ওয়াজের প্রথম ধীর লয়-ছন্দ শুরু করে কিটিকে উনি বললেন, ‘আপনার সাথে ওয়াজ নাচা একটা আরাম। কি লঘুতা, কি লঘুতা, কি সঠিকতা’, সে কথাই তিনি ওকে বললেন যা বলতেন তাঁর প্রায় সমস্ত সুপরিচিতাদের।
কিটি হাসল তাঁর প্রশংসায় এবং তাঁর কাঁধের ওপর দিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল হলঘরে। এমন নবাগতা সে নয়, যার কাছে বলনাচে সমস্ত লোকের মুখ মিলে যায় একক একটা ঐন্দ্রজালিক অনুভূতিতে; আবার বলনাচে ঢুঁ মেরে বেড়ানো তেমন কুমারীও সে নয়, যার কাছে সব মুখই চেনা, যাতে একঘেয়েমি লাগে; সে ছিল এই দুইয়ের মাঝামাঝি,—উত্তেজনা বোধ করছিল সে, কিন্তু সেই সাথে পর্যবেক্ষণ করার শক্তি রাখার মত দখলও ছিল তার নিজের ওপর। হলের বাম কোণে সে দেখল সমাজ চূড়ামণিদের জোট। সেখানে ছিল অসম্ভব রকমের অনাবৃত দেহে কর্সুনস্কির স্ত্রী, সুন্দরী লিদা, ছিলেন গৃহকর্ত্রী, নিজের টাক নিয়ে সেখানে জ্বলজ্বল করছেন ক্রিভিন, সমাজশ্রেষ্ঠরা যেখানে, সেখানে তিনি থাকেন সব সময়ই; কাছে যাবার সাহস না পেয়ে ছোকরারা তাকিয়ে দেখছিল সেদিকে; সেখানেই কিটির চোখে পড়ল স্তিভা, পরে দেখতে পেল কালো মখমলের পোশাকে আন্নার অপরূপ মূর্তি। তিনি-ও ছিলেন সেখানে। যে সন্ধ্যায় কিটি লেভিনকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তার পর থেকে সে আর তাঁকে দেখেনি। কিটি তার দূরবীক্ষণ দৃষ্টিতে তখনই চিনতে পারল তাঁকে। এটাও লক্ষ্য করল যে, ভ্রন্স্কি তাকিয়ে আছেন তার দিকে।
‘আরো এক পালা হবে নাকি? হাঁপিয়ে পড়েননি তো?’ সামান্য হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করলেন কর্মনস্কি।
‘না-না, আপনাকে ধন্যবাদ।’
‘কোথায় পৌঁছে দেব আপনাকে?’
‘মনে হচ্ছে কারেনিনা রয়েছে ওখানে…ওঁর কাছে আমাকে নিয়ে চলুন।
‘যেখানে বলবেন, সেখানেই।’
কর্সুনস্কিও তাঁর পদক্ষেপ সংযত করে ওয়াল্জ নাচতে নাচতে চলে গেলেন হলের বাঁ কোণের সেই ভিড়টার দিকে। ফরাসি ভাষায় ক্রমাগত বলতে থাকলেন, ‘ভদ্রমহিলাগণ, মাপ করবেন! মাপ করবেন, মাপ করবেন ভদ্রমহিলাগণ’, এবং লেস্, ত্যুল, রিবনের সমুদ্রের মাঝখান দিয়ে এদিক-ওদিক করে, কারো একটা পালক পর্যন্ত না ছুঁয়ে তাঁর নৃত্যসঙ্গিনীকে এমন সজোরে ঘোরালেন যে উদ্ঘাটিত হয়ে পড়ল মিহি মোজা পরা তার তন্বী পা, পোশাকের পিছ-ঝুল গিয়ে জড়িয়ে পড়ল ক্রিভিনের হাঁটুতে। কর্মনস্কি মাথা নত করে খোলা বুক টান করে তাকে আন্না আর্কাদিয়েভনার কাছে নিয়ে যাবার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন। কিটি লাল হয়ে ক্রিভিনের হাঁটু থেকে তার ঝুল খসিয়ে নিল। মাথা