ডল্লি বাধা দিলেন, ‘না, বোঝে, বুঝেছে! কিন্তু আমার কথা তুমি ভুলে যাচ্ছ… আমার পক্ষে কি এটা সহজ?’
‘দাঁড়াও, দাঁড়াও। আমাকে যখন ও ঘটনাটা বলেছিল, তখন তোমার অবস্থাটা কত ভয়ঙ্কর তা আমি বুঝিনি, সেটা তোমার কাছে স্বীকার করছি। আমি শুধু দেখেছিলাম ওকে, দেখেছিলাম যে পরিবার ভেঙে পড়ছে; ওর জন্য মায়া হয়েছিল আমার, কিন্তু তোমার সাথে কথা বলার পরে আমি নারী হিসেবে অন্য কিছু দেখছি; দেখছি তোমার যন্ত্রণা, বলতে পারব না তোমার জন্য কি যে কষ্ট হচ্ছে আমার! কিন্তু ডল্লি, বোন আমার, তোমার যন্ত্রণা আমি বেশ বুঝতে পারছি, শুধু একটা জিনিস আমি জানি না… জানি না… জানি না ওর জন্য তোমার প্রাণের ভেতর কতটা ভালোবাসা এখনো আছে। সেটা তুমি জানো—এতটা কি আছে যাতে ওকে ক্ষমা করা সম্ভব। যদি থাকে, তাহলে ক্ষমা কর।’
‘না’, ডল্লি শুরু করেছিলেন, কিন্তু আরেকবার তাঁর হাতে চুমু খেয়ে আন্না থামিয়ে দিলেন তাঁকে। বললেন, ‘দুনিয়াটা আমি তোমার চেয়ে বেশি জানি। স্তিভার মত এসব লোকেদের আমি চিনি, জানি কিভাবে তারা এই ব্যাপারগুলোকে দেখে। তুমি বলছ, মেয়েটার সাথে ও তোমার কথা বলাবলি করেছে। তা সে করেনি। এসব লোকে বিশ্বাসহানির কাজ করতে পারে, কিন্তু নিজেদের গৃহ আর গৃহিণী তাদের কাছে পবিত্র। এই ধরনের মেয়েদের ওদের কাছে কেমন যেন অবজ্ঞাই পেয়ে থাকে, পরিবারের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে ওঠে না। ওরা যেন দুর্লঙ্ঘ্য কি-একটা রেখা টানে পরিবার আর এদের মধ্যে। আমি ঠিক বুঝি না, কিন্তু ব্যাপারটা এই রকমই।’
‘হ্যাঁ, কিন্তু ও তো চুমু খেয়েছে ওকে…’
‘শোনো ডল্লি, বোনটি আমার। স্তিভা যখন তোমার প্রেমে পড়েছিল তখন তো আমি ওকে দেখেছি। সে সময়টা আমার বেশ মনে আছে যখন সে আমার কাছে তোমার কথা বলতে গিয়ে কাঁদতো, ওর কাছে কি কাব্য আর সমুন্নতির উপলক্ষ ছিল তুমি। আমি এও জানি যে তোমার সাথে ওর যত দিন কেটেছে ততই ওর চোখে তুমি উঁচু হয়ে উঠেছ। ওকে নিয়ে আমরা হাসাহাসি করতাম, প্রতিটা কথায় ও যোগ দিত : ‘ডল্লি আশ্চর্য মেয়ে।’ ওর কাছে তুমি সব সময়ই ছিলে এবং আছ স্বর্গের দেবী। ওর এই আসক্তিটা প্রাণ থেকে নয়…’
‘কিন্তু আসক্তির যদি পুনরাবৃত্তি ঘটে?’
‘আমি যতটা বুঝি হওয়া সম্ভব নয়…’
‘কিন্তু তুমি ক্ষমা করতে পারতে?’
