আন্না বললেন, ‘কাউন্টেস আমাকে খুব করে তাঁর ওখানে যেতে বলেছেন। বুড়িকে দেখতে যেতে আমার আনন্দই হবে, কালই যার। তবে, থাক, বাবা, স্তিভা ডল্লির ঘরে রয়েছে অনেকক্ষণ’, আলাপের প্রসঙ্গ বদলিয়ে যোগ করলেন আন্না এবং উঠে দাঁড়ালেন, কিটির মনে হল কেন জানি অসন্তুষ্ট হয়েছেন তিনি।
‘না-না, আগে আমি! না আমি!’ চা-পর্ব শেষ করে আন্না খালার কাছে ছুটে আসতে আসতে ছেয়ে-মেয়েরা চেঁচাচ্ছিল।
‘আমরা সবাই একসাথে’, এই বলে আন্না হাসতে হাসতে ছুটে গেলেন তাদের দিকে, উল্লাসে চেঁচামেচি করা এই গোটা দলটাকে এবং সবাইকে জড়িয়ে ধরে ঢিপ করে ফেললেন।
একুশ
ডল্লি তাঁর ঘর থেকে বেরোলেন বড়দের চায়ের সময়। অবলোন্স্কি বেরোলেন না। তিনি নিশ্চয় পেছনের দরজা দিয়ে স্ত্রীর ঘর থেকে বেরিয়ে গেছেন।
ডল্লি আন্নার দিকে ফিরে বললেন, ‘আমার ভয় হচ্ছে, ওপরে তোমার শীত করবে। আমার ইচ্ছে তোমাকে নিচে নামিয়ে আনি, দুজনে কাছাকাছিও থাকা যাবে।’
‘আরে না, আমার জন্য ভাবনা নেই’, ডল্লির মুখের দিকে তাকিয়ে মিটমাট হয়ে গেছে কিনা আন্দাজ করার চেষ্টা করে বললেন আন্না।
ভাবী বললেন, ‘এখানে আলো হত বেশি।’
‘তোমাকে বলছি যে সবখানে এবং সব সময় আমি অঘোরে ঘুমাই।’
‘কি নিয়ে কথা হচ্ছে’, স্টাডি থেকে বেরিয়ে বৌকে উদ্দেশ করে বললেন অব্লোন্স্কি।
তাঁর গলার সুরে কিটি এবং আন্না দুজনেই বুঝলেন যে মিটমাট হয়ে গেছে।
‘আমি চাইছি আন্নাকে নিচে নামিয়ে আনতে, তবে পর্দা টাঙাতে হবে নতুন করে। কিন্তু কেউ সেটা পারবে না, করতে হবে আমাকেই’, জবাবে স্বামীকে বললেন ডল্লি।
‘পুরো মিটমাট হয়েছে কিনা সৃষ্টিকর্তাই জানে না’, তাঁর নিরুত্তাপ অচঞ্চল গলা শুনে আন্না ভাবলেন।
স্বামী বললেন, ‘আহ্ ডল্লি, বাড়িয়ে বলো না। বল তো আমিই করে দিচ্ছি…’
‘হ্যাঁ, মিটমাট হয়েছে তাহলে’, ভাবলেন আন্না।
‘তুমি যে কি করবে তা বেশ জানা আছে সাহেব’, ডল্লি বললেন, ‘মাতভেইকে এমন কিছু করার হুকুম দেবে যা করা যায় না, আর নিজে যাবে বেরিয়ে। সেও সব গোলমাল করে বসবে।’ আর এ কথা বলার সময় ডল্লির ঠোঁটের কোন কুঁচকে উঠল তাঁর অভ্যস্ত শ্লেষের হাসিতে।
‘একেবারে! একেবারে মিটমাট, এক্কেবারে’, ভাবলেন আন্না, ‘মহান সৃষ্টিকর্তা!’ এবং তিনিই যে এর হেতু এতে খুশি হয়ে ডল্লির কাছে গিয়ে চুমু খেলেন তাঁকে।
‘মোটেই না। আমাকে আর মাতভেইকে এত তাচ্ছিল্য কেন কর বল তো?’ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে প্রায় অলক্ষ্য একটু হেসে বললেন অব্লোন্স্কি।
বরাবরের মত সারাটা সন্ধ্যা ডল্লি স্বামীকে ঠাট্টা করে চললেন আর অব্লোন্স্কি রইলেন হাসিখুশি তুষ্ট হয়ে, কিন্তু শুধু ততটা যাতে না প্রকাশ পায় যে মার্জনা লাভ করায় তিনি তাঁর অপরাধ ভুলে গেছেন।
