লেভিনের জিজ্ঞাসার জবাবে খানসামা বলল, ‘ওপরে, বারো আর তেরো নম্বর কামরা।’
‘ঘরে আছে?’
‘থাকার কথা।’
বারো নম্বরের দরজা আধ-খোলা, সেখান থেকে এক ফালি আলোর মধ্যে আসছিল কদর্য আর দুর্বল তামাকের ধোঁয়া, শোনা যাচ্ছিল লেভিনের কাছে অপরিচিত একটা কণ্ঠস্বর; কিন্তু তখনই লেভিন টের পেলেন যে ভাই এখানেই; তার কাশি শোনা গেল।
যখন তিনি দরজায় ঢুকলেন, অপরিচিত কণ্ঠস্বর বলছিল : ‘কতটা বিচক্ষণতা আর সচেতনতার সাথে ব্যাপারটা চালানো হবে তার ওপরেই সব নির্ভর করছে।’
ঘরে উঁকি দিলেন কনস্তান্তিন লেভিন, দেখলেন কথা বলছেন একটা যুবক, একমাথা তাঁর চুল, গায়ে সাবেকী ধাঁচের রুশী কোট। একটা মেয়ে বসে আছে সোফায়, মুখে বসন্তের দাগ, উলের পোশাকটায় কফ নেই, কলারও সাদামাটা। ভাইকে দেখা যাচ্ছিল না। কনস্তান্তিনের বুক টনটন করে উঠল এই ভেবে যে, ভাই তার দিন কাটাচ্ছে কি- সব অনাত্মীয় লোকদের মাঝে। কেউ কনস্তান্তিনের আসার শব্দ শুনতে পায়নি, তিনিও তাঁর ওভার-স্যু খুলতে খুলতে শুনতে লাগলেন রুশী কোট পরা ভদ্রলোকটি কি বলছেন। কথা হচ্ছিল কি-একটা উদ্যোগ নিয়ে।
‘চুলোয় যাক এসব সুবিধাভোগী শ্রেণী’, কাশির মধ্যে শোনা গেল ভাইয়ের গলা, ‘মাশা, রাতের খাবার কিছু জোগাড় কর তো আমাদের জন্য। আর মদ দাও যদি থেকে থাকে, নইলে লোক পাঠাও।’
মেয়েটা উঠে পার্টিশনের ওপাশে যেতেই দেখতে পেল কনস্তান্তিনকে।
বলল, ‘কে একজন ভদ্রলোক, নিকোলাই দমিত্রিচ।’
নিকোলাই লেভিনের রাগত কণ্ঠ শোনা গেল, ‘কাকে চাই?’
আলোয় এসে কনস্তান্তিন লেভিন বললেন, ‘আমি এসেছি!’
‘আমি-টা কে?’ আরো রাগত শোনাল নিকোলাইয়ের গলা। শব্দ শুনে বোঝা গেল কিছু-একটাতে ধাক্কা খেয়ে ঝট করে উঠে দাঁড়িয়েছে সে, দরজায় লেভিন দেখলেন অতি পরিচিত তবু বন্যতায় আর রুগ্নতায় স্তম্ভিত করার মত তাঁর ভাইয়ের বিশাল, শীর্ণ, কুজো হয়ে আসা মূর্তি, বড় বড় চোখে ভীতি 1
তিন বছর আগে কনস্তান্তিন লেভিন যখন তাকে শেষ বার দেখেন, তার চেয়েও এখন সে রোগা। গায়ে একটা খাটো জ্যাকেট। হাত আর চওড়া হাড়গুলো মনে হচ্ছিল আরো বিরাট। চুল পাতলা হয়ে এসেছে, সেই একই সোজা মোচ ঝুলে পড়েছে ঠোঁটের ওপর, সেই একই চোখ বিচিত্র আর সরল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আগন্তুকের দিকে।
‘আরে কস্তিয়া যে’, ভাইকে চিনতে পেরে হঠাৎ বলে উঠল সে, চোখ তার জ্বলজ্বল করে উঠল আনন্দে। কিন্তু সেই মুহূর্তেই সে তাকাল যুবকটির দিকে এবং মাথা আর ঘাড়ের এমন একটা ঝটকা-মারা ভঙ্গি করল যেন টাই এঁটে বসেছে, ভঙ্গিটা কনস্তান্তিনের অতি পরিচিত; একেবারেই অন্য একটা রুক্ষ, আর্ত, নিষ্ঠুর ভাব ফুটে রইল তার রোগাটে মুখে।
‘আপনাকে আর সের্গেই ইভানিচকে, দুজনকেই লিখেছিলাম যে আপনাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, সম্পর্ক রাখতেও চাই না। কি তোমার, কি আপনার দরকার পড়ল?’
