‘২৮ নম্বর—এখানে এসো!’ চেঁচাচ্ছিল আরো নানারকম গলা, ছুটে যাচ্ছিল তুষারাচ্ছন্ন কর্মচারীরা। জ্বলন্ত সিগারেট মুখে তাঁর পাশ দিয়ে চলে গেলেন দুজন ভদ্রলোক। বেশ ভালো করে হাওয়া খাওয়ার জন্য আরেকবার নিঃশ্বাস নিলেন তিনি, তারপর রড ধরে ওয়াগনে ওঠার জন্য মাফ থেকে হাত বের করেছেন এমন সময় ফৌজী গ্রেটকোট পরা একজন লোক একেবারে তাঁর কাছে এসে বাতির দোলায়মান আলোটা আড়াল করে দিল তাঁর কাছ থেকে। আন্না তাকিয়ে তখনই চিনতে পারলেন ভ্রন্স্কির মুখ। টুপিতে হাত ঠেকিয়ে মাথা নত করে ভ্রন্স্কি জিজ্ঞেস করলেন তাঁর কিছু দরকার আছে কিনা, তাঁর কোন কাজে লাগতে তিনি পারেন কি? কোন জবাব না দিয়ে আন্না অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন তাঁর দিকে আর ভ্রন্স্কি ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও আন্না দেখতে পেলেন, অথবা তাঁর মনে হল যে দেখতে পাচ্ছেন ভ্রন্স্কির মুখ-চোখের ভাব। সেটা আবার সেই সশ্রদ্ধ পুলক যা আগের দিন সন্ধ্যায় তাঁকে অত অভিভূত করেছিল। এ দু’দিন তিনি একাধিকবার নিজেকে বলেছেন যে সব সময় একই রকম শত শত যে নবযুবক সর্বত্র দেখা যায়, ভ্রন্স্কি তাঁর কাছে মাত্র তাদেরই একজন, ওঁকে নিয়ে ভাববেন এ তিনি হতে দিতে পারেন না। কিন্তু এখন তাঁর সাথে সাক্ষাতের প্রথম মুহূর্তেই তিনি আচ্ছন্ন হলেন একটা সানন্দ গর্ববোধে। এখানে তিনি কেন, এ কথা জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন ছিল না তাঁর। ওটা তিনি এত অভ্রান্তরূপে জানেন যেন ভ্রন্স্কি বলেছেন যে আন্না যেখানে সেখানটিতেই থাকার জন্য উনি এখানে।
‘আমি জানতাম না যে, আপনি যাচ্ছেন। কেন যাচ্ছেন?’ যে হাতটা রড ধরতে যাচ্ছিল তা নামিয়ে এনে জিজ্ঞেস করলেন আন্না। তাঁর মুখটা দুর্নিবার একটা আনন্দ আর সজীবতায় জ্বলজ্বল করে উঠল।
‘কেন যাচ্ছি?’ সরাসরি আন্নার চোখের দিকে তাকিয়ে ভ্রন্স্কি বললেন, ‘আপনি জানেন, যেখানে আপনি সেখানে থাকার জন্যে আমি চলেছি। এ ছাড়া আমি পারি না।’
ঠিক এ সময়েই যেন একটা বাধা জয় করে ওয়াগনের ছাদ থেকে তুষারকণা ঝরিয়ে দিল হাওয়া। খড়খড়িয়ে উঠল একটা খসে পড়া লোহার পাতে। সামনের দিকে খাদে কান্নার মত বিমর্ষ হুইসিল দিল ইঞ্জিন। তুষারঝঞ্ঝার সমস্ত ত্রাস এখন আন্নার কাছে মনে হল আরো অপরূপ। ভ্রন্স্কি সে কথাই বলেছেন—যা চাইছিল তাঁর মন। কিন্তু ভয় পাচ্ছিলেন তাঁর বিচারবোধে। কোন জবাব দিলেন না আন্না, তাঁর মুখে ভ্রন্স্কি দেখতে পেলেন সংগ্রামের ছাপ।
‘যা বললাম সেটা আপনার ভালো না লেগে থাকলে মাপ করবেন’, ভ্রন্স্কি বললেন বিনীতভাবে।
কথাটা উনি বললেন সৌজন্য সহকারে, সম্মান করে, কিন্তু এত দৃঢ় আর একাগ্র স্বরে যে আন্না অনেকক্ষণ কোন জবাব দিতে পারলেন না।
