‘হ্যাঁ’, ভয়ে ভয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে বলল সে, সেখানে দেখা গিয়েছিল নিকোলাই লেভিনকে।
‘কি নিয়ে কথা হচ্ছিল তোমাদের?’ ভুরু কুঁচকে একজনের পর আরেক জনের ওপর ভীত দৃষ্টিপাত করে বলল, ‘এ্যাঁ, কি নিয়ে?’
‘বিশেষ কিছুই নয়’, বিব্রত হয়ে জবাব দিলেন কনস্তান্তিন।
‘বলতে যদি না চাও, সে তোমাদের ইচ্ছে। তবে ওর সাথে আলাপের কিছু নেই। এটা একটা ছুকরি, আর তুমি সাহেব লোক’, বলল সে ঘাড় ঝাঁকিয়ে
তারপর গলা চড়িয়ে আবার সে বলে উঠল, ‘আমি যে দেখতে পাচ্ছি তুমি সব বুঝেছ, খতিয়ে দেখেছ, আমার গোল্লায় যাওয়ায় করুণা হচ্ছে তোমার।
‘নিকোলাই মিত্রিচ্, নিকোলাই মিত্রিচ!’ আবার তার কাছে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল মারিয়া নিকোলায়েভনা।
‘বেশ, ঠিক আছে, ঠিক আছে!… কিন্তু খাবার কোথায়! আহ্ এই যে’, ট্রে হাতে ওয়েটারকে আসতে দেখে সে বলল, ‘এখানে, এখানে রাখো’, রেগে এই কথা বলে সে তখনই ভোদ্কা নিয়ে পানপাত্রে ঢালল এবং খেল তৃষিতের মত। সাথে সাথে শরীফ মেজাজে ভাইকে বলল, ‘খাবে? যাক, সের্গেই ইভানিচের কথা থাক। তোমাকে দেখে আমি খুশি হয়েছি। যতই বলো না কেন, আমরা তো আর পর নই। নাও, খাও-না। তা কি করছ, বল?’ পরিতৃপ্তির সাথে এক টুকরো রুটি চিবাতে চিবাতে আরেক পাত্র মদ ঢেলে বলল, ‘কেমন আছ?’
কি লোলুপতায় ভাই খাবার আর মদ গিলছে, সভয়ে তা দেখে এবং তার মনোযোগ চাপা দেবার চেষ্টা করে কনস্তান্তিন জবাব দিলেন, ‘গাঁয়ে থাকি একা যেমন আগে থাকতাম, চাষবাস দেখি।’
‘বিয়ে করনি কেন?’
‘ঘটে উঠল না’, লাল হয়ে বললেন কনস্তান্তিন।
‘কেন? আমার অবশ্য অন্য কথা। নিজের জীবন আমি নষ্ট করেছি। আমি বলেছিলাম এবং বলছি, যখন আমার দরকার ছিল তখন আমার অংশটা পেলে আমার জীবন হত অন্যরকম।’
তাড়াতাড়ি কথাবার্তাটা অন্য খাতে ঘোরাতে চাইলেন কনস্তান্তিন দ্মিত্রিচ। বললেন, ‘আর জানো, তোমার ভানিউকা আমার ওখানে পত্রোভস্কয়েতে একজন কেরানি।’ নিকোলাই ঘাড় ঝাঁকিয়ে ভাবনায় ডুবে গেল।
‘হ্যাঁ বটে, বল তো কি হচ্ছে পক্রোভস্কয়ে-তে? বাড়িটা কি আস্তো আছে, আর বাচগাছগুলো, আমাদের পাঠশালাটা? আর ঐ মালী ফিলিপ, বেঁচে আছে এখনো? কি যে মনে পড়ে কুঞ্জ ঘর আর সোফাটার কথা। দেখো কিন্তু, বাড়ির কিছুই অদলবদল করবে না। তবে বিয়েটা করে ফেলো তাড়াতাড়ি তারপর আবার যেমন ছিল তেমনি করে রাখো। আমি তখন যাব তোমার কাছে, অবশ্য বৌটা যদি ভালো হয়।’
লেভিন বললেন, ‘এখনই চলে এসো। কি চমৎকার যে হবে!’
