‘কি মা, আপনি পুরোপুরি সুস্থ তো?’ মায়ের দিকে ফিরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন আবার।
‘সব ভালো, দিব্যি সুন্দর। আলেক্সান্দার ভারি ভালো ব্যবহার করেছে। মারিও খুব সুন্দরী হয়ে উঠেছে, ভারি মন টানে।
এবং আবার শুরু করলেন সেই কথা বলতে যাতে তাঁর সবচেয়ে বেশি আগ্রহ, অর্থাৎ নাতির খ্রিস্টদীক্ষা, যার জন্য তিনি পিটার্সবুর্গ গিয়েছিলেন, এবং বড় ছেলের ওপর জারের বিশেষ আনুকূল্যের কথা।
‘এই তো, লাভ্রেন্তি এসে গেছে’, জানালার দিকে তাকিয়ে একি বললেন, ‘আপনার অসুবিধা না হলে এবার যাওয়া যেতে পারে।
কাউন্টেসের যাত্রাসঙ্গী বৃদ্ধ খানসামা গাড়িতে উঠে জানালা যে সব তৈরি। কাউন্টেসও উঠে দাঁড়ালেন যাবার জন্য।
ভ্রনস্কি বললেন, যাওয়া যাক, এখন লোক কম।
দাসী নিল একটা থলে আর কুকুটাকে। খানসামা আর একজন মুটে নিল অন্য মালগুলো। কিন্তু মাকে বাহুলগ্ন করে ভ্রনস্কি যখন গাড়ি থেকে নামলেন, হঠাৎ ব্ৰস্ত মুখে জনকয়েক লোক ছুটে গেল পাশ দিয়ে। ছুটে গেলেন অসামান্য রঙের টুপি মাথায় স্টেশন-মাস্টারও। স্পষ্টতই অস্বাভাবিক কিছু-একটা ঘটেছে। ট্রেনের লোকেরা ছুটে গেল পেছন দিকে।
‘কি?… কি ব্যাপার?… কোথায়?… ঝাঁপিয়ে পড়েছিল!… কাটা পড়েছে!…’ যারা যাচ্ছিল তাদের মধ্যে থেকে শোনা যাচ্ছিল এসব কথা।
অবলোনস্কি এবং তার বাহুলগ্না বোনও ভীত মুখে লোকেদের ফেলে রেখে ফিরে এসে দাঁড়ালেন ওয়াগনের সামনে।
মহিলারা গাড়িতে উঠলেন এবং ভ্রনস্কি আর অবলোনস্কি লোকেদের পিছু পিছু গেলেন দুর্ঘটনার বিশদ খবর জানতে।
একজন পাহারাওয়ালা, হয় সে ছিল মাতাল নয় প্রচণ্ড শীতের জন্য এত বেশি জামা-কাপড় জড়ানো যে পেছন দিকে যাওয়া ট্রেনের শব্দ শুনতে পায়নি, এবং চাপা পড়ে।
ভ্রনস্কি আর অবলোনস্কি ফেরার আগেই মহিলারা এ খবর জানতে পান খানসামার কাছ থেকে।
অবলোনস্কি আর ভ্রনস্কি দুজনেই দেখেছিলেন বিকৃত লাশটা। স্পষ্টতই অবলোনস্কির কষ্ট হচ্ছিল। চোখ-মুখ কুঁচকে ছিলেন তিনি, মনে হল এই বুঝি কেঁদে ফেলবেন।
‘উহ্ কি বীভৎস! উঁহু, আন্না, তুমি যদি দেখতে! উহ্ কি বীভৎস!’ বলছিলেন তিনি।
ভ্রনস্কি চুপ করেছিলেন, তার সুন্দর মুখ গম্ভীর, তবে প্রশান্ত।
উহ, আপনি যদি দেখতেন কাউন্টেস’, বললেন অবলোনস্কি, বউ গিয়েছে সেখানে,.. তার দিকে তাকিয়ে দেখতেও ভয় হয়… লাশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে সে। লোকে বলছে, লোকটার একার রোজগারে বিরাট একটা সংসার চলতো। কি ভয়ঙ্কর?
