কিটি মনে মনে ভাবলে, ‘হ্যাঁ। বিজাতীয়, দানবিক আর সুমধুর কি-একটা আছে ওঁর মধ্যে।’ নৈশাহারের জন্য থেকে যাবার ইচ্ছে ছিল না আন্নার, কিন্তু গৃহকর্তা পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন।
‘হয়েছে, হয়েছে আন্না আর্কাদিয়েভনা’, আন্নার অনাবৃত একটা হাত বগলদাবা করে কর্সনস্কি বললেন, ‘কতিলিওন নিয়ে চমৎকার একটা আইডিয়া আছে আমার! অপূর্ব!’
তিনি আন্নাকে টেনে আনার চেষ্টা করে খানিকটা এগুলেন। অনুমোদনের হাসি হাসলেন গৃহকর্তা।
‘না, আমি থাকব না’, হেসে আন্না জবাব দিলেন; কিন্তু সে হাসি সত্ত্বেও যেরকম দৃঢ়কণ্ঠে তাঁর জবাবটা হয়েছিল, তাতে গৃহকর্তা আর কর্সুনস্কি দুজনেই বুঝলেন যে আন্না থাকবেন না।
‘না, পিটার্সবুর্গে সারা শীতকালে যত না নেচেছি, মস্কোয় আপনাদের এই একটা আসরেই নাচলাম তার চেয়ে বেশি’, কাছেই দণ্ডায়মান ভ্রন্স্কির দিকে তাকিয়ে আন্না বললেন, ‘রওনা দেবার আগে খানিকটা বিশ্রাম দরকার।’
ভ্রন্স্কি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কালই চলে যাচ্ছেন নাকি—সত্যি করে?’
আন্না জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, তাই ভেবেছি’, যেন প্রশ্নের এই সাহসিকতার বিস্মিত হয়েই; কিন্তু এ কথা বলার সময় চোখের দপদপে অদম্য ঝলক আর হাসিটা পুড়িয়ে দিয়ে গেল ভ্রন্স্কিকে।
আন্না আর্কাদিয়েভনা চলে গেলেন, রাতের খাবারের জন্য রইলেন না।
চব্বিশ
শ্যেরবাৎস্কিদের ওখান থেকে বেরিয়ে আসার সময় লেভিন মনে মনে ভাবছিলেন, ‘হ্যাঁ, আমার মধ্যে বিছুছিরি, অরুচিকর কিছু-একটা আছে’, ভাইয়ের কাছে তিনি রওনা দিলেন পায়ে হেঁটেই, ‘আমার সাথে অন্য লোকের বনে না। বলে, আমি নাকি অহংকরী। না, আমার অহংকারটুকুও নেই। অহংকার থাকলে নিজেকে অমন অবস্থায় ফেলতাম না আমি।’ ভ্রন্স্কির কথা মনে হল তাঁর—সুখী, সহৃদয়, বুদ্ধিমান, প্রশান্ত সে সন্ধ্যায় তিনি যে ভয়াবহ অবস্থায় পড়েছিলেন, ভ্রন্স্কি নিশ্চয় কখনো তাকে পড়েননি। ‘হ্যাঁ, কিটির ওঁকেই পছন্দ হওয়া কথা। সেটাই উচিত, কারো ওপর, কিছুর বিরুদ্ধে আমার নালিশ নেই। আমার নিজেরই দোষ। আমার জীবনের সাথে সে তার জীবন মেলাতে চাইবে, এ কথা ভাবার কি অধিকার ছিল আমার? কে আমি? কিই-বা আমি? নগণ্য একটা লোক, আমাকে কারো প্রয়োজন নেই।’ নিকোলাই ভাইয়ের কথা মনে পড়ল তাঁর এবং সানন্দে সেই চিন্তায় ডুবে গেলেন। ‘দুনিয়ার সব কিছুই খারাপ আর জঘন্য ওর এই কথা কি সত্যি নয়? নিকোলাই ভাই সম্পর্কে বড় একটা ন্যায়বিচার আমরা করছি না এবং করিনি। অবশ্য প্রকোফি, যে ওকে দেখেছিল ছেঁড়া কোটে, মাতাল অবস্থায়, তার চোখে ও একটা ঘৃণার্হ লোক। কিন্তু আমি তো তাকে অন্যরকম জানি। আমি ওর প্রাণটা চিনি, জানি যে আমি ওরই মত। আর আমি ওর খোঁজে যাওয়ার বদলে গেলাম ডিনার খেতে, তারপর এলাম এখানে।’ লেভিন একটা লাইট পোস্টের কাছে গিয়ে ভাইয়ের ঠিকানাটা পড়লেন, সেটা ছিল তাঁর মানি-ব্যাগের মধ্যে। তারপর একটা গাড়ি ডেকে নিকোলাই ভাইয়ের জীবনের যেসব ঘটনা তাঁর জানা ছিল তা স্মরণ করতে লাগলেন ভাইয়ের জীবনের যে সব ঘটনা তাঁর জানা ছিল তা স্মরণ করতে লাগলেন ভাইয়ের কাছে যাবার লম্বা রাস্তাটায়। মনে পড়ল, বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং তার পরের বছরটা বন্ধুবান্ধবদের উপহাস অগ্রাহ্য করে সে দিন কাটিয়েছে সন্ন্যাসীর মত, কঠোরভাবে মেনে চলেছে ধর্মের সমস্ত ক্রিয়াকর্ম, উপাসনা, উপবাস, পরিহার করেছে সমস্ত ভোগসুখ, বিশেষ করে রমণীদের; তারপর হঠাৎ তার ধৈর্য টুটল, গিয়ে পড়ল অতি ইতর সব লোকেদের সাহচর্যে, শুরু করল অতি বল্গাহীন বেলেল্লাপনা। সেই ছেলেটির কথা স্মরণ হল তাঁর, লালনপালন করবে বলে যাকে সে এনেছিল গ্রাম থেকে আর রাগের মাথায় এমন তাকে পিটিয়েছিল যে অঙ্গহানির দায়ে ব্যাপারটা গড়ায় আদালতে। তারপর মনে পড়ল ঠগ খেলোয়াড়টার ঘটনা, যার কাছে সে তাসে হারে, একটা হুন্ডিও লিখে দেয়, তারপর নিজেই তার বিরুদ্ধে এই বলে নালিশ করে যে লোকটা তাকে ঠকিয়েছে। (সের্গেই ইভানিচ যা শোধ দেন, এটা সেই টাকা।) মনে পড়ল, হৈ-হাঙ্গামার জন্য তার এক রাত্রি হাজত বাসের কথা। ভাই কনিশেভ নাকি তার মায়ের সম্পত্তির অংশ দেননি, এই বলে তাঁর বিরুদ্ধে লজ্জাকর মোকদ্দমার কথাটাও মনে এল। আর শেষ ঘটনাটা হল সে যখন পশ্চিম প্রদেশে চাকরিতে যায়, ‘সেখানে গ্রাম মাতব্বরকে মারপিট করার জন্য সোপর্দ হয় আদালতে। এ সবই ভয়ানক জঘন্য, কিন্তু নিকোলাই লেভিনকে যারা জানত না, জানত না তার ইতিহাস, তার অন্তঃকরণ, তাদের কাছে যতটা জঘন্য লাগার কথা, লেভিনের কাছে মোটেই সেরকম মনে হল না।
লেভিনের মনে পড়ল, নিকোলাই যখন ছিল ধার্মিকতা, উপবাস, সাধুসন্ন্যাসী, গির্জায় উপাসনার পর্বে, যখন সে সাহায্য, তার উদ্দাম স্বভাবকে বেঁধে রাখার বল্লা খুঁজছিল ধর্মে, তখন কেউ তাকে সমর্থন তো করেইনি, বরং সবাই, সে নিজেও হাসাহাসি করেছে তাকে নিয়ে। লোকে টিটকারি দিয়েছে তাকে, বলেছে ‘নোয়া’, সন্ন্যাসী, আর যখন তার বাঁধন ছিঁড়ল, কেউ তাকে সাহায্য করেনি, মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে আতঙ্কে, ঘৃণায়।
লেভিন অনুভব করছিলেন যে জীবনের সব কিছু কদর্যতা সত্ত্বেও নিকোলাই ভাই মনেপ্রাণে, তার অন্তরের গভীরে তাদের চেয়ে বেশি অসৎ নয় যারা তাকে ঘৃণা করে। ও যে একটা উদ্দাম চরিত্র আর কিসে যেন বিড়ম্বিত মানসিকতা নিয়ে জন্মেছে সেটা তো তার দোষ নয়। তবু সব সময় ও ভালো হতে চেয়েছে। ‘সব কিছু বলব তাকে, সব কিছু বলতে বাধ্য করব ওকে, দেখাব যে আমি ওকে ভালোবাসি, তাই ওকে বুঝি’, রাত এগারোটায় ঠিকানায় লেখা হোটেলটার দিকে যেতে যেতে লেভিন এই স্থির করলেন মনে মনে।
