‘ডল্লি, বোনটি আমার, ও আমাকে বলেছে, কিন্তু আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই, সব কিছু আমাকে বল।’
সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে ডল্লি তাকালেন তাঁর দিকে।
আন্নার মুখে দেখা গেল অকৃত্রিম সহমর্মিতা আর ভালোবাসা।
হঠাৎ ডল্লি বললেন, ‘বেশ তাই হোক। কিন্তু আমি গোড়া থেকে সব বলব। তুমি জানো আমার বিয়ে হয় কিভাবে? মায়ের শিক্ষাগুণে আমি শুধু নিরীহ নয়, বোকাই ছিলাম। কিছুই জানতাম না আমি। আমি জানি লোকে বলে, স্বামী তার আগের জীবন সম্পর্কে স্ত্রীকে সব কিছু বলবে। কিন্তু স্তিভা…’ নিজেকে সংশোধন করে নিলেন তিনি, ‘অব্লোন্স্কি আমাকে কিছুই বলেনি। তোমার বিশ্বাস হবে না, কিন্তু এতদিন পর্যন্ত আমি ভেবে এসেছি, আমিই একমাত্র নারী যাকে ও জানে। এভাবেই কাটিয়েছি আট বছর। তুমি বুঝে দেখো, আমি শুধু তাকে অবিশ্বস্ততায় সন্দেহ করিনি তাই নয়, ভাবতাম ওটা অসম্ভব। তারপর এই ধরনের ধারণা নিয়ে হঠাৎ, ভেবে দেখো, এসব বীভৎসতা, এই কদর্যতা… তুমি আমাকে বোঝার চেষ্টা কর। নিজের সুখে একেবারে নিঃসন্দেহ থাকার পর হঠাৎ…’ ডল্লি বলে চললেন তাঁর ফোঁপানি চেপে, ‘পাওয়া গেল চিঠি, ওর চিঠি ওর প্রণয়িনীর কাছে। আমারই গভর্নেসের কাছে। না, এটা বড় বেশি সাঙ্ঘাতিক!’ উনি তাড়াতাড়ি করে রুমাল চাপা দিলেন মুখে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে চললেন, ‘একটা আসক্তির ব্যাপার হলেও নয় বুঝতাম। কিন্তু ভেবে চিন্তে ধূর্তামি করে আমাকে প্রতারণা… কিন্তু কার সাথে? ওকে নিয়ে আবার সেইসাথে আমার স্বামী হয়ে থাকা… এটা সাঙ্ঘাতিক! তুমি ঠিক বুঝতে পারবে না।‘
‘না না, আমি বুঝতে পারছি ডল্লি, বুঝতে পারছি’, তাঁর হাতে চাপ দিয়ে বললেন আন্না।
ডল্লি বলে চললেন, ‘আমার অবস্থা যে কি সাঙ্ঘাতিক সেটা ও বোঝে বলে তুমি ভাবছ? এক বিন্দু না! ও দিব্যি সুখে-স্বচ্ছন্দে আছে।’
‘না, না’, তাড়াতাড়ি করে বাধা দিলেন আন্না, ‘ও নেহাৎ কৃপাপাত্র, অনুশোচনায় মরছে…’
‘ওর পক্ষে অনুশোচনা কি সম্ভব?’ একদৃষ্টে ননদের মুখের দিকে তাকিয়ে বাধা দিলেন ডল্লি।
‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, আমি ওকে জানি। ওকে দেখে কষ্ট হচ্ছিল আমার! দুজনেই তো আমরা ওকে জানি। ওর মনটা ভালো, কিন্তু গর্ব আছে তো, আর এখন একেবারে হতমান… প্রধান যে জিনিসটা আমাকে নাড়া দিয়েছে’, (আন্না অনুমান করে নিলেন প্রধান কোন জিনিসটা ডল্লিকে নাড়া দিতে পারে), ‘দুটো ব্যাপার তাকে দগ্ধে মারছে : ছেলেমেয়েদের সামনে লজ্জা, আর তোমাকে ভালোবাসা সত্ত্বেও… হ্যাঁ, হ্যাঁ, দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি করে তোমাকে ভালোবাসা সত্ত্বেও’, আপত্তি করতে ওঠা ডল্লিকে তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে তিনি বললেন, ‘তোমাকেই কষ্ট দিয়েছে, তোমাকে শেষ করে ফেলেছে। ও কেবলি বলছে, ‘না, না, আমাকে ও ক্ষমা করবে না।’
