‘হাত সামলে রাখ গ্রিশা’, বলে মা আবার তাঁর শাল বোনায় মন দিলেন। এটি তিনি বুনছেন অনেক দিন থেকে মনঃকষ্টের মুহূর্তে এটি টেনে নিতেন, এখন বুনছিলেন একটা স্নায়বিক উত্তেজনায়, আঙুল দিয়ে দিয়ে ঘর গুনছিলেন। বোন আসছেন কি আসছেন না এটা তাঁর কোন দায় নয়, কাল স্বামীকে এ কথা বলে পাঠালেও তিনি তাঁর আসার জন্য সব তৈরি করে রেখেছিলেন এবং অধীর হয়ে অপেক্ষা করছিলেন ননদের।
তাঁর নিজের দুঃখে ডল্লি একেবারে মূহ্যমান। তাহলেও তাঁর মনে ছিল যে ননদ আন্না পিটার্সবুর্গের একজন অতি নামজাদা লোকের স্ত্রী, পিটার্সবুর্গ সমাজের একজন নামীদামী মহিলা। এই পরিস্থিতির কারণে স্বামীকে যা বলে পাঠিয়েছিলেন, তা তিনি করলেন না, অর্থাৎ বললেন না যে ননদ আসছেন। ডল্লি ভাবলেন, ‘হ্যাঁ, যতই হোক, আন্নার তো কোন দোষ নেই। ওঁর মধ্যে ভালো ছাড়া মন্দ আমি কিছু দেখিনি, আর আমার সম্পর্কে তাঁর ব্যবহারে আমি কেবল প্রীতি আর বন্ধুত্বই দেখেছি।’ অবশ্য পিটার্সবুর্গে কারেনিনদের ওখানে তাঁর বসবাসের যে স্মৃতিটুকু তাঁর মনে আছে তাতে ওঁদের বাড়িটাই তাঁর ভালো লাগেনি; তাঁদের গোটা পারিবারিক জীবনযাত্রার মধ্যে কি-একটা যেন মিথ্যা ছিল। ‘কিন্তু ওঁকে গ্রহণ করব না কেন? শুধু আমাকে যেন সান্ত্বনা দিতে না আসেন’, ভাবলেন ডল্লি, ‘সমস্ত সান্ত্বনা, আর উপদেশ, আর খ্রিস্টীয় ক্ষমার কথা আমি হাজার বার ভেবে দেখেছি, ও সব কাজের কিছু নয়।
এই কয়দিন ডল্লি একা ছিলেন ছেলেমেয়েদের নিয়ে। নিজের দুঃখের কথা উনি কাউকে বলতে চাননি, আর মনের মধ্যে সে দুঃখ পুষে রেখে তিনি অন্য কিছু বলতেও পারতেন না। তাহলেও তিনি জানতেন যে আন্নাকে যে করেই হোক না কেন সব বলবেন। আর কখনো তিনি বলবেন ভেবে খুশি হচ্ছিলেন, আবার কখনো রাগ হচ্ছিল এই ভেবে যে ওঁর কাছে, স্বামীর বোনের কাছে নিজের অপমানের কথা বলতে হবে, আর তাঁর মুখ থেকে শুনতে হবে উপদেশ আর সান্ত্বনার তৈরি বুলি।
যা প্রায়ই ঘটে থাকে, উনি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে প্রতি মুহূর্তে অতিথির জন্য অপেক্ষা করছিলেন এবং ঠিক সেই মুহূর্তটাই খেয়াল করলেন না যখন অতিথি এসে গেছেন, কেননা ঘণ্টি কানে যায়নি তাঁর।
গাউনের খসখস আর ততক্ষণে দরজায় লঘু পদশব্দ শুনে তিনি ফিরে তাকালেন, তাঁর কাতর মুখে আপনা থেকেই ফুলে উঠল আনন্দ নয়, বিস্ময়। উঠে দাঁড়িয়ে তিনি আলিঙ্গন করলেন ননদকে।
চুমু খেয়ে বললেন, ‘সে কি, এর মধ্যেই এসে গেছ?’
‘তোমাকে দেখে কি আনন্দই না হচ্ছে ডল্লি!’
