আন্না বললেন, ‘পারা গেলে আমি নাচি না।’
কর্সুনস্কি জবাব দিলেন, ‘কিন্তু আজকে ওটি চলবে না।’
এই সময় এগিয়ে এলেন ভ্রন্স্কি।
‘তা আজকে যখন না নাচলে চলবে না, তখন চলুন’, ভ্রন্স্কির অভিবাদন খেয়াল না করে আন্না বললেন এবং দ্রুত হাত রাখলেন কর্মুনস্কির কাঁধে।
ভ্রন্স্কির অভিবাদনের প্রত্যুত্তর আন্না ইচ্ছে করে দিলেন না, এটা লক্ষ্য করে কিটি ভাবলে, ‘কেন ওর ওপর উনি অসন্তুষ্ট?’ ভ্রন্স্কি কিটির কাছে এসে প্রথম কোয়াড্রিলের কথাটা মনে করিয়ে দিলেন এবং এই কয়দিন তাকে দেখার আনন্দলাভ ঘটেনি বলে দুঃখ প্রকাশ করলেন। আন্নার ওয়াজ নাচ কিটি দেখছিল মুগ্ধ হয়ে আর শুনে যাচ্ছিল ভ্রন্স্কির কথা। ভ্রন্স্কি তাকে নাচতে ডাকবেন বলে অপেক্ষা করছিল কিটি, কিন্তু উনি ডাকলেন না, অবাক হয়ে কিটি তাকাল তাঁর দিকে। ভ্রন্স্কি লাল হয়ে উঠে তাড়াতাড়ি করে তাকে আমন্ত্রণ জানালেন কিন্তু তার ক্ষীণ কটি জড়িয়ে ধরে প্রস্কি নাচ শুরু করতেই হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল সঙ্গীত। ভ্রন্স্কির মুখ ছিল কিটির একেবারে কাছে, সেদিকে তাকাল কিটি এবং ভালোবাসায় ভরপুর এই যে দৃষ্টিতে সে ভ্রন্স্কির দিকে তাকিয়ে ছিল ভ্রন্স্কি যার প্রতিদান দেননি, সেটা পরে অনেক দিন, বেদনার্ত লজ্জায় তার হৃদয় ক্ষতবিক্ষত করেছে, কয়েক বছর পরেও।
‘Pardon, pardon! ওয়াজ, ওয়াজ হোক!’ হলের অন্য প্রান্ত থেকে চেঁচিয়ে উঠলেন কর্সুনস্কি এবং নাচ শুরু করে দিলেন—সামনে যে ললনাকে প্রথম পেলেন তাকে নিয়েই।
তেইশ
ভ্রন্স্কি কয়েক পালা ওয়াজ নাচলেন কিটিকে নিয়ে। এর পর কিটি মায়ের কাছে এসে নস্টনের সাথে কয়েকটা কথা বলতে-না-বলতেই ভ্রন্স্কি এলেন প্রথম কোয়াড্রিলের জন্য। কোয়াড্রিল নাচের সময় উল্লেখযোগ্য কোন কথা হল না, ছেঁড়া ছেঁড়া আলাপ চলল কখনো কর্সুনস্কি দম্পতিকে নিয়ে, যাদেরকে তিনি ভারি মজা করে বলেছিলেন চল্লিশ বছরে মিষ্টি শিশু, কখনো ভবিষ্যৎ সাধারণ রঙ্গালয় নিয়ে; শুধু একবার আলাপটা কিটিকে খুব বিচলিত করেছিল যখন লেভিনের কথা জিজ্ঞেস করেন ভ্রন্স্কি, এখানে সে আছে কিনা এবং যোগ দেন যে লোকটিকে তাঁর খুব ভালো লেগেছে। কিন্তু কোয়াড্রিল নাচ থেকে কিটির বেশি কিছু প্রত্যাশা ছিল না। দুরুদুরু বুকে সে অপেক্ষা করছিল মাজুরকা নাচের। তার মনে হয়েছিল মাজুরকাতেই সব সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে। কোয়াড্রিল নাচের সময় উনি যে মাজুরকার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন না, তাতে কোন দুশ্চিন্তা হয়নি তার। আগেকার বলনাচগুলোর মত সে যে ওঁর সাথেই মাজুরকা নাচবে তাকে