‘তা তোমার কংকালগুলো মোটেই গোমড়া নয়, মজাদার।’
‘না, গোমড়া। কাল নয়, আজকেই আমি যাচ্ছি কেন জান? এই যে স্বীকৃতিটা আমাকে পিষে মারছে সেটা তোমাকে বলতে চাই’, এই বলে আন্না দৃঢ়ভঙ্গিতে চেয়ারে বসে পড়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন ডল্লির দিকে 1
আর ডল্লি অবাক হয়ে দেখলেন আন্না আকর্ণ লাল হয়ে উঠেছেন, গ্রীবায় লম্বিত চুলের কালো কুণ্ডলী পর্যন্ত।
আন্না বলে গেলেন, ‘হ্যাঁ, কিটি কেন খেতে এল না জানো? আমার ওপর তার ঈর্ষা হয়েছে। আমি নষ্ট করে ফেলেছি… বলনাচটা যে তার কাছে আনন্দের না হয়ে যন্ত্রণাকর হয়েছে আমি তার কারণ। কিন্তু সত্যি বলছি, সত্যি, আমার দোষ নেই, কিংবা দোষ সামান্য’, তিনি ‘সামান্য’ কথাটা সরু গলায় টেনে টেনে বললেন।
‘আহ্, কথাটা হল ঠিক স্তিভার মত’, হেসে উঠলেন ডল্লি।
আন্না আহত হলেন।
ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘আরে না, না, আমি স্তিভা নই। আমি এ কথা বলছি কারণ আমি মুহূর্তের জন্যও নিজের ওপর নিজেকে সন্দিহান হতে দিই না।’
কিন্তু যখন তিনি এ কথা বলছিলেন, তখনই তিনি টের পেলেন যে তিনি ঠিক বলছেণ না; নিজেকে তিনি যে সন্দেহ করেছিলেন শুধু তাই নয়, ভ্রন্স্কির কথা ভেবে তিনি দোলায়িত বোধ গকরেছিলেন, এবং ভ্রন্স্কির সাথে আর যাতে দেখা না হয় শুধু এজন্যই যা ইচ্ছে ছিল তার আগেই তিনি চলে আসেন ওখান থেকে।
‘হ্যাঁ, স্তিভা আমাকে বলছিল যে তুমি ওর সাথে মাজুরকা নেচেছ আর সে… ‘
‘তুমি ভাবতে পারবে না কি হাস্যকর ব্যাপার দাঁড়াল। আমি শুধু ভেবেছিলাম ঘটকীয় কাজ করব আর হঠাৎ কিনা দাঁড়াল একেবারে অন্যরকম। হয়ত আমার অনিচ্ছাতেই আমি…’
লাল হয়ে উঠে থেমে গেলেন তিনি।
ডল্লি বললেন, ‘ওহ্ ওরা ওটা তখনই বোঝে!’
তাঁকে বাধা দিলেন আন্না, ‘কিন্তু ওর দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু থাকলে আমি হতাশ হয়ে পড়তাম। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস এ সবই ভুলে যাবে ও, কিটিও আর ঘৃণা করবে না আমাকে।’
‘তবে আন্না, সত্যি বলতে, কিটির এ বিয়ে আমি বিশেষ চাই না। ভ্রন্স্কি যদি এক দিনেই তোমার প্রেমে পড়ে যেতে পারে, তাহলে এটা ভেঙে যাওয়াই ভালো।’
‘মাগো, সে যে ভারি বোকামি হবে!’ আন্না বললেন, আর তাঁর মনের ভাবনাটা কথায় ব্যক্ত হতে শুনে পরিতোষের গাঢ় রঙ আবার ফুটে উঠল তাঁর মুখে। ‘তাই আমি চলে যাচ্ছি কিটিকে শত্রু করে দিয়ে, যাকে বড় ভালোবাসি আমি। ইস, কি মিষ্টি মেয়ে! কিন্তু তুমি ঠিকঠাক করে দিও এটা, ডল্লি? করবে তো?’
ডল্লির হাসি চাপা দায় হয়েছিল। আন্নাকে তিনি ভালোবাসতেন কিন্তু তাঁরও দুর্বলতা আছে দেখে তৃপ্তিও পেলেন তিনি।
শত্রু? সে অসম্ভব।’
‘আমি তোমাদের যেমন ভালোবাসি, তোমরাও সবাই আমাকে তেমনি ভালোবাসো, এই তো আমার সাধ। আর এখন আমি আরো বেশি করে তোমাদের ভালোবাসছি’, আন্না চোখে পানি নিয়ে বললেন, ‘আহ্, আজ কি বোকার মত করছি!’
তিনি মুখে রুমাল বুলিয়ে সাজ-পোশাক করতে লাগলেন।
বিলম্বিত অব্লোন্স্কি এলেন ঠিক রওনা হবার মুখে। মুখটা লাল। গন্ধ বেরোচ্ছে মদ আর চুরুটের।
ডল্লির মধ্যেও আন্নার ভাবাবেগ সঞ্চারিত হল। শেষবারের মত আলিঙ্গন করার সময় তিনি ফিসফিসিয়ে ননদকে বললেন, ‘মনে রেখো আন্না, আমার জন্য তুমি যা করেছ তা জীবনে ভুলব না। মনে রেখো, আমি তোমাকে ভালোবেসেছি আর চিরকাল নিজের সেরা বন্ধু বলে ভালোবেসে যাব।’
আন্না তাঁকে চুমু খেয়ে চোখের পানি আড়াল করে বললেন, ‘কিসের জন্য বুঝছি না।’
‘তুমি আমাকে বুঝেছ, বুঝতে পারছ। বোন আমার, তাহলে এসো!’
