উপন্যাসের নায়ক তখন ব্রিটিশ সুখ, ব্যারন খেতাব আর সম্পত্তি অর্জন করতে চলেছে, আন্নারও ইচ্ছে হল তার সাথে তিনিও সম্পত্তিতে যান কিন্তু হঠাৎ তাঁর মনে হল নায়কের এর জন্য লজ্জা হওয়ার কথা এবং তাঁর নিজেরই লজ্জা হচ্ছে। কিন্তু কেন নায়কের লজ্জা হবে? ‘কেন আমার লজ্জা?’ আহত বিস্ময়ে তিনি প্রশ্ন করলেন নিজেকে। বই বন্ধ করে পাতা কাটার ছুরিটা দুহাতে শক্ত করে ধরে আন্না সীটে হেলান দিলেন। লজ্জার কিছু নেই। মস্কোর সব স্মৃতি তিনি বেছে বেছে দেখলেন। সবই ভালো, প্রীতিকর। মনে পড়ল বলনাচ, মনে পড়ল ভ্রন্স্কিকে, তাঁর প্রেমে পড়া বশীভূত মুখ। মনে পড়ল তাঁর সাথে নিজের গোটা সম্পর্কটার কথা; এতে লজ্জা পাবার মত কিছু ছিল না। আর সেই সাথে, স্মৃতিচারণের ঠিক এখানটাতেই লজ্জাবোধ বেড়ে উঠল। যখন ভ্রন্স্কির কথা মনে করছিলেন ঠিক তখনই ভেতরকার কোন একটা কণ্ঠস্বর যেন তাঁকে বলছিল : ‘দরদ, বড় বেশি দরদ, মদিরতা।’
‘তাতে কি হয়েছে?’ আসনের জায়গা বদলিয়ে দৃঢ়ভাবে তিনি বললেন নিজেকে। ‘তাতে কি দাঁড়াল? এটাকে সোজাসুজি দেখতে কি ভয় পাই আমি কি হল এতে? প্রতিটা চেনাজানা লোকের ক্ষেত্রে যা হয় তা ছাড়া এই বাচ্চা অফিসারটির সাথে আমার অন্য কোন সম্পর্ক আছে কি, থাকতে পারে কি?’ অবজ্ঞাভরে হাসলেন তিনি, বই টেনে নিলেন, কিন্তু যা পড়ছিলেন তার কিছুই আর মাথায় ঢুকছিল না। কাগজ-কাটা ছুরিটা তিনি ঘষলেন শার্সিতে, তারপর তার মসৃণ ঠাণ্ডা গা-টা চেপে ধরলেন গালে, আর হঠাৎ আসা আনন্দে প্রায় সশব্দেই হেসে উঠছিলেন আর কি। তিনি অনুভব করছিলেন যে তাঁর স্নায়ুগুলো মোচড় দেওয়া বেহালার তারের মত টান-টান হয়ে উঠছে। টের পাচ্ছিলেন যে ক্রমেই বড় বড় হয়ে উঠছে তাঁর চোখ, তাঁর হাত-পায়ের আঙুলগুলো স্নায়বিক বিক্ষেপে নড়ছে, ভেতর থেকে কি যেন চাপ দিচ্ছে তাঁর নিঃশ্বাসে, আর দোলায়মান এই আধা-অন্ধকারের সমস্ত মূর্তি আর ধ্বনি অসাধারণ স্পষ্টতায় অভিভূত করছে তাঁকে। অবিরাম সন্দেহের এক-একটা মূহূর্ত এসে পড়ছিল তাঁর ওপর—গাড়িটা সামনে যাচ্ছে, নাকি পেছনে, নাকি দাঁড়িয়েই আছে। ওঁর কাছে ও কে, আনুষ্কা নাকি বাইরের কোন লোক? ‘হাতলে ওটা কি, ফার কোট নাকি কোন জানোয়ার? আর আমি-বা এখানে কেন? এটা আমি নাকি অন্য কেউ?’ এই ঘোরের মধ্যে আত্মসমর্পণ করতে ভয় হচ্ছিল তাঁর। কিন্তু কি যেন তার ভেতর ঠেলে বসছিল, খুশিমত তিনি তাতে আত্মসমর্পণ করতেও পারেন, নাও পারেন। সম্বিত ফিরে পাবার জন্য তিনি উঠে দাঁড়ালেন, কম্বলটা সরিয়ে ফেললেন, কেপ খসিয়ে নিলেন গরম পোশাকটা থেকে। এক মুহূর্তের জন্য সম্বিত ফিরে পেলেন তিনি, বুঝতে পারলেন লম্বা ওভারকোট পরা যে লোকটা ঢুকল, যাকে একটা বোতাম নেই, বুঝতে