তখনো ঘুরছিল কিছুটা, আন্নার সন্ধানে তাকিয়ে দেখল চারদিকে। কিটি অবশ্য-অবশ্যই যা চেয়েছিল তেমন ভায়োলেট পোশাকে আন্না আসেননি। পরনে তাঁর নিচু কাটের কালো মখমলের গাউন, উদ্ঘাটিত তাঁর সুঠাম কাঁধ, বুক, যেন পুরানো হাতির দাঁতে খোদাই করা ছোট্ট ক্ষীণকায় মণিবন্ধ, সুডৌল বাহু। গোটা গাউন ভেনিসিয়ান লেসে সেলাই করা। নিজের কালো চুলে ভেজাল কিছু নেই, সেখানে প্যান্সি ফুলের ছোট একটা মালা, সাদা সাদা লেসের মাঝখানে কালো কোমরবন্ধেও তাই। কবরীর ছাঁদ চোখে পড়ার মত নয়, চোখে পড়ে শুধু তাঁর মাথার ওপরে আর পেছনে অনবরত খসে আসা কোঁকড়া চুলের ছোট ছোট স্বেচ্ছাচারী কুণ্ডল, যাতে খোঁপার শোভা বেড়েছে। দৃঢ় গ্রীবা যেন খোদাই করা, তাতে মুক্তার মালা।
আন্নাকে প্রতিদিন দেখেছে কিটি, তাঁর অনুরক্ত হয়ে উঠেছিল, চাইছিল অবশ্য-অবশ্যই তাঁকে ভায়োলেট পোশাকে দেখতে। কিন্তু এখন কালো পোশাকে তাঁকে দেখে সে টের পেল যে তাঁর সমস্ত লাবণ্য সে বুঝতে পারেনি। এখন তাঁকে সে দেখল একেবারে নতুন, নিজের কাছে অপ্রত্যাশিত এক রূপে। এখন সে উপলব্ধি করল যে ভায়োলেট পোশাক ওঁর পক্ষে অসম্ভব। ওঁর লালিত্য ঠিক এখানে যে সব সময়ই উনি তাঁর সাজসজ্জার ঊর্ধ্বে উঠে যান, বেশভূষা ওঁর কখনোই লক্ষণীয় হওয়া সম্ভব নয়। ফলাও লেস সমেত তাঁর গায়ের এই কালো পোশাকটাও চোখে পড়ছে না; ওটা কেবল একটা কাঠামো, চোখে পড়ছে কেবল ওঁকে সহজ, স্বাভাবিক, সুচারু, সেই সাথে হাসিখুশি, সজীব।
উনি দাঁড়িয়ে ছিলেন বরাবরের মত অসাধারণ সিধে হয়ে, কিটি যখন এই দলটার কাছে আসে তখন তিনি গৃহকর্তার সাথে কথা বলছিলেন তাঁর দিকে সামান্য মাথা ফিরিয়ে।
‘না-না, আমি ঢিল ছুঁড়ছি না’, ওঁর কি-একটা কথায় তিনি বলছিলেন, ‘তবে আমি ঠিক বুঝি না’, কাঁধ কুঁচকে উনি বলে চললেন, এবং তখনই কিটির দিকে তাকালেন কোমল হাসিমুখে। তার সাজসজ্জায় রমণীর ত্বরিত দৃষ্টিপাত করে মাথা নাড়লেন অলক্ষ্যে কিন্তু কিটি বুঝল যে ওটা তার সাজ ও রূপ অনুমোদনের ভঙ্গি।—’আপনি হলে ঢুকছেন নাচতে নাচতে’, যোগ করলেন তিনি।
কর্সুনস্কি আন্না আর্কাদিয়েভনাকে আগে কখনো দেখেননি। তাঁর উদ্দেশে মাথা নত করে তিনি বললেন, ‘ইনি আমার একজন বিশ্বস্ত সহায়। বলনাচের আসরকে প্রিন্সেস হাসি-খুশি আর সুন্দর করে তুলতে সাহায্য করেন। আন্না আর্কাদিয়েভনা, ওয়াজের পালা’, আবার মাথা নত করে বললেন তিনি।
গৃহকর্তা বললেন, ‘আপনাদের কি পরিচয় ছিল?’
‘কার সাথে আমাদের পরিচয় নেই? সাদা রঙের নেকড়ের মত আমি আর আমার স্ত্রীকে চেনে সবাই’, জবাব দিলেন কর্সুনস্কি, ‘ওয়াজের পালা, আন্না আর্কাদিয়েভনা।’
