আন্নার কথা ধরতে পেরে তিনি চুরুট ফেলে দিয়ে অন্তর্ধান করলেন দরজার ওপাশে।
অব্লোন্স্কি চলে যেতে তিনি ফিরলেন সোফায়, সেখানে রইলেন শিশু পরিবৃত হয়ে। তা যে এই ফুফুকে ভালোবাসেন সেটা তাদের চোখে পড়েছিল বলেই কি, অথবা তারা নিজেরাই তাঁর মধ্যে একটা বিশেষ মাধুর্য অনুভব করেছিল বলেই হোক, তবে বড় দুটো আর তাদের দেখাদেখি ছোটরাও, শিশুদের বেলায় যা প্রায়ই ঘটে থাকে, আহারের আগে থেকেই নতুন ফুফুকে ছেঁকে ধরেছিল, সঙ্গ ছাড়ছিল না তাঁর। কি করে ফুফুর যথাসম্ভব কাছ ঘেঁসে বসা যায়, তাঁকে ছোঁয়া যায়, তাঁর ছোট্ট হাতখানা নিয়ে চুমু খাওয়া যায়, খেলা করা যায় তাঁর আংটি নিয়ে, অন্তত তাঁর পোশাকের কুঁচি নিয়ে নাড়াচাড়া করা যায় এই নিয়ে যেন একটা খেলা শুরু হয়ে গেল তাদের মধ্যে।
নিজের জায়গায় বসে আন্না বললেন, ‘নাও, নাও, আগে যে যেমন বসেছিলাম।’
এবং আবার গ্রিশা তাঁর হাতের তল দিয়ে মাথা গলিয়ে পোশাকের ওপর মাথা রাখলে, গর্বে আর সুখে জ্বলজ্বল করে উঠল সে।
‘তা বলনাচটা হচ্ছে কখন?’ কিটির দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
‘সামনের সপ্তাহে। চমৎকার নাচ। যেখানে সব সময়ই ফুর্তি লাগে তেমনি ধরনের একটা।’
‘কিন্তু এমন বলনাচ আছে কি যেখানে সব সময়ই ফুর্তি জমে?’ স্নিগ্ধ রহস্যের সুরে বললেন তিনি।
‘আশ্চর্য লাগলেও আছে। বব্রিশ্যেভদের ওখানে সব সময় জমে, নিকিতিনদের ওখানেও, কিন্তু মেঝকোভদের ওখানে সব সময়ই একঘেয়ে। আপনি কি লক্ষ্য করেননি?’
‘না, বোন, ফুর্তির বলনাচ আমার আর নেই’, আন্না বললেন আর কিটি তার চোখে দেখল সেই বিশেষ জগৎ যা তার কাছে অনুদ্ঘাটিত, ‘আমার কাছে শুধু তেমন বলনাচই সম্ভব যা কম দুঃসহ, কম একঘেয়ে … ‘
‘বলনাচে আপনার একঘেয়ে লাগে কেমন করে?’
‘কেন একঘেয়ে লাগবে না আমার?’ জিজ্ঞেস করলেন আন্না।
কিটি লক্ষ্য করল যে কি উত্তর আসবে সেটা আন্নার জানা।
‘আপনি সব সময় সবার চেয়ে সেরা বলে।’
লাল হয়ে ওঠার সামর্থ্য আন্নার ছিল। লাল হয়ে তিনি বললেন :
‘প্রথমত, কখনোই তা নই। দ্বিতীয়ত, যদি হইও তাতে আমার কি এসে গেল?’
কিটি জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি এই বলনাচে যাবেন?’
