‘বেশ, বিদ্যুৎ আর তাপ না হয় একই জিনিস, কিন্তু একটা প্রশ্নের সমাধানে এক ধরনের রাশির জায়গায় আরেকটা বসানো যায় কি সমীকরণে? যায় না। তাহলে দাঁড়াল কি? প্রকৃতির সমস্ত শক্তির মধ্যে সম্পর্ক তো সহজ বোধেই টের পাওয়া যায়… ভারি সুখের কথা যে পাভা-র বকনটি হবে লালের ছোপ দেওয়া গরু আর সমস্ত পালটা যাতে যোগ দেবে এই তিনটা… চমৎকার! বৌ আর নিমন্ত্রিতদের সাথে যাব গরু দেখতে… বৌ বলবে, কনস্তান্তিন আর আমি এই বাছুরটাকে পেলেছি সন্তানের মত। অতিথিরা বলবে, এতে আপনার এত আগ্রহ কেন বলুন তো? ওর যাতে আগ্রহ তার সবেতেই আমি সাগ্রহী। কিন্তু কে সে?’ মস্কোয় যা ঘটেছে তা মনে পড়ল তাঁর… ‘কিন্তু করা যায় কি?… আমার তো দোষ নেই। কিন্তু এখন সবই চলবে নতুন খাতে। জীবন সেটা হতে দেবে না, অতীত হতে দেবে না, এটা বাজে কথা। ভালোভাবে, অনেক ভালোভাবে বাঁচার জন্য লড়তে হবে…’ মাথা তুলে তিনি ডুবে গেলেন চিন্তায়। লেভিনের আগমনে বুড়ি লাস্কার আনন্দ তখনো যায়নি, আঙিনায় ছুটে গিয়ে ডাক ছেড়ে সে ফিরল লেজ নাড়তে নাড়তে, সাথে নিয়ে এল বাতাসের গন্ধ, লেভিনের কাছে গিয়ে সে মাথা গুঁজল তাঁর হাতে, লেভিনের আদর কেড়ে করুণ সুরে গুঁইগুঁই করতে লাগল।
আগাফিয়া মিখাইলোভনা বললেন, ‘শুধু কথা বলে না যা। কুকুর তো… তবে বোঝে যে মনিব ফিরেছে, কিন্তু মন খারাপ।’
‘মন খারাপ হবে কেন?’
‘আমার কি চোখ নেই বাছা? এতদিনেও বাবুদের কি বুঝিনি? সেই ছোট থেকে আছি বাবুদের সংসারে। ও কিছু নয় বাপু। স্বাস্থ্য ভালো আর বিবেক পরিষ্কার থাকলেই হল।’
একদৃষ্টে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন লেভিন, কেমন করে তাঁর ভাবনা ধরতে পেরেছে ভেবে অবাক লাগল তাঁর ‘কি, আরো চা আনব?’ এই বলে পেয়ালা নিয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন।
লাস্কা তাঁর হাতে ক্রমাগত মুখ গুঁজছিল। লেভিন তার গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন। সাথে সাথেই লাস্কা তাঁর পায়ের কাছে কুণ্ডলী পাকিয়ে বেরিয়ে আসা পেছনের থাবাটায় মাথা রাখল। এখন সব ভালো, সব ঠিক আছে—এটা জানাবার জন্য সামান্য হাঁ করল সে, ঠোঁট চাটল আর বুড়ো দাঁতের কাছে চ্যাটচেটে জিবটা গুছিয়ে রেখে চুপ করে গেল পরমানন্দের প্রশান্তিতে। লেভিন মন দিয়ে লক্ষ করলেন তার এই শেষ কাণ্ডটা।
মনে মনে ভাবলেন, ‘তাহলে আমিও তাই! আমিও তাই করব! ভাবনা নেই… সবকিছু ঠিকঠাকই আছে!’
আটাশ
আন্না আর্কাদিয়েভনা বলনাচের পরে সেদিনই ভোরে তাঁর মস্কো ছাড়ার খবর দিয়ে স্বামীর কাছে টেলিগ্রাম পাঠালেন।
‘না-না, যেতে হবে! যেতেই হবে’, তাঁর সংকল্প পরিবর্তনটা তিনি ভাবীকে বোঝালেন এমন সুরে যেন এত কাজের কথা তাঁর মনে পড়েছে যে গুনে শেষ করা যায় না, ‘না, এখন বরং যাওয়াই ভালো!’
