কিটি রাঙা হয়ে উঠল। তার মনে হল, কেন তিনি এসেছিলেন আর কেনই বা ভেতরে ঢুকলেন না, কেবল সে- ই বুঝেছে একা। সে ভাবছিল, ‘আমাদের ওখানে গিয়েছিল ও, আমাকে না পেয়ে ভেবেছিল আমি এখানে; আর ভেতরে যে ঢুকল না তার কারণ বড় দেরি হয়ে গেছে, তা ছাড়া আন্না রয়েছেন এখানে।’
কিছু না বলে সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে আন্নার অ্যালবাম দেখতে লাগলেন।
যে ডিনারের আয়োজন হচ্ছে তার খুঁটিনাটি জানার জন্য একটা লোক এসেছিলেন বন্ধুর কাছে কিন্তু ভেতরে ঢোকেননি, এর মধ্যে অসাধারণ বা অদ্ভুত কিছু নেই। কিন্তু সবার কাছেই এটা মনে হল অদ্ভূত। তবে আন্নার কাছেই সবচেয়ে বেশি করে অদ্ভুত আর বিশ্রী লাগল
বাইশ
আলোয় ঝলমলে ফুলের টব আর পাউডার মাখা এবং লাল কাফতান পরা সব চাপরাশি শোভিত প্রশস্ত সিঁড়িতে মায়ের সাথে কিটি যখন উঠল, বলনাচ তখন সবেমাত্র শুরু হয়েছে। হল থেকে আসছে গতিবিধির সমতাল মর্মর, যেন মধুচক্র, আর যখন তাঁরা গাছগুলোর মাঝখানকার চাতালে আয়নার সামনে কবরী আর পোশাক ঠিক করে নিচ্ছিলেন, হলে শোনা গেল অর্কেস্ট্রার বেহালায় প্রথম ওয়াজ নাচ শুরুর সন্তর্পণ সুস্পষ্ট সুর। অন্য এক আয়নার সামনে চাঁদির পাকা চুল সামলে আতরের গন্ধ ছড়িয়ে যেতে গিয়ে সিঁড়িতে তাঁদের সাথে ধাক্কা খেলেন বেসামরিক পোশাকের এক বৃদ্ধ, তাঁর কাছে অপরিচিত কিটিকে দেখে স্পষ্টতই মুগ্ধ হয়ে সরে গেলেন তিনি। ভয়ানক নিচু কাটের ওয়েস্ট কোট পরা শ্মশ্রুহীন এক তরুণ, উঁচু সমাজের যে ছোকরাদের বৃদ্ধ প্রিন্স শ্যেরবাৎস্কি বলতেন ন্যাকামণি তাদেরই একজন, যেতে যেতেই তার সাদা টাই ঠিক করতে করতে অভিবাদন করল ওঁদের উদ্দেশে এবং পাশ দিয়ে চলে গিয়ে আবার ফিরে এল কিটিকে কোয়াড্রিল নাচে আমন্ত্রণ জানাতে। কিটির প্রথম কোয়াড্রিল আগেই ভ্রন্স্কিকে দিয়ে রাখায় তরুণটিকে সে দ্বিতীয় নাচটা দিতে বাধ্য হল। দরজার কাছে দস্তানায় বোতাম আঁটতে আঁটতে ওঁদের পথ করে দিলেন সামরিক এক অফিসার এবং মোচে তা দিতে দিতে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাল গোলাপি কিটির দিকে।
সাজসজ্জা, কবরী আর বলনাচের সব কিছু প্রস্তুতিতে কিটির প্রচ্যুর মেহনত আর কল্পনাশক্তির প্রয়োজন পড়লেও এখন তার গোলাপি আস্তরের ওপর জটিল ‘ত্যুল’ গাউনে বলনাচে নামল এমন স্বচ্ছন্দে আর সহজে যেন এসব রোজেট, লেস, সাজসজ্জায় নানা খুঁটিনাটির জন্য তার বা বাড়ির লোকেদের এক মুহূর্তও মাথা ঘামাতে হয়নি, যেন এই ত্যুল, লেস, ওপরে দুটো পাতা সমেত গোলাপ গোঁজা উঁচু কবরী নিয়েই সে জন্মেছে।
