দুজনের সাধারণ পরিচিতদের নিয়ে কথা বলছিলেন তাঁরা, একান্ত অকিঞ্চিৎকর আলাপ, কিন্তু কিটির মনে হল তাঁদের প্রতিটা কথাতেই তাঁদের ও কিটির ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে। এবং এটা আশ্চর্য যে সত্যিই তাঁরা বলাবলি করছিলেন ইভান ইভানোভিচের ফরাসি বুকনি কি হাস্যকর এবং এলেৎস্কায়ার জন্য আরো ভালো বর জোটানো যেত, অথচ এসব কথাই তাৎপর্যময় হয়ে উঠছে তাঁদের কাছে আর কিটির মত তাঁরাও সেটা টের পাচ্ছেন। এখন বলনাচের গোটা আসর, সমস্ত উঁচু সমাজ, সবই কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল কিটির অন্তরে, শুধু শীলতার যে কঠোর বিদ্যালয়ের মধ্যে দিয়ে সে গেছে, সেটাই ধরে রাখছিল তাকে, বাধ্য করছিল তার কাছে যা প্রত্যাশা সেটা করতে, যথা, নাচা, প্রশ্নের জবাব দেওয়া, এমন কি হাসাও। কিন্তু ঠিক মাজুরকা শুরুর আগে যখন চেয়ারগুলো ঠিক করে রাখা হল, কিছু কিছু জুটি সরে গেল ছোটটা থেকে বড় হলঘরে, হতাশা আর আতংকের মুহূর্ত এল কিটির সামনে। পাঁচজনের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে কিটি এবং এখন সে আর, কেননা উঁচু সমাজে তার সাফল্য খুবই বেশি, এখনো পর্যন্ত সে আমন্ত্ৰণ পায়নি, এমন কথা ভাবতেই পারেনি কেউ। সে অসুস্থ, মাকে এই কথা বলে বাড়ি চলে যাওয়াই উচিত ছিল তার, কিন্তু সেটুকু ক্ষমতাও তার ছিল না। একেবারে বিধ্বস্ত বলে তার মনে হচ্ছিল নিজেকে।
ছোট ড্রয়িং-রুমটার নিভৃতে গিয়ে সে বসে পড়ল একটা ইজি-চেয়ারে। তার তন্বী দেহ ঘিরে মেঘের মত ভেসে উঠল পোশাকের হাওয়াই স্কার্ট; বালিকার মত শীর্ণ, কমনীয়, অনাবৃত, শক্তিহীন একটা বাহু ডুবে গেল গোলাপি পোশাকের ভাঁজের মধ্যে; অন্য হাতটায় পাখা নিয়ে ছোট ছোট ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে হাওয়া করতে লাগল তার আতপ্ত মুখমণ্ডলে। কিন্তু সবে ঘাসের ওপর গিয়ে বসেছে, এখনই রংধনু ডানা মেলে ফরফর করে উঠবে এমন এক প্রজাপতির মত দেখালেও ভয়ংকর এক হতাশায় ভেঙে যাচ্ছিল তার বুক।
‘আর হয়ত ভুল হয়েছে আমার, অমন কিছু ঘটেনি?’
যা দেখেছে সেটা আবার মনে মনে স্মরণ করতে চাইল সে।
‘কিটি, এ আবার কি? গালিচার ওপর দিয়ে নিঃশব্দে তার কাছে এসে বললেন কাউন্টেস নক্স্টন, ‘এ আমি বুঝতে পারছি না।’
কিটির নিচের ঠোঁট কেঁপে উঠল, তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল সে।
‘কিটি, মাজুরকা নাচ্ছ না তুমি?’
‘না’, অশ্রুতে কম্পমান কণ্ঠে কিটি বলল।
‘আমার সামনেই ওকে সে মাজুরকা নাচে ডাকল’, নষ্টন বললেন, ‘কে ‘ও’ আর কে ‘সে’, এটা কিটি বুঝবে বলে তাঁর জানাই ছিল। ‘ও বলল : কেন, প্রিন্সেস শ্যেরবাৎস্কায়ার সাথে নাচবেন না আপনি?’
কিটি বলল, ‘আহ্, ওতে আমার কিছু এসে যায় না!