বাড়িতে খেলেন না অব্লোন্স্কি, কথা দিলেন বোনকে গাড়িতে তুলে দেবার জন্য আসবেন সাতটার সময়।
কিটিও এল না, চিরকুট লিখে পাঠাল যে তার মাথা ধরেছে। ছেলেমেয়ে আর ইংরেজ মহিলাটির সাথে খাওয়া সারলেন শুধু ডল্লি আর আন্না। শিশুরা একনিষ্ঠ নয় অথবা খুবই সজাগ বলেই কিনা কে জানে, তারা অনুভব করছিল, যেদিন তারা আন্নার অত ভক্ত হয়ে পড়েছিল, আজ তিনি মোটেই সেদিনের মত নন, তিনি আর ব্যস্ত নন ওদের নিয়ে, হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল ফুফুর সাথে তাদের খেলা, তাঁর প্রতি ভালোবাসা, তিনি যে আজ চলে যাচ্ছেন এতে মোটেই তাদের মনোযোগ দেখা গেল না। আন্না সারা সকাল ব্যস্ত ছিলেন যাত্রার তোড়জোড় নিয়ে। মস্কোর পরিচিতদের কাছে চিরকুট লিখলেন আন্না, হিসাবপত্র টুকে রাখলেন, মালপত্র গোছালেন। ডল্লির মনে হল উনি সুস্থির মেজাজে নেই, আর এই যে উদ্বেগের মেজাজ নিজেকে দিয়ে ডল্লির ভালোই জানা, তা বিনা কারণে ঘটে না আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা চাপা দেয় নিজের ওপর অসন্তোষ। খাওয়ার পর আন্না সাজগোজ করছে গেলেন নিজের ঘরে, ডল্লিও তাঁর সাথে সাথে এলেন।
ডল্লি তাঁকে বললেন, ‘আজ কেমন অদ্ভুত লাগছে তোমাকে!’
‘আমি? তাই মনে হচ্ছে তোমার? অদ্ভূত নই, তবে বিগড়ে আছি। ওটা আমার হয়। কেবলি কান্না পাচ্ছে। খুব বোকামি, কিন্তু কেটে যাবে’, তাড়াতাড়ি এই বলে আন্না তাঁর রক্তিম মুখ নোয়ালেন খেলনার মত থলেটার দিকে যাতে তিনি রাখছিলেন তাঁর নৈশ টুপি আর বাতিস্ত রুমাল। চোখ তাঁর অসম্ভব চকচক করছিল, অবিরাম পানি দেখা দিচ্ছিল তাতে, ‘পিটার্সবুর্গ থেকে নড়তে চাইছিলাম না, এখন এখান থেকে যেতেও মন সরছে না।’
তাঁর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ডল্লি বললেন, ‘তুমি এখানে একটা উপকার করে গেলে। আন্না তাঁর দিকে কান্নাভেজা চোখে তাকালেন।
‘ডল্লি, ও-কথা বলো না। কিছুই আমি করিনি, করতে পারতামও না। প্রায়ই আমার অবাক লাগে কেন লোকে ষড়যন্ত্র করে আমাকে নষ্ট করার জন্য। কি আমি করেছি, কিইবা করতে পারতাম। ক্ষমা করার মত প্রচুর ভালোবাসা ছিল তোমার বুকের ভেতর।’
‘তুমি নইলে কি যে ঘটত সৃষ্টিকর্তাই জানেন। কি সৌভাগ্য তোমার!’ ডল্লি বললেন, ‘প্রাণটা তোমার পরিষ আর আর ভালো।’
‘ইংরেজরা যা বলে, প্রত্যেকের নিভৃত কক্ষেই কংকাল থাকে।
‘তোমার আবার কংকাল কি? তোমার সবই তো পরিষ্কার।’
‘আছে’, হঠাৎ বলে উঠলেন আন্না আর অশ্রুর পর অপ্রত্যাশিত ধূর্ত উপহাসের হাসিতে কুঞ্চিত হয়ে উঠল তাঁর ঠোঁট।