‘আমার মনে হয় না গিয়ে চলবে না। এই নে’, তিনি বললেন তানিয়াকে, ক্রমশ সরু হয়ে আসা তাঁর সাদা আঙুল থেকে সহজে খসে আসা একটা আংটি টানাটানি করছিল সে।
‘আপনি গেলে ভারি খুশি হব আমি। বলনাচে আপনাকে দেখার খুব ইচ্ছে আমার।’
‘অন্তত যদি যেতে হয়, তাহলে এই ভেবে প্রবোধ মানব যে এতে আপনি আনন্দ পেয়েছেন… গ্রিশা টানাটানি করিস না রে, এমনিতেই সব আলুথালু হয়ে আছে’, বেরিয়ে আসা যে একগোছা চুল নিয়ে গ্রিসা খেলছিল, সেটা ঠিক করে নিয়ে বললেন তিনি।
‘বলনাচে আমি আপনাকে কল্পনা করছি ভায়োলেট রঙের পোশাকে।’
‘ঠিক ভায়োলেট রঙই হতে হবে কেন?’ হেসে জিজ্ঞেস করলেন আন্না, ‘নাও ছেলেমেয়েরা, যাও এবার, যাও। শুনছ না, মিস গুল ডাকছেন চা খেতে’, ছেলেদের হাত থেকে নিজেকে খসিয়ে তাদের ডাইনিং-রুমে পাঠাতে পাঠাতে বললেন তিনি 1
‘আর আমি জানি কেন আপনি আমাকে বলনাচে ডাকছেন। এই বলনাচটা থেকে আপনার আশা অনেক, তাই আপনার ইচ্ছে হচ্ছে সবাই যেন সেখানে থাকে, তাতে যোগ দেয়।’
‘কি করে জানলেন? হ্যাঁ, তাই।’
‘ওহ্ কি চমৎকার আপনাদের এই বয়সটা’, আন্না বলে চললেন, ‘বেশ মনে আছে, সুইজারল্যান্ডের পাহাড়ের ওপরকার নীল কুয়াশার মত এই কুয়াশাটা যে আমার চেনা। এ কুয়াশা পুলকে ছেয়ে দেয় ওই বয়সটাকে, যখন শৈশব এই শেষ হল বলে, আর এই বিশাল সুখী মহলটা থেকে কেবলি বেরিয়ে আসছে পথ, আর সারি সারি এই কক্ষগুলোয় ঢুকতে যেমন আনন্দ হচ্ছে, তেমনি ভয়ও করছে যদিও মনে হচ্ছে এ হর্ম্য যেন উজ্জ্বল আর অপরূপ…কে না গেছে এর ভেতর দিয়ে?
নীরবে হাসল কিটি। আন্নার স্বামী আলেক্সেই আলেক্সান্দ্রভিচ কারেনিনের অকাব্যিক চেহারাটা মনে করে সে ভাবল, ‘কিন্তু কেমন করে উনি গেলেন এর ভেতর দিয়ে? ওঁর সমস্ত রোমান্সটা জানতে আমার ভারি ইচ্ছে।’
‘আমি কিছু কিছু জানি। স্তিভা আমাকে বলেছে, অভিনন্দন জানাই আপনাকে, লোকটিকে আমার ভারি ভালো
লেগেছে’, আন্না বলে চললেন, ‘ভ্রন্স্কির সাথে আমার দেখা হয়েছে রেল স্টেশনে।’
‘আরে, উনি গিয়েছিলেন সেখানে?’ লাল হয়ে জিজ্ঞেস করল কিটি, ‘স্তিভা কি বলেছে আপনাকে?’
‘বকবক করে স্তিভা আমাকে সবই বলে ফেলেছে। আমিও খুব খুশি হয়েছি। কাল আমি ট্রেনে এসেছি প্রস্কির মায়ের সাথে’, আন্না বলে চললেন, ‘মা-র মুখে কেবলি ছেলের কথা; এটি ওঁর আদরের ছেলে; মায়েরা কিরকম পক্ষপাতী হয় তা আমি জানি, কিন্তু …‘
‘মা আপনাকে কি বললেন?
‘সে অনেক! আমি জানি যে ও মায়ের আদরের ছেলে, তাহলেও দেখেই বোঝা যায় সে বীরব্রতী… যেমন, ম বলেছেন সে তার সব সম্পত্তি ভাইকে দিয়ে দিতে চেয়েছিল, ছেলেবেলাতেই অসাধারণ একটা কাণ্ড করেছে সে, পানিতে ডোবা থেকে একটা মেয়েকে বাঁচিয়েছে। মোট কথা বীর…’ হেসে বললেন আন্না। স্টেশনে যে দু’শ রুবুল দিয়েছেন, সেটা স্মরণ করলেন তিনি।
কিন্তু ওই দু’শ রুলের কথাটা উনি বললেন না। কেন জানি সেটা মনে করতে তাঁর খারাপ লাগছিল। তিনি টের পাচ্ছিলেন যে ঘটনাটার সাথে তাঁরও যেন কিছু-একটা যোগ আছে যা থাকা উচিত ছিল না।