হলে ঢোকার মুখে প্রিন্স-মহিষী যখন তার কটির গুটিয়ে আসা রিবন ঠিক করে দিতে চাইলেন, কিটি আস্তে সরে গেল। তার মনে হচ্ছিল যে তার পোশাকের সব কিছুই আপনাআপনিই সুন্দর আর সৌষ্ঠবমণ্ডিত হওয়ার কথা, কিছুই সংশোধন করার প্রয়োজন নেই।
এটা ছিল কিটির এক সৌভাগ্যের দিন। গাউন আঁট হয়ে বসেনি কোথাও, বার্থা লেস কোথাও ঝুলে পড়েনি, দলামোচড়া হয়নি রোজেটগুলো, ছিঁড়েও যায়নি; উঁচু বাঁকা হিলের ওপর গোলাপি জুতোজোড়া খামচে ধরছে না, বরং ফূর্তি পাচ্ছে পা। সোনালি চুলের ঘন গুছি তার ছোট্ট মাথাটিতে খাপ খেয়ে গেছে তার নিজের চুলের মত। গড়ন না বদলিয়ে যে লম্বা দস্তানা তার হাত জড়িয়ে ছিল তার তিনটে বোতামই আঁটা, খসে আসেনি। ভারি একটা কোমলতায় তার গ্রীবা ঘিরে আছে কণ্ঠালংকারের কালো মখমল বন্ধনী। অপূর্ব সে মখমল, বাড়িতে আয়নায় নিজের গলা দেখে কিটি টের পেয়েছিল কি জানাতে চায় মখমলটি। আর সব কিছুতে খুঁতখুঁতি থাকলেও মখমল অপরূপ। এবং এখানে, এই বলনাচেও আয়নায় ওটা দেখে হাসি ফুটল কিটির মুখে। অনাবৃত কাঁধ আর হাতে মর্মরের শীতলতা অনুভব করল কিটি, এই অনুভূতিটা তার খুবই ভালো লাগে। জ্বলজ্বল করছিল তার চোখ, নিজের আকর্ষণীয়তার চেতনায় না হেসে পারছিল না তার রক্তিম ঠোঁট। হলে ঢুকে নাচের আমন্ত্রণের জন্য অপেক্ষমাণ মহিলাদের ত্যুল-রিবন-লেস-রঙের ভিড়টায় পৌঁছতে-না-পৌঁছতেই (এরকম ভিড়ে কিটি কখনো দাঁড়িয়ে থাকেনি বেশিক্ষণ), ওয়াজে নাচার আমন্ত্রণ এল, আর আমন্ত্রণ করলেন কিনা নৃত্যের সেরা নাগর, বলনাচের পদাধিকারে প্রথম পুরুষ, তার খ্যাতনামা পরিচালক, আসরের অধিকারী, সামমণ্ডিত বিবাহিত সুপুরুষ এগুরুশকা কর্জুনস্কি। কাউন্টেস বানিনার সাথে তিনি প্রথম পালা ওয়াল্জ নাচ শেষ করে তাঁর এখতিয়ার, অর্থাৎ নৃত্যাবতীর্ণ কয়েক জোড়া নাচিয়ের ওপর চোখ বুলিয়ে দেখতে পেলেন কিটি আসছে, অমনি ছুটে গেলেন নৃত্যের পরিচালকদের পক্ষেই শুধু যা শোভা পায় তেমন একটা হেলা-ফেলা স্বাচ্ছন্দে এবং মাথা নত করে, সে রাজি আছে কিনা এমন কি সেটুকুও জিজ্ঞেস না করেই কিটির ক্ষীণ কটিদেশ আলিঙ্গনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন। কিটি তাকিয়ে দেখল কাকে দেওয়া যায় তার হাতের পাখা, গৃহকর্ত্রী হেসে সেটা নিলেন।
‘ঠিক সময়ে এসে গিয়ে ভারি ভালো করেছেন’, কর্মনস্কি তার কোমর জড়িয়ে ধরে বললেন। ‘দেরি করে আসা সত্যি কি যে এক বদভ্যাস।’
কিটি তার বাঁ হাত বেঁকিয়ে রাখল তাঁর কাঁধে, গোলাপি জুতা পরা তার ছোট ছোট পা মেঝের চিকন পার্কেটের ওপর অনায়াসে তাল মেলাল সঙ্গীতের সাথে।
