ঘরে ঢুকে গোমস্তা বলল যে, সৃষ্টিকর্তার দয়ায় সবই ভালোয় ভালোয় চলছে, তবে শুকিয়ে তোলার নতুন ব্যবস্থাটায় বাক-হুইট পুড়ে গেছে। এ খবরটায় পিত্তি জ্বলে গেল লেভিনের। শুকাবার নতুন ব্যবস্থাটা লেভিনের বানানো এবং খানিকটা তাঁরই উদ্ভাবন। গোমস্তা সব সময়ই ছিল তার বিরুদ্ধে, এখন চাপা বিজয়োল্লাসে ঘোষণা করছে যে বাক-হুইট পুড়ে গেছে। লেভিন একেবারে নিঃসন্দেহ যে বাক-হুইট যদি ধরে গিয়ে থাকে, তাহলে শত বার যে সব ব্যবস্থা নেবার কথা তিনি বলেছিলেন তা নেওয়া হয়নি। বিরক্ত লাগল তাঁর, গোমস্তাকে বকুনি দিলেন। তবে একটা জরুরি, আনন্দের কথা : পাভা বাচ্চা দিয়েছে, এটি মেলা থেকে কেনা তাঁর সেরা, দামী গরু।
‘কুজ্মা, আমার ওভার-কোটটা দাও। আর তুমি লণ্ঠন আনতে বল। গিয়ে দেখে আসি’, গোমস্তাকে হুকুম করলেন। বাড়ির পেছনেই দামী গরুগুলোর গোয়াল। লাইলাক গাছগুলোর কাছে তুষারস্তূপ পেরিয়ে আঙিনা দিয়ে তিনি গোয়ালে গেলেন। হিমে জমাট দরজা খুলতেই গোবরের উষ্ণ ভাপ নাকে এল, লণ্ঠনের অনভ্যস্ত আলোয় অবাক হয়ে টাটকা খড়ের ওপর খচমচ করে উঠল গরুরা। ঝলক দিল ওলন্দাজ গরুর মসৃণ ছোপ-ছোপ কালো পিঠ। ঠোঁটে আংটা পরানো ষাঁড় বের্কুত শুয়ে ছিল, ভেবেছিল উঠে দাঁড়াবে, কিন্তু মত বদলে শুধু বার দুয়েক ফোঁস ফোঁস করল যখন তার কাছ দিয়ে যাচ্ছিল লোকেরা। হিপোপটেমাসের মত বিপুলকায়, রক্তিম সুন্দরী পাভা পেছন ফিরে বাছুরটাকে আড়াল করে তাকে শুঁকতে শুরু করল।
লেভিন স্টলের ভেতর ঢুকে পাভার দিকে তাকিয়ে দেখে লালচে-ছোপ বাছুরটাকে খাড়া করলেন তার লম্বা নড়বড়ে পায়ের ওপর। পাভা হাম্বা করে উঠতে চাইছিল, কিন্তু লেভিন যখন বাচ্চাটাকে তার দিকে এগিয়ে দিলেন, তখন শান্ত হয়ে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাচ্চাটাকে চাটতে লাগল তার খড়খড়ে জিব দিয়ে। বাচ্চাটা খুঁজে খুঁজে নাক গুঁজল তার মায়ের পেটের নিচে, লেজ দোলাতে লাগল।
‘এখানটায় আলো দাও ফিওদর, লণ্ঠন আনো’, বাছুরটারকে দেখতে দেখতে বললেন লেভিন, ‘একেবারে মায়ের মত! যদিও রংটা পেয়েছে বাবার। দিব্যি হয়েছে। লম্বা, চওড়া। ভাসিলি ফিওদরোভিচ, দিব্যি হয়েছে তাই না?’ বাছুরটার জন্য আনন্দে তিনি বাক-হুইটের কথা একেবারে ভুলে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন গোমস্তাকে।
গোমস্তা বলল, ‘খারাপ হতে যাবে কেন? আপনি চলে যাবার পরের দিন ঠিকাদার সেমিওন এসেছিল। ওকে ফরমাশ দিতে হবে কনস্তান্তিন দ্মিত্রিচ। আর শুকাবার যন্ত্রটার কথা তো আগেই বলেছি।’
এই একটা কথায়ই লেভিন ডুবে গেলেন তাঁর সম্পত্তির খুঁটিনাটিতে। এ সম্পত্তি যেমন বড়, তেমনি জটিল। গোয়াল থেকে উনি সোজা গেলেন দপ্তরে, গোমস্তা আর ঠিকাদার সেমিওনের সাথে কথাবার্তা বলে বাড়ি ফিরলেন, সোজা ওপরতলার বৈঠকখানায় চলে গেলেন।