‘জানি না, বিচার করে দেখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়… না, সম্ভব’, খানিকটা ভেবে নিয়ে মনে মনে অবস্থাটা মানদণ্ডে চাপিয়ে আন্না বললেন, ‘না, সম্ভব, সম্ভব, সম্ভব। হ্যাঁ, আমি হলে ক্ষমা করতাম। ঠিক একইরকম থেকে যেতাম না নিশ্চয়, কিন্তু ক্ষমা করতাম, এবং এমনভাবে করতাম যে কিছু হয়নি, একেবারেই কিছু হয়নি।
‘সে তো বটেই’, তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে বললেন ডল্লি। যেন অনেক বার যা ভেবেছিলেন তাই বলছেন, ‘না হলে তো ওটা ক্ষমাই নয়। যদি ক্ষমা করতে হয়, তাহলে পুরোপুরি, পুরোপুরি। নাও, চল তোমাকে তোমার ঘরে নিয়ে যাই’, উঠে দাঁড়িয়ে ডল্লি বললেন এবং যেতে যেতে আন্নাকে আলিঙ্গন করে বললেন, ‘ভারি খুশি হয়েছি, তুমি এসেছ বলে। মনটা হালকা হল, খুবই হালকা।’
আন্না কারেনিনা – ১.২০
বিশ
আন্না সারাটা দিন বাড়িতে, অর্থাৎ অব্লোন্স্কিদের ওখানে কাটালেন। পরিচিত কারো সাথে দেখা করলেন না। আন্নার আসার খবর পেয়ে তাঁরা সেদিনই এসে হাজির হয়েছিলেন। সকালটা তিনি কাটালেন ডল্লি আর ছেলেমেয়েদের সাথে। ভাইকে চিঠি লিখে পাঠালেন তিনি যেন অবশ্য-অবশ্যই বাড়িতে খান। লিখলেন, ‘চলে এসো, সৃষ্টিকর্তা করুণাময়।’
বাড়িতেই খেলেন অব্লোন্স্কি; কথাবার্তা হল সাধারণ। স্ত্রী তাঁর সাথে কথা বললেন ‘তুমি’ বলে, যেটা আগে বলছিলেন না। স্ত্রী-স্বামীর মধ্যে সম্পর্কে একইরকম অনাত্মীয়তা রয়ে গেল, কিন্তু ছাড়াছাড়ির প্রশ্ন আর ছিল না এবং ব্যাখ্যা করে মিটিয়ে নেবার সম্ভাবনা দেখতে পেলেন অব্লোন্স্কি।
খাওয়ার ঠিক পরেই এল কিটি। আন্না আর্কাদিয়েভনাকে কিটি চিনত, তবে খুবই সামান্য। বোনের কাছে কিটি এল একটু ভয়-ভয় মনেই, পিটার্সবুর্গের উচ্চ সমাজের এই যে মহিলাকে সবাই এত প্রশংসা করে, তিনি কিভাবে তাকে গ্রহণ করবেন এই নিয়ে তার শংকা ছিল। কিন্তু কিটিকে ভালো লাগল আন্না আর্কাদিয়েভনার—এটা সে তখনই টের পেল। স্পষ্টতই আন্না মুগ্ধ হয়েছিলেন কিটির রূপ ও তারুণ্যে এবং কিটি সচেতন হতে না হতেই অনুভব করল যে সে শুধু আন্নার প্রভাবে পড়েছে তাই নয়, তাঁকে ভালোবেসেও ফেলেছে, যেভাবে কোন তরুণী ভালোবাসতে পারে বয়সে বড় বিবাহিত কোন মহিলাকে। আন্নাকে উঁচু সমাজের মহিলা বা আট বছর বয়স্ক ছেলের মা বলেও মনে হল না। বরং গতির নমনীয়তা, সতেজ ভাব আর মুখের যে সজীবতা কখনো তাঁর হাসিতে, কখনো দৃষ্টিতে ফুটে উঠত তাতে তাঁকে বিশ বছরের তরুণীর মতই লাগে, অবশ্য যদি তাঁর সে মুখ গম্ভীর, মাঝে মাঝে বিষণ্ন ভাবে ধারণ না করত। সেটায় বিস্মিত ও আকৃষ্ট বোধ করল কিটি। সে অনুভব করছিল যে আন্না একেবারে সহজ মানুষ, কিছুই লুকিয়ে রাখেন না, তবু কিটির কাছে অনধিগম্য জটিল কাব্যিক আগ্রহের একটা উঁচু ধরনের জগৎ যেন তাঁর মধ্যে বিরাজমান।
ডল্লি যখন আহারের পর উঠে গেলেন তাঁর ঘরে, আন্না দ্রুত চলে গেলেন ধূমপানরত ভাইয়ের কাছে। ফুর্তি করে চোখ মটকে তাঁর ওপর ক্রুশ করে চোখ দিয়ে দরজার দিকে দেখিয়ে বললেন, ‘যাও স্তিভা, সৃষ্টিকর্তা তোমার মঙ্গল করুন!’