পাররেন যে সে থার্মোমিটার দেখছে, দরজা দিয়ে তার পেছনে আসছে হাওয়া আর বরফের ঝাপটা; কিন্তু পরে আবার সব গুলিয়ে গেল… দীর্ঘ কটি পুরুষটি কি যেন কামড়াতে লাগল দেয়ালে। বৃদ্ধা তার ঠ্যাং বাড়াতে লাগল গোটা ওয়াগন বরাবর। কামরা ভরে তুলল কালো মেঘে, তারপর কিসের যেন ভয়ংকর ক্যাচক্যাচ ঠকঠক শব্দ উঠল যেন কাউকে কেটে কুটিকুটি করা হচ্ছে। তারপর চোখ ধাঁধিয়ে গেল লাল আলোয়, শেষে সব ঢাকা পড়ে গেল একটা দেয়ালে। আন্না টের পেলেন যে, তিনি পড়ে যাচ্ছেন কিন্তু তাতে ভয় না পেয়ে তাঁর খুশিই লাগছিল। পোশাকে জড়াজড়ি হয়ে তুষার-কণায় ছাওয়া একটা লোক কি যেন চেঁচিয়ে বলল তাঁর কানে। সম্বিত ফিরে আন্না উঠে দাঁড়ালেন; তিনি বুঝতে পারলেন যে কোন স্টেশনে এসেছেন আর ঐ লোকটা কন্ডাক্টর। যে কেপটা খুলে ফেলেছিলেন সেটা আর রুমাল দিতে বললেন আনুষ্কাকে। সেগুলো পরে গেলেন দরজার দিকে 1
আনুষ্কা বলল, ‘নামছেন নাকি?’
‘হ্যাঁ, এখানে ভীষণ গরম। একটু নিঃশ্বাস নিই গিয়ে।
আন্না দরজা খুললেন। তাঁর দিকে বাতাস আর তুষারকণার ঝাপটা ধেয়ে এল, তাঁর সাথে দরজা নিয়ে হুটোপুটি বাধাল। আন্নার এতে মজাই লাগল। দরজা খুলে তিনি নেমে গেলেন। বাতাস যেন ঠিক এরই অপেক্ষায় ছিল, সোল্লাসে শনশনিয়ে জাপটে ধরে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইল তাঁকে, কিন্তু পাদানির ঠাণ্ডা রেলিং আঁকড়ে গাউন চেপে ধরে
প্ল্যাটফর্মে নামলেন আন্না, গেলেন ওয়াগন পেরিয়ে। পৈঠায় বাতাসের জোর ছিল প্রচণ্ড, কিন্তু প্ল্যাটফর্মে ওয়াগনের আড়ালে তা শান্ত। পরিতৃপ্তিতে বুক ভরে তুষারমথিত হিমেল নিঃশ্বাস নিয়ে তিনি ওয়াগনের কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্ল্যাটফর্ম আর আলোকিত স্টেশনটাকে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন।
আন্না কারেনিনা – ১.৩০
ত্রিশ
প্রচণ্ড ঝড় ওয়াগনের চাকা আর স্টেশনের কোণে ল্যাম্পপোস্টগুলোর মধ্যে শনশনিয়ে উঠছিল আর ফুঁসছিল। ওয়াগন, পোস্টগুলো, লোকজন, যা কিছু দৃশ্যগোচর সবারই একটা পাশ তুষারকণায় ছেয়ে গেছে, ক্রমেই বেশি বেশি আসছে তুষারের ঝাপটা। মুহূর্তের জন্য একটু নরম হচ্ছিল ঝড়, কিন্তু তারপরেই আবার এমন দমকায় ধেয়ে আসছিল যে মনে হচ্ছিল যে ঠেকানো অসম্ভব। অথচ এর ভেতর ছুটাছুটি করছিল কিসব লোক, ফুর্তিতে কথা বলাবলি করে ক্যাচক্যাচ শব্দ তুলছিল প্ল্যাটফর্মের পাটাতনে, আর অবিরাম খুলছিল আর বন্ধ করছিল বড় বড় দরজা। মানুষের একটা গুঁড়ি-মারা ছায়া ভেসে গেল তাঁর পায়ের মাঝখান দিয়ে আর শোনা গেল লোহার ওপর হাতুড়ি ঠেকার শব্দ। ঝড়ের আঁধিয়ারায় অন্যদিক থেকে ভেসে এল কুপিত কণ্ঠস্বর : ‘ডিসপ্যাচটা দাও!’
