ওর জিব জড়িয়ে আসছিল, লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছিল বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে। মাথার সাহায্যে কনস্তান্তিন বোঝালেন যে কোথাও যাবার দরকার নেই, তাকে একেবারে মাতাল অবস্থায় শুইয়ে দিলেন।
মাশা কথা দিল দরকার হলে চিঠি লিখবে কনস্তান্তিনকে এবং নিকোলাই লেভিনকে ভাইয়ের কাছে গিয়ে থাকার জন্য বোঝাবে।
ছাব্বিশ
কনস্তান্তিন লেভিন সকালে মস্কে ছেড়ে সন্ধ্যায় বাড়ি পৌঁছলেন। পথে রেলের কামরায় তিনি সহযাত্রীদের সাথে কথা বলেন রাজনীতি, নতুন রেল পথ ইত্যাদি নিয়ে এবং মস্কোতে যা হয়েছিল, ঠিক তেমনি অর্থবোধের গোলমাল, নিজের ওপরেই অসন্তোষ, কি নিয়ে যেন একটা লজ্জা পেয়ে বসে তাঁকে; কিন্তু যখন নিজের স্টেশনে নামলেন, চিনতে পারলেন কাফতানের কলার তুলে দেওয়া কানা কোচোয়ান ইগ্নাতকে, স্টেশনের জানলা দিয়ে এসে পড়া আবছা আলোয় দেখলেন তাঁর গালিচা পাতা স্লেজখানা, লেজ-বাঁধা, আংটা আর থুপিতে সাজানো তাঁর ঘোড়াগুলোকে, স্লেজে মাল চাপাতে চাপাতেই ইগ্নাত যখন জানাচ্ছিল গ্রামের খবর, বলছিল ঠিকাদার এসেছে, বাচ্চা দিয়েছে পাভা, তখন উনি টের পেলেন যে গোলমেলে ভাবটা মিলিয়ে যাচ্ছে, কেটে যাচ্ছে লজ্জা আর নিজের ওপর অসন্তোষ। এটা তিনি অনুভব করেছিলেন শুধু ইগ্নাত আর ঘোড়াগুলোকে দেখেই। কিন্তু যখন তিনি তাঁর জন্য আনা মেষচর্মের কোট পরে ঢাকাঢুকো দিয়ে স্লেজে বসে রওনা দিলেন, ভাবতে লাগলেন গ্রামে আসন্ন ব্যবস্থা-বন্দোবস্তের কথা, দেখতে লাগলেন দন জাতের বাড়তি ঘোড়াটাকে, আগে যা ছিল দৌড়ের ঘোড়া, এখন গতর ভেঙে পড়লেও তেজ বজায় রেখেছে, তখন তিনি বুঝতে শুরু করলেন কি তাঁর হয়েছিল। স্বীয় সত্তা অনুভব করলেন তিনি, অন্য কিছু হবার সাধ তাঁর নেই। এখন তিনি চাইলেন শুধু আগের চেয়েও বেশি ভালো হতে। প্রথমত, উনি ঠিক করলেন, বিবাহ থেকে যে অসামান্য সুখ- শান্তি তাঁর পাবার কথা, সেদিন থেকে তার আর কোন ভরসা তিনি করবেন না, ফলে বর্তমানকে এমন তাচ্ছিল্য করবেন না তিনি। দ্বিতীয়ত, জঘন্য হৃদয়াবেগে আর কখনোই নিজেকে ভেসে যেতে তিনি দেবেন না, পাণিপ্রার্থনা করার সময় যার স্মৃতি তাঁকে এত যন্ত্রণা দিয়েছে। তারপর নিকোলাই ভাইয়ের কথা স্মরণ করে নিজের কাছেই প্রতিজ্ঞা করলেন যে তাকে কখনো ভোলা চলবে না, তার ওপর নজর রাখবেন, দৃষ্টিচ্যুত করবেন না তাকে যাতে মুশকিলে পড়লে সাহায্যের জন্য তৈরি থাকতে পারেন। আর সেটা ঘটবে শিগগিরই, এটা টের পাচ্ছিলেন তিনি। তারপর কমিউনিজম নিয়ে ভাইয়ের যে কথাবার্তাকে তিনি তখন হালকা করে দেখেছিলেন সেটা এখন তাঁকে ভাবাতে লাগল। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজার ব্যাপারটা তিনি বাজে কথা বলে গণ্য করতেন, কিন্তু লোকদের দারিদ্র্যের সাথে তুলনায় নিজের উদ্বৃত্তটা তাঁর কাছে সব সময়ই মনে হত অন্যায়। এখন তিনি মনে মনে ঠিক করলেন যে আগে অনেক খাটলেও এবং বিলাসে দিন না কাটালেও নিজেকে পুরোপুরি ন্যায়পরায়ণ বলে অনুভব করার জন্য এখন খাটবেন আরো বেশি করে এবং বিলাসে গা ভাসাবেন আরো কম। আর এসব করা তাঁর পক্ষে এত সহজ মনে হল যে সারা রাস্তা তিনি নানা প্রীতিকর কল্পনায় ডুবে গেলেন। একটা নতুন, উত্তম জীবন যাপনের আশায় চাঙ্গা হয়ে তিনি বাড়িতে পৌঁছলেন সন্ধ্যা আটটার পর।
বৃদ্ধা আয়া আগাফিয়া মিখাইলোভনা। এখন যিনি তাঁর সংসার দেখাশোনা করেন, তাঁর ঘরের জানালা থেকে আলো এসে পড়ল বাড়ির সামনেকার চাতালের বরফে। এখনো ঘুমাননি তিনি। কুজ্মাকে তিনি জানিয়ে দিলেন। ঘুম- ঘুম অবস্থায় খালি পায়ে সে ছুটে গেল অলিন্দে। কুজ্মাকে প্রায় উলটে ফেলে শিকারী কুকুর লাস্কাও ছুটে গিয়ে ডাক ছাড়তে লাগল, গা ঘষতে লাগল তাঁর হাঁটুতে, চাইছিল উঠে দাঁড়িয়ে তার সামনের দু’থাবা তাঁর বুকে রাখতে, তবে সাহস পাচ্ছিল না।
‘বড় তাড়াতাড়ি যে বাপু’, বললেন আগাফিয়া মিখাইলোভনা।
‘মন কেমন করছিল আগাফিয়া মিখাইলোভনা। পরের বাড়ি বেড়াতে যাওয়া ভালো, তবে নিজের বাড়ি আরো ভালো’, এই বলে তিনি গেলেন নিজের স্টাডিতে।
মোমবাতি নিয়ে আসায় ধীরে ধীরে আলো হয়ে উঠল ঘরটা। ফুটে উঠল পরিচিত সব খুঁটিনাটি : হরিণের শিশু, বইয়ের তাক, চুল্লির একটা পাশ, বায়ু চলাচলের পাটা যা বহুকাল মেরামত করা হয়নি, বাপের সোফা, মস্তো টেবিলটা, তাতে পাতা-খোলা বই, ভাঙা ছাইদানি, তাঁর হস্তাক্ষরে লেখা নোটখাতা। এসব দেখে মুহূর্তের জন্য তাঁর সন্দেহ হল আসবার পথে যে নতুন জীবনের কল্পনা তিনি করছিলেন তা গড়ে তোলা সম্ভব কিনা। তাঁর জীবনের এসব চিহ্নগুলো যেন তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলছিল : ‘না, আমাদের ছেড়ে তুমি যেতে পারবে না, আর কেউ তুমি হবে না, হয়ে থাকবে তাই যা ছিলে : সন্দেহ, নিজের ওপর চিরকাল অসন্তোষ, সংশোধনের ব্যর্থ চেষ্টা আর হতাশা, সুখের আশা আর নিরন্তন তার প্রতীক্ষা নিয়ে যা পাওনি, তোমার পক্ষে যা পাওয়া অসম্ভব।’
কিন্তু এ কথা বলছিল জিনিসগুলো, অন্তরের ভেতরটা বলছিল যে বিগতের বশবর্তী থাকার প্রয়োজন নেই, সব কিছু করা তোমার পক্ষে সম্ভব। সে কথায় কান দিয়ে তিনি গেলেন ঘরের কোণটায় যেখানে ছিল তাঁর এক-এক পুদ ওজনের দুই ডাম্ব-বেল, নিজেকে চাঙ্গা করে তোলার চেষ্টা সেগুলো তুলে ব্যায়াম করতে লাগলেন। দরজার বাইরে পদশব্দ শোনা গেল। তাড়াতাড়ি ডাম্ব-বেল নামিয়ে রাখলেন তিনি।
