আবার চোখ তার সপ্রশ্ন দৃষ্টি বুলিয়ে নিল সবার মুখে।
‘কেন হেয় হয়ে যাব, বুঝতে পারছি না।’
‘তাহলে মাথা, তিনজনের খাবার আনতে বল, ভোদ্কা আর সুরা… না, না, না, দাঁড়াও… আচ্ছা দরকার নেই… যাও।’
আবার চোখ তার সপ্রশ্ন দৃষ্টি বুলিয়ে নিল সবার মুখে।
‘কেন হেয় হয়ে যাব, বুঝতে পারছি না।’
‘তাহলে মাথা, তিনজনের খাবার আনতে বল, ভোদ্কা আর সুরা… না, না, না, দাঁড়াও… আচ্ছা দরকার নেই… যাও।’
নিকোলাই লেভিন কপাল কুঁচকে, মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে জোর করে বলে চলল, ‘দেখছ তো তাই’, বোঝা যাচ্ছিল কি বলবে বা করবে তা ঠিক ভেবে পাচ্ছিল না সে। ‘ঐ যে দেখছ তো, ঘরের কোনে বেঁধে রাখা কি সব লোহার রড দেখাল সে, ‘দেখছ? আমরা নতুন যে কাজে হাত দিচ্ছি এটা তার শুরু, এটা হল উৎপাদনী কর্মশালা…’
কনস্তান্তিন বড় একটা শুনছিলেনই না। ভাইয়ের পীড়িত ক্ষয়রোগগ্রস্ত মুখের দিকে তাকিয়ে কষ্ট হচ্ছিল তাঁর। উৎপাদনী কর্মশালা নিয়ে ভাই যা বলছে সেটা শুনে যেতে পারছিলেন না তিনি। বোঝা যাচ্ছিল ঐ কর্মশালা হল শুধু তার আত্মগ্লানি থেকে বাঁচার শেষ ভরসা। নিকোলাই লেভিন বলে চলল :
‘কি জানো, পুঁজি দলন করছে মেহনতীদের—আমাদের মেহনতীরা, চাষীরা খাটুনির সব কষ্ট সইছে, আর এমন অবস্থায় আছে যে যতই খাটুক, জান্তব দশা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। তাদের রোজগারের যেটুকু লাভ থেকে তারা নিজেদের অবস্থা উন্নত করতে, খানিকটা অবকাশ আর তার ফলে শিক্ষা পেতে পারত, বাড়তি এই সমস্ত রোজগারটা তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছে পুঁজিপতিরা। আর সমাজটা এমন ভাবে গড়ে উঠেছে যে যতই তারা খাটবে ততই লাভ হবে বেনিয়াদের, জমিদারদের আর ওরা সব সময়ই থাকবে ভারবাহী পশু। এই ব্যবস্থাটা বদলে দেওয়া দরকার’, এই বলে শেষ করে সে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইল ভাইয়ের দিকে।
‘সে তো বটেই’, ভাইয়ের হাড় বেরিয়ে আসা গালের ওপর রক্তিমাভা ফুটতে দেখে কনস্তান্তিন বললেন।
‘তাই আমরা একটা কামারশালা খুলছি, সেখানে তৈরি সমস্ত মাল, আর লাভ, আর প্রধান কথা উৎপাদনের যা হাতিয়ার তার মালিক হবে সকলেই।’
কনস্তান্তিন লেভিন বললেন, কামারশালাটা হবে কোথায়?’
‘কাজান গুবের্নিয়ার ভদ্রেম গ্রামে।’
‘কিন্তু গ্রামে কেন? আমার মনে হয় গ্রামে এমনিতেই কাজ প্রচুর। কামারশালা, তা গ্রামে কেন?’