কনস্তান্তিন যা কল্পনা করেছিলেন, সে মানুষ ভাই একেবারেই নয়। তার কথা ভাবার সময় তার চরিত্রের সবচেয়ে কষ্টকর আর খারাপ দিক, যার জন্য তার সাথে কথা বলা এত কঠিন হয়ে ওঠে, কনস্তান্তিন তা ভুলে গিয়েছিলেন। এখন তার মুখ, বিশেষ করে এই ঝটকা-মারা মাথা ফেরানো দেখে সে সবই মনে পড়ে গেল তাঁর।
ভয়ে ভয়ে বললেন, ‘কোন দরকারে আসিনি। শুধু তোমাকে দেখার ইচ্ছে হয়েছিল।’
ভাইয়ের ভয় দেখে স্পষ্টতই নরম হয়ে এল নিকোলাই। ঠোঁট কেঁপে উঠল তার। বলল, ‘ওঃ, এমনি এসেছ? ভেতর এস, বস। রাতের খাবার খেয়ে যাবে? মাথা, তিন প্লেট খাবার এনো। আচ্ছা থাক, দাঁড়াও। জান, ইনি কে?’ রুশ কোট পরা ভদ্রলোককে দেখিয়ে সে বলল ভাইকে, ‘ইনি ক্রিৎস্কি, কিয়েভে থাকতেই আমার বন্ধু। অতি অসামান্য লোক। বলাই বাহুল্য, পুলিশ ওঁর পেছনে লেগেছে, কেননা উনি বদমাশ নন।’
এবং নিজের অভ্যাসমত ঘরের সব লোকদের দিকে তাকাল সে। দরজার কাছে যে মেয়েটা দাঁড়িয়ে ছিল, সে যাবার উপক্রম করছে দেখে চেঁচিয়ে উঠল, ‘আমি যে বললাম, দাঁড়াও।’ তারপর কনস্তান্তিনের যা ভালোই জানা, কথাবার্তা চালাবার সেই অক্ষমতা, সেই আনাড়ীপনায় সবার দিকে আরেক বার তাকিয়ে ভাইকে বলতে লাগল ক্রিৎস্কির কাহিনী : দরিদ্র ছাত্রদের জন্য সাহায্য সমিতি আর রবিবারের স্কুল চালাবার জন্য কেমন করে তিনি বিতাড়িত হন বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে, তারপর তিনি হন গ্রাম্য স্কুলের একজন মাস্টার, অবশেষে কি কারণে যেন সোপর্দ হন আদালতে।
‘আপনি কিয়েভ ইউনিভার্সিটির ছাত্র?’ একটা অস্বস্তিকর নীরবতা দেখা দেওয়ায় সেটা দূর করার জন্য ক্রিৎস্কিকে জিজ্ঞেস করলেন কনস্তান্তিন লেভিন।
‘হ্যাঁ, ছিলাম কিয়েভে’, ভুরু কুঁচকে ক্রুদ্ধ স্বরে বললেন ক্রিৎস্কি।
ভাইকে বাধা দিয়ে মেয়েটাকে দেখিয়ে নিকোলাই লেভিন বলল, ‘আর এই মেয়েটা আমার জীবনসঙ্গিনী, মারিয়া নিকোলায়েভনা। আমি ওকে এনেছি গণিকালয় থেকে’, এ কথা বলার সময় সে ঘাড় ঝাঁকাল, ‘কিন্তু ওকে ভালোবাসি, মান্য করি, আর আমার বন্ধুত্ব যারা চায়’, গলা চড়িয়ে ভুরু কুঁচকে সে যোগ করল, ‘তাদের সবার কাছে অনুরোধ করি ওকে ভালোবাসতে, মান্য করতে। যাই হোক না কেন, ও আমার স্ত্রী, যে যাই বলুক। তাহলে এবার জানলে তো কাদের নিয়ে ব্যাপার। আর যদি তোমার মনে হয় যে হেয় হয়ে যাচ্ছ, তাহলে পথ দেখো, দরজা খোলা।’