চিন্তামগ্নের মত ডল্লি ননদের দিকে না তাকিয়ে তাঁর কথা শুনে যাচ্ছিলেন। বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি বুঝি যে ওর অবস্থাটা দুর্বিষহ; নির্দোষের চেয়ে দোষীর হাল হয় খারাপ, যদি সে বুঝে থাকে যে তার দোষেই এই দুর্ভাগ্য। কিন্তু কি করে ক্ষমা করি, ওই মেয়েটার পর কি করে থাকি তার স্ত্রী হয়ে? ওর সাথে থাকা এখন আমার কাছে যন্ত্রণা, ওর প্রতি আমার অতীত ভালোবাসাটা আমি ভালোবাসি বলেই…’
ফোঁপানিতে তাঁর কথা বন্ধ হয়ে গেল।
কিন্তু যতবার তিনি নরম হয়ে আসছিলেন, ততবারই যেটা তাঁকে জ্বালাচ্ছে, আবার সেই কথা বলতে শুরু করছিলেন তিনি।
‘ওর যে বয়স কম, ও যে সুন্দরী’, ডল্লি বলে চললেন, ‘আমার যৌবন, আমার রূপ কে হরণ করেছে জানো আন্না? ও আর তার ছেয়েমেয়েরা। ওর জন্য খেটে গেছি আমি, সেই খাটুনিতেই আমার সব কিছু গেছে, আর এখন তাজা, ইতর একটা প্রাণীকে মনোরম লাগবে বৈকি। ওরা নিশ্চয় নিজেদের মধ্যে আমার কথা বলাবলি করেছে, কিংবা যা আরো খারাপ, চুপ করে থেকেছে, বুঝেছ?’ আবার চোখে ওঁর ফুটে উঠল আক্রোশ, ‘আর এর পর ও আমাকে বলবে… ওকে আমি কি আর বিশ্বাস করব? কখনো না। না, যা ছিল আমার সান্ত্বনা, আমার খাটুনির পুরস্কার, যন্ত্রণা, সব চুকে গেছে… তুমি বিশ্বাস করবে কি? এই তো, গ্রিশাকে পড়াচ্ছিলাম : আগে এটা ছিল আনন্দের ব্যাপার, এখন কষ্ট। কেন আমি খাটছি, চেষ্টা করে যাচ্ছি? ছেলেপিলে নিয়ে কি হবে আমার? সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার এই যে মন আমার হঠাৎ পালটে গেছে। ভালোবাসা, কোমলতার বদলে ওর প্রতি আমার আছে কেবল আক্রোশ, হ্যাঁ আক্রোশ। আমি ওকে খুন করতে পারি…’
‘ডল্লি, বোন আমার, আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু নিজেকে কষ্ট দিও না। তুমি এত অপমানিত, এত উত্তেজিত হয়েছ যে অনেক জিনিসকে তুমি দেখছ একটু অন্যভাবে।’
ডল্লি শান্ত হয়ে এলেন, মিনিট দুয়েক চুপ করে রইলেন ওঁরা।
‘কি করা যায় আন্না, ভেবে বল, সাহায্য কর আমাকে। আমি অনেক ভেবে দেখেছি, কিন্তু পথ পাচ্ছি না।‘
আন্না কিছুই ভেবে উঠতে পারলেন না, কিন্তু ভাবীর প্রতিটা কথা, প্রতিটা মুখভাবে সরাসরি সাড়া দিচ্ছিল তাঁর হৃদয়।
এই বলে শুরু করলেন আন্না, ‘শুধু একটা কথা বলি, আমি ওর বোন, ওর চরিত্র আমার জানা, জানি ওর সব কিছু ভুলে যাবার’, (কপালের সামনে হাতের একটা ভঙ্গি করলেন তিনি), ‘এই সামর্থ্য, পুরোপুরি আসক্তি তবে আবার পুরোপুরি অনুশোচনার এই প্রবণতা। যা সে করেছে সেটা করতে পারল কিভাবে তা এখন আর তার বিশ্বাস হচ্ছে না, বুঝতে পারছে না।’
