞাতসারে প্রথম বললেন তাঁকে। সেটা যে তাঁকে বলেছেন, আন্না যে এখন তা জানলেন, তা নিয়ে ভাববেন, এতে আনন্দ হচ্ছিল তাঁর। সারা রাত তিনি ঘুমোলেন না। ওয়াগনে ফিরে এসে কি কি অবস্থায় তিনি আন্নাকে দেখেছেন, কি তিনি বলেছেন তা নিয়ে অবিরাম নাড়াচাড়া করতে লাগলেন মনে মনে, তাঁর বুক আড়ষ্ট করে কল্পনায় ভেসে উঠতে লাগল সম্ভাব্য ভবিষ্যতের যত ছবি।
পিটার্সবুর্গে যখন গাড়ি থেকে নামলেন, বিনিদ্র রাতের পর নিজেকে মনে হচ্ছিল চাঙ্গা, তরতাজা যেন ঠাণ্ডা পানিতে গোসল সেরে এলেন। আন্না বেরিয়ে আসার প্রতীক্ষায় নিজের ওয়াগনের সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি। মনে মনে তিনি বলছিলেন, আপনা থেকে মুখ ফুটে উিেছল হাসি, ‘আরো একবার তাকে দেখব, দেখব তার গতিভঙ্গিমা, তার মুখ, কিছু একটা বলবে, মাথা ফেরাবে, তাকাবে, হাসবে হয়ত-বা।’ কিন্তু আন্নাকে দেখবার আগেই তিনি দেখতে পেলেন তাঁর স্বামীকে, ভিড়ের মধ্যে স্টেশন মাস্টার সসম্মানে তাঁর পথ করে দিচ্ছিল। ‘ও হ্যাঁ, স্বামী!’ শুধু এখনই ভ্রন্স্কি পরিষ্কার বুঝলেন যে আন্নার সাথে বাঁধা রয়েছে তাঁর স্বামী। তিনি জানতেন যে আন্নার স্বামী আছেন, কিন্তু তাঁর অস্তিত্বে বিশ্বাস ছিল না, সে অস্তিত্বে তাঁর পূর্ণ প্রত্যয় জন্মাল শুধু যখন দেখলেন তাঁর মাথা, কাঁধ, কালো পেন্টালুন পরা পা : বিশেষ করে যখন দেখলেন সে স্বামী মালিকানার ভাব নিয়ে বাহুলগ্না করছেন তাঁকে।
কারেনিনের তাজা পিটার্সবুর্গী মুখ, সামান্য নুয়ে পড়া পিঠ, গোল টুপি পরা কঠোর আত্মবিশ্বাসী মূর্তি যখন তিনি দেখলেন, একটা অপ্রীতিকর অনুভূতি হল তাঁর, যেমন হয় তৃষ্ণার্ত মানুষ উৎসের কাছে পৌঁছে যখন দেখে যে কুকুর, ভেড়া বা শুয়োর সেখানে পানি খেয়ে তা ঘোলা করে রেখেছে। গোটা কোমর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ভোঁতা ভোঁতা পায়ে কারেনিনের চলন ভঙ্গিটাই বিশেষ অপমানকর ঠেকল ভ্রন্স্কির কাছে। আন্নাকে ভালোবাসার সন্দেহাতীত অধিকার একমাত্র তাঁরই আছে বলে ভ্রন্স্কির ধারণা ছিল। কিন্তু আন্না ঠিক সেই একইরকম; তাঁর দর্শন তাঁকে প্রভাবিত করল, দৈহিকভাবে তাঁকে সেই একই রকম চাঙ্গা আর আন্দোলিত করে তুলে, বুক আনন্দে ভরে দিয়ে। দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে যেতে বলে এগিয়ে গেলেন আন্নার দিকে। স্ত্রীর সাথে স্বামীর প্রথম সাক্ষাৎটা তিনি দেখলেন, স্বামীর সাথে আন্নার কথায় সামান্য সংকোচের লক্ষণ তাঁর চোখে পড়ল প্রেমিকের অন্তর্দৃষ্টিতে। নিজেই তিনি স্থির করে নিলেন, ‘না, ওকে সে ভালোবাসে না, ভালোবাসতে পারে না।’
যখন তিনি পেছন থেকে আন্না আর্কাদিয়েভনার দিকে আসছিলেন তখন এটা লক্ষ্য করে তাঁর আনন্দ হয়েছিল যে আন্না তাঁর কাছিয়ে আসা টের পাচ্ছেন। তাঁর দিকে তাঁকিয়ে তাঁকে চিনতে পেরে আন্না আবার স্বামীর দিকে ফিরলেন।