কোন সন্দেহ ছিল না কিটির, নাচছে বলে পাঁচজনের মাজুরকা আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করল সে। শেষ কোয়াড্রিল পর্যন্ত কিটির কাছে গোটা আসরটা ছিল আনন্দঘন বর্ণ, ধ্বনি আর গতির এক ঐন্দ্রজালিক স্বপ্ন। যখন বড় বেশি সে ক্লান্ত বোধ করে বিশ্রাম চায়, তখনই কেবল সে নাচেনি। কিন্তু নীরস যে তরুণটিকে প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব ছিল না, তার সাথে শেষ কোয়াড্রিল নাচের সময় সে পড়ে গেল ভ্রন্স্কি আর আন্নার মুখোমুখি। একেবারে সেই আসার পর থেকে সে আন্নার কাছাকাছি আর থাকেনি, এখন হঠাৎ তাঁকে দেখল আবার একটা নতুন, অপ্রত্যাশিত রূপে। সাফল্যজনিত উত্তেজনার যে চেহারাটা তার নিজের কাছেই অতি পরিচিত, সেটা সে দেখল আন্নার মধ্যে। যে উল্লাস তিনি সঞ্চার করেছেন তার মদিরায় আন্না মাতাল। এই অনুভূতিটা কিটির জানা, চেনে সে তার লক্ষণগুলোকে, তা সে দেখতে পেল আন্নার মধ্যে, দেখল চোখে ঝলকে ওঠা কাঁপা কাঁপা ছটা, সুখ আর উত্তেজনার হাসিতে আপনা থেকে বেঁকে যাওয়া ঠোঁট, গতির সুপ্রকট সৌষ্ঠব, যথার্থ আর লঘুতা।
সে মনে মনে ভাবল, ‘কে সে? সবাই, নাকি একজন?’ যে বেচারী ছোকরার সাথে সে নাচছিল কথোপকথনের খেই হারিয়ে ফেলে সে আর তা খুঁজে পাচ্ছিল না। কর্মুনস্কি সবাইকে কখনো বৃহৎ বৃত্ত’, কখনো-বা ‘শেকল’ নাচাচ্ছিল, বাহ্যত তাঁর ফুর্তিবাজ উচ্চকণ্ঠ আদেশ মেনে চলছিল কিটি। কথাবার্তায় ছোকরাকে কোন সাহায্য না করে কিটি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল, ক্রমেই হিম হয়ে আসছিল তার বুক। ‘না, জনতার উচ্ছ্বাসে আন্না মাতাল হননি, এ শুধু একজনের প্রশংসা। এই কি সেই একজন? ভ্রন্স্কিই কি?’ প্রতি বার আন্নার সাথে তিনি যখন কথা বলছিলেন, আন্নার চোখে ঝলক দিচ্ছিল আনন্দের ছটা, সুখের হাসিতে বেঁকে যাচ্ছিল তাঁর রক্তিম ঠোঁট। আনন্দের এই লক্ষণগুলো যেন জোর করে চেপে রাখার চেষ্টা করছিলেন তিনি, কিন্তু আপনা থেকেই তা ফুটে উঠছিল তাঁর মুখে। ‘কিন্তু ভ্রন্স্কি?’ ভ্রন্স্কির দিকে তাকিয়ে ভয় পেল কিটি। আন্নার মুখের মুকুরে যা পরিষ্কার ধরতে পেরেছিল কিটি, তা সে দেখল ভ্রন্স্কির মধ্যেও। কোথায় গেল তাঁর বরাবরকার ধীর-স্থির ভঙ্গি, নিশ্চিন্ত প্রশান্ত মুখভাব? না, এখন উনি আন্নার সাথে কথা বলার সময় প্রতিবার সামান্য মাথা নোয়াচ্ছেন, যেন লুটিয়ে পড়তে চান আন্নার সামনে, তাঁর দৃষ্টিতে শুধুই বশ্যতা আর শংকার ছাপ। ‘আমি অপমান করতে চাই না’, প্রতিবার তাঁর দৃষ্টি যেন বলছিল। ‘নিজেকে আমি বাঁচাতে চাই, কিন্তু জানি না কেমন করে।’ মুখে তাঁর এমন একটা ভাব যা আগে সে কখনো দেখেনি।