শেষ পর্যন্ত বললেন, ‘ও কথা বলা আপনার উচিত নয়, আর আপনি যদি ভালো লোক হন, তাহলে যা বলেছেন সেটা ভুলে যান, আমিও তা ভুলে যাব।
‘আপনার একটা কথা, একটা ভঙ্গিও আমি ভুলব না কখনো, ভুলতে পারি না…’
‘থাক, থাক, খুব হয়েছে!’ চেঁচিয়ে উঠলেন আন্না, বৃথাই একটা কঠোর ভাব ফুটিয়ে তুলতে চাইলেন মুখে যেদিকে সতৃষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়েছিলেন প্রস্কি। ঠাণ্ডা রডটা ধরে উনি উঠে পড়লেন পৈঠায়, দ্রুত ঢুকে পড়লেন ওয়াগনের প্যাসেজে। কিন্তু এই ছোট্ট প্যাসেজে থেমে গিয়ে তিনি মনে মনে ভেবে দেখতে লাগলেন কি ঘটল। তাঁর নিজের অথবা ভ্রন্স্কির কোন কথা স্মরণে না এনেও তিনি অনুভবে বুঝলেন যে এই ক্ষণিকের বাক্যালাপ তাঁদের সাঙ্ঘাতিক কাছাকাছি এনে ফেলেছে, তাতে তিনি বোধ করলেন একাধারে আতঙ্ক আর সুখ। কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে তিনি ভেতর ঢুকলেন, বসলেন নিজের জায়গায়। যে উত্তেজিত অবস্থাটা তাঁকে প্রথম দিকে পীড়া দিচ্ছিল, সেটা শুধু ফিরে এল তাই নয়, বেড়ে উঠল এমন মাত্রায় যে তাঁর ভয় হল, ভেতরে টান-টান কিছু একটা বুঝি ছিঁড়ে যাবে যে কোন মুহূর্তে। সারা রাত ঘুম হল না তাঁর। কিন্তু যে উত্তেজনা আর দিবাস্বপ্ন তাঁর কল্পনাকে ছেয়ে ফেলছিল তাতে অপ্রীতিকর বা বিষণ্ন কিছু ছিল না, বরং সেগুলো ছিল আনন্দময়, চনমনে, উদ্দীপক। সকালের দিকে আন্না তাঁর আসনে বসে বসেই ঢুকলেন আর যখন জেগে উঠলেন তখন ফরসা হয়ে গেছে, সব সাদা, ট্রেন পৌঁছাচ্ছে পিটার্সবুর্গ স্টেশনে। সাথে সাথেই বাড়ি, স্বামী, ছেলের চিন্তা, আসন্ন’ও পরবর্তী দিনগুলোর ভাবনায় ডুবে গেলেন তিনি।
পিটার্সবুর্গে সবেমাত্র ট্রেন থেমেছে, বেরিয়ে এসে আন্নার দৃষ্টি প্রথম যে মুখখানায় আকৃষ্ট হল সেটি ‘তাঁর স্বামীর। তাঁর নিরুত্তাপ দর্শনধারী মূর্তি, বিশেষ করে এখন তাঁকে যা অবাক করল তাঁর সেই কান যার ডগায় ভর দিয়েছে তাঁর গোল টুপির কানা তা দেখে তাঁর মনে হল, ‘মাগো, অমন কান ওর হল কেমন করে?’ আন্নাকে দেখে তিনি তাঁর অভ্যস্ত উপহাসের ভঙ্গিতে ঠোঁট মুচকে, বড় বড় ক্লান্ত চোখে সোজাসুজি তাঁর দিকে তাকিয়ে এগিয়ে গেলেন। তাঁর ক্লান্ত স্থির দৃষ্টি দেখে কেমন বিশ্রী অনুভূতিতে এগিয়ে গেলেন। তাঁর ক্লান্ত স্থির দৃষ্টি দেখে কেমন বিশ্রী অনুভূতিতে বুক মুচড়ে উঠল আন্নার, যেন ওঁকে অন্যরকম দেখার আশা করেছিলেন তিনি। তবে ওঁর সাথে দেখা হওয়ায় বিশেষ করে নিজের ওপর একটা অসন্তোষ আচ্ছন্ন করল আন্নাকে। এটা অনেকদিনকার পরিচিত একটা অনুভূতি, স্বামীর সাথে সম্পর্কে ভান করে চলার যে অনুভূতিটা হত, তার মত; কিন্তু আগে তিনি এটা খেয়াল করেননি, এখন সুস্পষ্ট করে যন্ত্রণায় বিদ্ধ হয়ে সচেতন হলেন সে বিষয়ে।