‘আমারও আনন্দ হচ্ছে’, ক্ষীণ হেসে এবং আন্নার মুখের ভাব দেখে তিনি জানেন কিনা সেটা অনুমান করার চেষ্টা করে ডল্লি বললেন। আন্নার মুখে সহানুভূতির ছায়া লক্ষ্য করে ভাবলেন, ‘নিশ্চয় জানে।’, ‘চল, তোমার ঘরে তোমাকে দিয়ে আসি’, বোঝাবুঝির মুহূর্তটা যথাসম্ভব পেছিয়ে দেবার চেষ্টা করে ডল্লি বললেন।
‘এই গ্রিশা? আরে, কি বড়ই না হয়ে উঠেছে!’ ওকে চুমু খেয়ে এবং ডল্লির ওপর থেকে দৃষ্টি না সরিয়ে আন্না থেমে গেলেন এবং লাল হয়ে উঠলেন, ‘না, কোথাও এখন আর যেতে চাই না বাপু।
রুমাল আর টুপি খুললেন তিনি, সবদিকে তাঁর কালো চুলেল কুণ্ডল, একগোছা আটকে গিয়েছিল টুপিতে, মাথা ঝাঁকিয়ে সেটা ছাড়ালেন।
প্রায় ঈর্ষা নিয়ে ডল্লি বলল, ‘সুখে স্বাস্থ্যে সব সময়ই জ্বলজ্বল কর তুমি।’
‘আমিঃ… তা হ্যাঁ’, বললেন তিনি, ‘আরে তানিয়া না? সৃষ্টিকর্তা! আমার সেরিওজার সমবয়সী।’ ছুটে আসা একটা মেয়েকে দেখে বলে উঠলেন আন্না, কোলে নিয়ে চুমু খেলেন তাকে। ‘কি সুন্দর মেয়ে, কি সুন্দর! দেখাও না ওদের সবাইকে।’
এক-এক করে ওদের নাম করলেন তিনি, এবং শুধু নাম নয়, কার কোন বছর, কোন মাসে জন্ম, কার কেমন স্বভাব, কি রোগে ভুগেছে এ সবই মনে করে বললেন তিনি এবং ডল্লি তার কদর না করে পারলেন না।
‘বেশ, চলুন ওদের কাছে’, ডল্লি বললেন, ‘শুধু ভাসিয়া ঘুমাচ্ছে, এটাই যা আফসোস।’
ছেলেদের দেখে এসে ওঁরা একলা ড্রয়িং-রুমে বসলেন কফি নিয়ে। আন্না ট্রে-টা নিয়েছিলেন, পরে তা সরিয়ে রাখলেন। বললেন, ‘ডল্লি, ও আমাকে বলেছে।’
শীতল দৃষ্টিতে ডল্লি তাকালেন আন্নার দিকে। এর পর ভান করা সহানুভূতির বুলি আশা করছিলেন তিনি; কিন্তু আন্না তেমন কিছু বললেন না। বললেন, ‘ডল্লি লক্ষ্মীটি, ওর হয়ে তোমাকে কিছু বলব না, সান্ত্বনা দিতে যাব না, সে অসম্ভব। কিন্তু, লক্ষ্মী আমার, শুধু কষ্ট হচ্ছে, কষ্ট হচ্ছে তোমার জন্য।’
তাঁর জ্বলজ্বলে চোখের ঘন পক্ষ্মতল থেকে হঠাৎ টলমল করে উঠল অশ্রু। তিনি ঘেঁষে বসলেন ভাবীর দিকে, নিজের ছোট্ট সজীব হাতে চেপে ধরলেন তাঁর হাত। ডল্লি সরে গেলেন না, কিন্তু বদল হল না মুখের নীরস ভাবটায়। বললেন : ‘আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে লাভ নেই। যা ঘটেছে তারপর সবই গেছে, সবই ডুবেছে।’
আর এই কথাটা বলামাত্র হঠাৎ নরম হয়ে এল তাঁর মুখভাব। ডল্লির শুকনো রোগা হাতখানা তুলে চুমু খেয়ে আন্না বললেন : ‘কিন্তু ডল্লি, কি করা যায়, কি করা যায়? এই ভয়ংকর অবস্থায় কি করলে ভালো হবে? সেটাই ভাবা দরকার।’
ডল্লি বললেন, ‘সব শেষ, সব চুকে গেছে। আর সবচেয়ে খারাপ কি জান, আমি ওকে ত্যাগ করতে পারি না; ছেলেপেলেরা রয়েছে, আমি যে বাঁধা। কিন্তু ওর সাথে ঘর করতেও আমি পারব না, ওকে দেখলেই যন্ত্রণা হয় আমার।