সাতাশ
পুরানো আমলের একটা বড় বাড়িটা। লেভিন তাতে একা থাকলেও সমস্ত বাড়িটাই গরম রাখার ব্যবস্থা করতেন, ব্যবহার করতেন বাড়িটা। জানত যে এটা বোকামি, এমন কি খারাপই এবং তাঁর বর্তমান নতুন পরিকল্পনার বিরোধী। কিন্তু লেভিনের কাছে বাড়িটা গোটা একটা জগৎ। এই জগতে দিন কাটিয়েছেন এবং প্রয়াত লেভিনের কাছে মনে হত সব কিছু পূর্ণতার পরাকাষ্ঠা, নিজের স্ত্রী, নিজের পরিবারকে নিয়ে সেটা পুনরুজ্জীবিত করার স্বপ্ন ছিল তাঁর।
তাঁর নিজের মাকে বড় একটা মনে পড়ে না। তাঁর সম্পর্কে তাঁর যা ধারণা, সেটা তাঁর কাছে পূত-পবিত্র একটা স্মৃতি, তাঁর মা যেমন নারীর অপূর্ব, পবিত্র আদর্শ, তাঁর পত্নীরও হওয়া উচিত তারই পুনরাবৃত্তি।
নারীকে বিবাহ ছাড়া ভালোবাসা তিনি কল্পনাও করতে পারতেন না—শুধু তাই নয়, সর্বাগ্রে তিনি সংসারের কথা ভাবতেন। তার পরে যে নারী তাঁকে সে সংসার দেবে, তাঁকে। তাই বিবাহ সম্পর্কে তাঁর ধারণাটা ছিল তাঁর অধিকাংশ চেনা-পরিচিতদের মত নয়, যাদের কাছে বিয়েটা হল নানান সামাজিক ব্যাপারের একটা। লেভিনের কাছে এটা জীবনের প্রধান ব্যাপার, যার ওপর নির্ভর করছে জীবনের সমস্ত সুখ। আর এখন সেটা ত্যাগ করতে হবে।
লেভিন সব সময় যে ছোট বৈঠকখানাটায় চা খেতেন সেখানে নিজের ইজি-চেয়ারে যখন বসলেন বই নিয়ে আর আগাফিয়া মিখাইলোভনা চা এনে তাঁর বরাবরকার ‘আমিও বসি বাছা’ বলে ঠাঁই নিলেন জানালার কাছে, তখন যত আশ্চর্যই হোক, স্বপ্নগুলো ছেড়ে গেল না তাঁকে, এ ছাড়া তিনি বাঁচতে পারেন না। ওকে নিয়ে হোক বা অন্য কাউকে নিয়েই হোক, এ ঘটবেই। বই পড়তে লাগলেন তিনি, যা পড়লেন তা নিয়ে ভাবছিলেন, থেকে থেকে ভাবনা থামিয়ে শুনছিলেন আগাফিয়া মিখাইলোভনার অনর্গল বকবকানি; সেই সাথে মহালের আর ভবিষ্যৎ পারিপারিক জীবনের অসংলগ্ন নানান ছবি ভেসে উঠতে লাগল তাঁর কল্পনায়। তিনি অনুভব করছিলেন যে তাঁর অন্তরের গভীরে কি-একটা যেন এসে পড়েছে, দৃঢ় হচ্ছে, বাসা পেতে বসছে।
ধর্মভয় নেই প্রখরের, ঘোড়া কেনার জন্য লেভিন তাকে যে টাকা দিয়েছিলেন তা দিয়ে সে বেদম মদ খাচ্ছে, পিটিয়ে আধমরা করেছে বৌকে—আগাফিয়া মিখাইলোভনার এসব কথা শুনছিলেন লেভিন; শুনছিলেন আর বই পড়ে যাচ্ছিলেন, পাঠ থেকে মনে যে সব ভাবনার উদয় হচ্ছিল লক্ষ করছিলেন তার গতি। এটা ছিল তাপ নিয়ে টিন্ডালের আত্মতুষ্টি আর দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতির জন্য তাঁর সমালোচনার কথা। হঠাৎ একটা সুখচিন্তা ভেসে উঠল মনে : ‘দু’বছর পরে আমার পালে থাকবে দুটো ওলন্দাজ গরু, পাভা নিজেও হয়ত বেঁচে রইবে তখনো, তাছাড়া বারোটি বেকুত-এর বকনা, এর সাথে বিজ্ঞাপনের জন্য যোগ করা যাবে এই তিনটিকে চমৎকার!’ তিনি আবার বইয়ে মন দিলেন।