সাড়ে ন’টার সময় অব্লোন্স্কিদের বাড়িতে চায়ের আসরে সবিশেষ আনন্দময় প্রীতিকর পারিবারিক সান্ধ্যালাপটা ক্ষুণ্ণ হল বাহ্যত অতি সাধারণ একটা ঘটনায় কিন্তু সেই সাধারণ ঘটনাটাই কেন জানি সবার কাছে মনে হল অদ্ভুত। পিটার্সবুর্গের সাধারণ পরিচিতদের কথা বলতে বলতে আন্না ঝট করে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘আমার অ্যালবামে ছবি আছে। ভালো কথা, আমার সেরিওজাকেও দেখাব তোমাদের’, গর্বিত মায়ের হাসি নিয়ে যোগ করলেন তিনি।
দশটার সময় যখন সাধারণত তিনি ছেলের কাছ থেকে বিদায় নিতেন এবং বলনাচে যাবার আগে নিজে শুইয়ে দিতেন তাকে, এখন তার কাছ থেকে এত দূরে আছেন ভেবে বিষণ্ণ লাগল তাঁর; এবং যা নিয়েই কথাবার্তা চলুক, থেকেই থেকেই তাঁর মন চলে যাচ্ছিল তাঁর কোঁকড়া-চুলো সেরিওজার পানে। তাঁর ইচ্ছে হচ্ছিল তার ছবিটা তাকিয়ে দেখে তার গল্প করে শোনায়, প্রথম অজুহাতের সুযোগ নিয়ে তিনি তাঁর লঘু, দৃঢ়চিত্ত চলনে উঠে গেলেন অ্যালবাম আনতে। ওপরে, তাঁর ঘরে যাবার সিঁড়িটা উঠেছিল। প্রধান সিঁড়ির উষ্ণ চাতাল থেকে।
ড্রয়িং-রুম থেকে বেরোতেই সদর হলঘরে ঘণ্টি শোনা গেল।
ডল্লি বলল, ‘কে এল আবার?’
কিটি টিপ্পনি কাটলে, ‘আমার জন্য এসে থাকলে আগেই এসেছে, আর কারো কারো পক্ষে দেরি করে।’
‘নিশ্চয় কাগজ নিয়ে এসেছে’, যোগ করলেন অব্লোন্স্কি আর আন্না যখন সিঁড়ির কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন, চাকর ওপরে উঠছিল অভ্যাগতের খবর দিতে আর অভ্যাগত নিজে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাতির কাছে। নিচে তাকিয়ে আন্না তখনই চিনতে পারলেন ভ্রন্স্কিকে, এবং হঠাৎ তাঁর বুকের মধ্যে দুলে উঠল আনন্দ আর সেই সাথে ভয়ের একটা বিচিত্র অনুভূতি। ওভারকোট না ছেড়ে ভ্রন্স্কি দাঁড়িয়ে ছিলেন, কি যেন বার করছিলেন পকেট থেকে। আন্না যখন সিঁড়ির মাঝামাঝি উঠেছেন, ভ্রন্স্কি চোখ তুলতেই দেখতে পেলেন তাঁকে, মুখের ভাবে ফুটে উঠল কেমন একটা লজ্জা আর ভয়। আন্না সামান্য মাথা নত করে চলে গেলেন আর তার পরেই শোনা গেল আগতকে ভেতরে আসবার জন্য উচ্চৈস্বরে ডাকছেন অব্লোন্স্কি আর অনুচ্চ নরম, অচঞ্চল গলায় আপত্তি করছেন ভ্রন্স্কি।
অ্যালবাম নিয়ে আন্না যখন ফিরলেন, ভ্রন্স্কি তখন আর নেই। অব্লোন্স্কি বলছিলেন, নামকরা যে ব্যক্তিটি শহরে এসেছেন তাঁর জন্য যে ডিনার দেওয়া হচ্ছে তার কথা জানতে এসেছিলেন তিনি।
যোগ করলেন তিনি, ‘কিছুতেই ভেতরে ঢুকতে চাইল না। আশ্চর্য লোক বটে।’