‘তোমার কাছেই যেতাম যদি জানা থাকত যে সের্গেই ইভানিচকে দেখতে হবে না।’
‘ওর দেখাই পাবে না। আমি থাকি ওর কাছ থেকে একেবারে স্বাধীনভাবে।’
‘কিন্তু যতই বল, ওর আর আমার মধ্যে একজনকে বেছে নিতে হবে তোমায়’, ভয়ে ভয়ে ভাইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে সে বলল। এই ভীরুতাটা কনস্তান্তিনের মর্ম স্পর্শ করল।
‘এ ব্যাপারে যদি আমার পুরো স্বীকৃতিটা শুনতে চাও, তাহলে বলি শোনো, সের্গেই ইভানিচের সাথে তোমার ঝগড়ায় আমি কোন পক্ষই নেব না। অন্যায় তোমাদের দুজনেরই। তোমারটা বাইরের দিক থেকে বেশি, ওরটা ভেতরের দিকে।’
‘বটে! এটা তুমি বুঝেছ তাহলে, বুঝেছ?’ আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল নিকোলাই।
‘কিন্তু যদি জানতে চাও, তাহলে আমি ব্যক্তিগতভাবে তোমার সাথে বন্ধুত্বকেই মূল্য দিই কেননা…’
‘কেন, কেন?’
কনস্তান্তিন বলতে পারলেন না যে মূল্য দেন কারণ নিকোলাই দুর্ভাগা, বন্ধুত্ব তার প্রয়োজন। কিন্তু নিকোলাই টের পেল যে ঠিক ঐ কথাটাই কনস্তান্তিন বলতে চাইছিলেন। ভুরু কুঁচকে আবার সে ভোদ্কা ঢালতে গেল।
‘আর না নিকোলাই মিত্রিচ!’ পানপাত্রের দিকে মোটা সোটা অনাবৃত হাতখানা বাড়িয়ে দিয়ে বলল মারিয়া নিকোলায়েভনা।
‘ছাড়ো বলছি! পেছনে লেগো না! মেরে ঢিট করব!’ চেঁচিয়ে উঠল সে।
ভীরু ভীরু সহৃদয় একটা হাসি ফুটল মারিয়া নিকোলায়েভনার মুখে, তাতে সাড়া দিল নিকোলাই, মেয়েটা ভোদ্কা নিল।
নিকোলাই বললেন, ‘আরে ভেবো না যে ও কিছু বোঝে না। আমাদের সবার চেয়ে ও বোঝে ভালো। সত্যি ওর মধ্যে সুন্দর, মিষ্টি কি-একটা যেন আছে, তাই না?’
‘আপনি আগে মস্কোয় আসেননি কখনো?’ কনস্তান্তিন বললেন কিছু-একটা বলতে হয় বলে।
‘আরে ওকে আপনি-আপনি করো না। এতে ও ভয় পায়। বেশ্যাবাড়ি থেকে পালাতে চেয়েছিল বলে যখন ওকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়, তখন সালিশ হাকিম ছাড়া কেউ ওকে আপনি বলেনি কখনো। সৃষ্টিকর্তা, এসব কি মাথামুণ্ডু হচ্ছে দুনিয়ায়!’ হঠাৎ সে চেঁচিয়ে উঠল, ‘যতসব নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান, সালিশ হাকিম, জেমভো, কি সব অনাসৃষ্টি ব্যাপার!’
এবং এসব নতুন প্রতিষ্ঠানের সাথে তার সংঘাতের কথা বলতে লাগল সে।
কনস্তান্তিন লেভিন শুনে যাচ্ছিলেন। কোন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মানে হয় না, ভাইয়ের এই মতটায় তাঁরও সায় ছিল এবং সে কথা প্রায়ই বলেছেনও, এখন কিন্তু ভাইয়ের মুখ থেকে সে কথা শুনতে বিছুছিরি লাগল তাঁর। ঠাট্টা করে বললেন, ‘পরপারে গিয়ে এসব বোঝা যাবে।’
‘পরপারে? এহ্, পরপার আমার ভালো লাগে না!’ ভাইয়ের মুখের দিকে ভীত বন্য চোখ মেলে সে বলল, ‘মনে হতে পারে, অপরের আর নিজের এসব নীচতা, গণ্ডগোল থেকে বেরিয়ে যেতে পারা তো ভালোই। কিন্তু ভয় পাই মরণকে, সাঙ্ঘাতিক ভয় পাই’, কেঁপে উঠল সে, ‘হ্যাঁ, কিছু-একটা পান কর। শ্যাম্পেন খাবে? নাকি চলে যাব কোথাও? চল জিপসীদের কাছে যাই! জানো, জিপসীদের আর রুশ গান আমি ভারি ভালোবেসে ফেলেছি।’