‘ওর জন্য কিছু-একটা করা যায় না?’ বিচলিত হয়ে কারেনিনা বললেন ফিসফিস করে।
ভ্রনস্কি তার দিকে তাকিয়ে তখনই নেমে গেলেন গাড়ি থেকে।
দরজার কাছে মুখ ঘুরিয়ে বললেন, ‘আমি এখনই আসছি মা।’
কয়েক মিনিট পরে উনি যখন ফিরলেন, অবলোনস্কি তখন কাউন্টেসকে নতুন গায়িকার কথা বলছিলেন আর ছেলের প্রতীক্ষায় কাউন্টেস অধীর হয়ে তাকাচ্ছিলেন দরজার দিকে।
ভেতরে ঢুকে ভ্রনস্কি বললেন, ‘এবার চলি।’
সবাই বেরোলেন একসাথে। মাকে নিয়ে ভ্রনস্কি চললেন আগে আগে। পেছনে ভাইয়ের সাথে কারেনিনা। ফটকের মুখে ভ্রনস্কিকে ধরলেন স্টেশন-মাস্টার।
‘আমার অ্যাসিস্টেন্টকে আপনি দু’শ রুল দিয়েছেন। দয়া করে বলুন এটা কার জন্য।
‘বিধবার জন্য, কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন ভ্রনস্কি, এ আবার জিজ্ঞেস করার কি আছে?
‘আপনি দিয়েছেন?’ পেছন থেকে চেঁচিয়ে উঠলেন অবলোনস্কি এবং বোনের হাতে চাপ দিয়ে যোগ করলেন, ‘খুব ভালো করেছেন, খুব ভালো করেছেন! ভারি ভালো ছেলে, তাই না? আমার শ্রদ্ধা রইল কাউন্টেস।
বোনের সাথে তিনি থেমে গিয়ে খুঁজতে লাগলেন কারেনিনার দাসীকে।
যখন তারা বেরোলেন, ভ্রনস্কির গাড়ি ততক্ষণে ছেড়ে গেছে। যারা বেরিয়ে আসছিল, তারা তখনো বলাবলি করছিল দুর্ঘটনাটা নিয়ে।
‘দেখো কেমন বীভৎস মরণ!’ পাশ দিয়ে যেতে যেতে কে একজন বলল, ‘শুনছি, দু’টুকরো হয়ে গেছে।
আরেকজন বলল, আমি উল্টো মনে করি, এই তো সবচেয়ে সহজ, তৎক্ষণাৎ মৃত্যু।
‘ওরা ব্যবস্থা নেবে না কেন?’ বলল তৃতীয় জন।
কারেনিনা গাড়িতে বসলেন, অবলোনস্কি অবাক হয়ে দেখলেন তার ঠোঁট কাঁপছে, চোখের পানি চেপে রেখেছেন বহু কষ্টে।
কিছু দূরে যাবার পর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি হল তোমার, আন্না?’
আন্না বললেন, এটা একটা অলক্ষণ।
অবলোনস্কি বললেন, ‘যত বাজে কথা! তুমি এসেছ এটাই প্রধান ব্যাপার। তোমার ওপর কত যে ভরসা করে আছি ভাবতে পারবে না।’
আন্না জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, এই ভ্রনস্কি তোমার অনেক দিনের চেনা?
‘হ্যাঁ। জানো, আমরা আশা করছি ও কিটিকে বিয়ে করবে।’
‘তাই নাকি? আস্তে করে বললেন আন্না, তারপর যেন অনাবশ্যক অসুবিধাজনক কিছু-একটাকে দেহ থেকে ঝড়ে ফেলার জন্য মাথা ঝাঁকিয়ে যোগ দিলেন, এবার কোতার কথা শোনা যাক। বল কি তোমার ব্যাপার। তোমার চিঠি পেয়ে এই চলে এলাম।
হ্যাঁ, তোমার ওপরেই সব ভরসা’, বললেন অবলোনস্কি।
‘তা, সব আমাকে বল।
অবলোনস্কি বলতে শুরু করলেন।
অবলোনস্কি বাড়ি এসে বোনকে নামিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তার হাতে চাপ দিয়ে অফিসে চলে গেলেন।
উনিশ
ডল্লি যখন ছোট ড্রয়িং-রুমটায় বসেছিলেন শণচুলো গোলগাল একটা খোকার সাথে—শুনছিলেন তার ফরাসি ভাষার পাঠ, আন্না তখন ভেতরে ঢুকলেন। ছেলেটি এখন হয়ে উঠেছে তার বাবার মতই দেখতে। ছেলেটি পড়ছিল আর জামার একটা আলগা বোতাম পাকিয়ে পাকিয়ে টেনে ছেঁড়ার চেষ্টা করছিল। কয়েক বার তার হাত সরিয়ে দিয়েছেন ডল্লি, কিন্তু গোলমাল হাতটা আবার এসে ঠেকেছে সেখানে। মা বোতামটা ছিঁড়ে রেখে দিলেন নিজের পকেটে।