ঊনত্রিশ
ওয়াগনে ঢোকার পথ আগলে ভাই দাঁড়িয়ে ছিলেন তৃতীয় ঘণ্টি পড়া পর্যন্ত। তাঁকে শেষবার বিদায় জানাবার সময় আন্না আর্কাদিয়েভনার মনে প্রথম যে চিন্তাটা এল সেটা এই : ‘যাক, সৃষ্টিকর্তার দয়ায় সব তাহলে চুকে গেল!’ আনুষ্কার সাথে নিজের গদি-আঁটা বেঞ্চিতে বসে তিনি ঘুম-কামরার আধা-আলোয় তাকিয়ে দেখতে লাগলেন। ‘যাক, কাল সেরিওজা আর কারেনিনকে দেখতে পাব, আগের মতই অভ্যস্ত জীবন চলবে ভালোভাবে।’
সমস্তটা দিন তিনি যে দুশ্চিন্তার মেজাজে ছিলেন সেই মেজাজেই তিনি যাত্রার জন্য গুছিয়ে বসতে লাগলেন একটা সন্তুষ্টি আর পারিপাট্য নিয়ে। ছোট ছোট নিপুণ হাতে তিনি একটা লাল থলে খুললেন আর বন্ধ করলেন, একটা বালিশ বের করে রাখলেন কোলের ওপর, নিখুঁতভাবে পা কম্বলে জড়িয়ে শান্ত হয়ে আসন নিলেন। অসুস্থ একজন মহিলা শোবার আয়োজন করছিলেন, অন্য দুজন মহিলা কথা বলতে লাগলেন আন্নার সাথে, স্থূলকায়া এক বৃদ্ধা পা ঢেকে তাপের অব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁর অসন্তোষ জানালেন। কয়েক কথায় মহিলাদের প্রশ্নের উত্তর দিলেন আন্না, কিন্তু কথোপকথন থেকে কোন আকর্ষণের আশা নেই দেখে তিনি একটা লণ্ঠন আনতে বললেন আনুষ্কাকে, সিটের হাতলের সাথে সেটাকে বেঁধে নিজের হ্যান্ড ব্যাগ থেকে পাতা কাটার ছুরি আর একটা ইংরেজি নভেল বের করলেন। প্রথমটা তাঁর পড়ায় মন বসছিল না, গোড়ায় ব্যাঘাত হচ্ছিল মানুষের ব্যস্ততা আর হাঁটাহাঁটিতে; তারপর ট্রেন যখন ছাড়ল, শব্দগুলোয় কান না পেতে পারা গেল না। শেষ বাঁ দিকের জানালায় ঝাপট মারা, শার্সিতে লেপটে যাওয়া তুষারকণা, একদিকে তুষারে ছাওয়া পোশাকে যে কন্ডাক্টর পাশ দিয়ে চলে গেল তার চেহারা, বাইরে কি ভয়াবহ বরফ ঝড় চলছে তা নিয়ে আলাপে মনোযোগ আকৃষ্ট হল তাঁর। তারপর সেই একই ব্যাপার চলতে থাকল : ঝকঝক শব্দে সেই একই ঝাঁকুনি, জানালায় সেই দ্রুত বদল, আধা-অন্ধকারে সেই একই মুখগুলোর ঝলক, সেই একই কণ্ঠস্বর। ফলে আন্না পড়তে শুরু করলেন এবং পঠিত বিষয় বোধগম্যও হতে থাকল। দস্তানা পরা চওড়া হাতে, যার একটা ছেঁড়া, কোলের ওপর লাল থলেটা চেপে আনুষ্কা ঢুলতে শুরু করলে। আন্না আর্কাদিয়েভনা পড়ছিলেন আর বুঝতে পারছিলেন যে পড়তে অর্থাৎ অন্য লোকের জীবনের প্রতিফলন দেখতে তাঁর ভালো লাগছে না। নিজেই তিনি বড় বেশি বাঁচতে চান। যখন পড়ছিলেন উপন্যাসের নায়িকা রোগীর কি রকম সেবাযত্ন করছেন, তখন তাঁর নিজেরই ইচ্ছে হচ্ছিল নিঃশব্দে রোগীর ঘরে ঘুরে বেড়াতে; যখন পড়ছিলেন পার্লামেন্ট সভ্যের বক্তৃতার কথা, তখন তাঁর নিজেরই ইচ্ছে হচ্ছিল সেরকম বক্তৃতা দিতে; যখন পড়ছিলেন লেডি মেরি তাঁর ভ্রাতৃবধূকে চটিয়ে দিয়ে এবং নিজের দুঃসাহসে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ঘোড়ায় চেপে ধাওয়া করেছেন একপাল কুকুরের পেছনে তখন আন্নাও তাই করতে চাইছিলেন। কিন্তু করার কিছু ছিল না, ছোট ছোট হাতে মসৃণ ছুরিটা নাড়াচাড়া করতে করতে তিনি জোর করে পড়ে চললেন।