কিটি নিজে ছাড়া আর কেউ বুঝছিল না তার অবস্থা, কেউ জানত না যে এই সেদিন সে একজনকে প্রত্যাখ্যান করেছে যাকে হয়ত সে ভালোই বাসতো এবং প্রত্যাখ্যান করেছে, কারণ বিশ্বাস করছিল অন্য একজনকে।
কর্সুনস্কিকে পাকড়াও করে তাঁর সাথে মাজুরকা নেচে কাউন্টেস নস্টন তাঁকে বললেন তিনি যেন কিটিকে নাচে ডাকেন।
কিটি নাচল প্রথম জুটিতে। সৌভাগ্যবশত কথা বলার প্রয়োজন তার ছিল না, কেননা, কর্মুনস্কি অনবরত ছোটাছুটি করে তাঁর কর্তৃত্ব ঠিক রাখছিলেন। ভ্রন্স্কি আর আন্না বসেছিলেন একেবারে প্রায় তার সামনেই। তাঁদের সে দেখেছিল তার দূরের দৃষ্টিতে, দেখেছিল কাছ থেকেও যখন জুটিতে জুটিতে তাঁরা মুখোমুখি হন, আর যত বেশি দেখল ততই সে নিঃসন্দেহ হয়ে উঠল যে তার দুর্ভাগ্য ঘটে গেছে, সে দেখল যে জনাকীর্ণ এই হলে নিজেদের একলা করে নিয়েছেন তাঁরা। ভ্রন্স্কির যে মুখভাবে সব সময়ই থাকত অমন একটা দৃঢ়তা আর স্বাধীনতার ছাপ, সেখানে কিটিকে বিমূঢ় করে দেখা দিয়েছে কেমন একটা অসহায়তা আর বশ্যতা, দোষ করলে বুদ্ধিমান কুকুরের মুখে যা ফুটে ওঠে।
আন্না হাসছিলেন, সে হাসি সঞ্চারিত হচ্ছিল তাঁর মধ্যেও। কিছু-একটা ভাবনা পেয়ে বসছিল আন্নাকে, অস্কিও হয়ে উঠছিলেন গুরুগম্ভীর। কি-একটা অপ্রাকৃত শক্তি কিটির চোখ টেনে ধরছিল আন্নার মুখে দিকে। নিজের সাধারণ কালো পোশাকে আন্না অপরূপ, অপরূপ তাঁর ব্রেসলেট-শোভিত পুরুষ্টু হাত, অপরূপ তাঁর মুক্তার মালা পরা দৃঢ় গ্রীবা, অপরূপ তাঁর কবরী এলোমেলো করা কুঞ্চিত কেশদাম, অপরূপ তাঁর ছোট ছোট পা আর হাতে ললিত লঘু গতি, সজীবতায় সুন্দর তাঁর মুখখানা অপরূপ; কিন্তু এই অপরূপতার মধ্যে ভয়াবহ, নিষ্ঠুর কিছু-একটাও যেন ছিল।
আগের চেয়েও কিটি মুগ্ধ হল তাঁর রূপে, আর ক্রমে কষ্ট পেতে লাগল বেশি করে। নিজেকে দলিত মনে হল তার, সেটা ফুটে উঠল তার মুখভাবে। মাজুরকা নাচে মুখোমুখি হয়ে ভ্রন্স্কি যখন তাকে দেখতে পান, চট করে চিনে উঠতে পারেননি—এতই বদলে গিয়েছিল কিটি!
‘চমৎকার নাচের আসর’, ভ্রন্স্কি বললেন কিছু-একটা বলতে হয় বলে।
কিটি বলল, ‘হ্যাঁ।’
মাজুরকার মাঝামাঝি কর্সুনস্কি উদ্ভাবিত একটা জটিল নৃত্যভঙ্গিমা অনুসরণ করে আন্না চলে এলেন বৃত্তের মাঝখানে, দুজন নৃত্য-সহচরকে নিয়ে একজন মহিলা আর কিটিকে ডাকলেন নিজের কাছে। যেতে যেতে কিটি ভীত চোখে তাকাল তাঁর দিকে। আন্না চোখ কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে আর হেসে চাপ দিলেন তার হাতে। কিন্তু কিটি মুখে শুধু একটা হতাশা আর বিস্ময়ের ভাব ফুটিয়ে সে হাসির প্রত্যুত্তর দিল দেখে আন্না তার কাছ থেকে সরে অন্য মহিলার সাথে খুশির আলাপ জুড়লেন।