‘কারণ চাষীরা এখন আগের মতই গোলাম, আর এই গোলামি থেকে তাদের উদ্ধার করতে চাওয়া হচ্ছে, এটা তোমার আর কনিশেভের কাছে প্রীতিকর নয়’, আপত্তিতে বিরক্ত হয়ে বলল নিকোলাই লেভিন।
এই সময় নিরানন্দ নোংরা ঘরখানার দিকে তাকিয়ে কনস্তান্তিন লেভিন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাতে যেন আরো চটে উঠল নিকোলাই।
‘তোমার আর সের্গেই ইভানিচের অভিজাত দৃষ্টিভঙ্গি আমার জানা। জানি যে তার সমস্ত মেধাশক্তি সে কাজে লাগায় বর্তমান অভিশাপটাকে ন্যায্য প্রতিপন্ন করার জন্য।’
‘আরে না, সের্গেই ইভানিচের কথা তুলছ কেন?’ হেসে লেভিন বললেন।
‘সের্গেই ইভানিচ? তাহলে শোনো!’ সের্গেই ইভানিচের উল্লেখে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল নিকোলাই লেভিন, ‘শোনো কেন… যাকগে, বলার কি আছে? শুধু একটা কথা… আমার কাছে তুমি এলে কেন? তুমি এটা ঘৃণা কর তা বেশ, বেরিয়ে ভালোয় ভালোয় যাও!’ টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে চেঁচাল সে, ‘বেরিয়ে যাও, বেরিয়ে যাও!’
‘একটুও ঘৃণা করি না আমি’, ভয়ে ভয়ে বললেন কনস্তান্তিন লেভিন, ‘এমন কি আমি তর্কও করছি না।’
এই সময় ফিরল মারিয়া নিকোলায়েভনা। সক্রোধে নিকোলাই লেভিন চাইলে তার দিকে। দ্রুত তার কাছে এসে ফিসফিসিয়ে কি যেন সে বলল।
শান্ত হয়ে ভারি ভারি নিঃশ্বাস ফেলে নিকোলাই লেভিন বলল, ‘আমি অসুস্থ, মেজাজ হয়েছে খিটখিটে। তার ওপর তুমি আবার বলছ সের্গেই ইভানিচ আর তার প্রবন্ধের কথা। এ একেবারে ছাইভস্ম, মিথ্যে কথা, আত্মপ্রতারণা। ন্যায় যে লোক দেখে নি সে কি লিখতে পারে তার কথা? ওর প্রবন্ধ আপনি পড়েছেন?’ সে জিজ্ঞেস করল ক্রিৎস্কিকে, আবার টেবিলের কাছে বসে তার অর্ধেকটায় ছড়িয়ে থাকা সিগারেটের টুকরোগুলো সরিয়ে জায়গা করতে করতে সে বলল।
‘না, পড়িনি’, বাজার মুখে বললেন ক্রিৎস্কি, বোঝা যায় আলোচনায় যোগ দেবার বাসনা তাঁর নেই।
‘কেন পড়েন নি?’ এবার ক্রিৎস্কির ওপরেই বিরক্ত হয়ে নিকোলাই লেভিন জিজ্ঞেস করল।
‘কারণ ও নিয়ে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।’
‘মাপ করবেন, সময় নষ্ট হবে জানলেন কোত্থেকে? অনেকের কাছে প্রবন্ধটা দুর্বোধ্য, মানে তাদের নাগালের বাইরে। কিন্তু আমার ব্যাপারটা ভিন্ন, আমি ওর ভাবনার তল পর্যন্ত দেখতে পাই, জানি কোথায় এর দুর্বলতা।’
সবাই চুপ করে রইলেন। ধীরে ধীরে উঠে টুপি নিলেন ক্রিৎস্কি।
‘খেয়ে যাবেন না? তাহলে আসুন। কাল কামারকে নিয়ে আসবেন কিন্তু।’
ক্রিৎস্কি বেরিয়ে যেতেই নিকোলাই লেভিন হেসে চোখ মটকাল।
বলল, ‘ওর অবস্থাও কাহিল, আমি তো দেখতে পাচ্ছি…’
কিন্তু এই সময় দরজার ওপাশ থেকে ক্রিৎস্কি ডাকলেন তাকে।
‘আবার কি দরকার পড়ল?’ এই বলে নিকোলাই করিডরে গেল তাঁর কাছে। একা রইলেন মারিয়া নিকোলায়েভনা আর লেভিন। কনস্তান্তিন তাকে বললেন : ‘আমার ভাইয়ের সাথে আপনি আছেন কত দিন?’
মারিয়া বলল, ‘এই দ্বিতীয় বছর। স্বাস্থ্য ওঁর ভারি ভেঙে পড়েছে। মদ খান প্রচুর।’
‘মানে, কি খায়?’
‘ভোদ্কা। আর সেটা ওঁর পক্ষে ক্ষতিকর।’
‘সত্যিই অনেক খায় কি?’ ফিসফিসিয়ে বললেন লেভিন।
© 2023 BnBoi - All Right Reserved
© 2023 BnBoi - All Right Reserved