জনতা ভাগ হয়ে কজ্নিশেভকে যাবার পথ করে দিলে। বিষজিহ্ব অভিজাতের বক্তৃতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে তিনি বললেন যে তাঁর মনে হচ্ছে আইনের ধারাটা দেখাই ভালো, সেক্রেটারিকে অনুরোধ করলেন ধারাটা বার করতে। ধারায় লেখা ছিল, মতদ্বৈধ ঘটলে ব্যালট ভোট নিতে হবে।
কজ্নিশেভ ধারাটা পড়ে শুনিয়ে তার ব্যাখ্যা করতে শুরু করলেন। কিন্তু এই সময় আঁটো উর্দি পরা এক লম্বা, মাটা, কোলকুঁজো জমিদার, পিঠের দিক থেকে কলারটা যাঁর ঘাড়ে গেঁথে বসেছে, মোচে যাঁর কলপ দেওয়া, তিনি বাধা দিলেন। টেবিলের কাছে এসে তাতে তিনি তার আংটি ঠুকে চেঁচিয়ে উঠলেন।
‘ব্যালট! ভোট! কথা বলে কোন ফায়দা হবে না! ভোট!’
এই সময় হঠাৎ আরো কয়েকটা গলা শুনা গেল। আংটি পরা লম্বা ভদ্রলোকটি ক্রমেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে চেঁচাতে লাগলেন সবার চেয়ে উচ্চকণ্ঠে। কিন্তু কি তিনি বলছেন সেটা বোঝা যাচ্ছিল না।
কজ্নিশেভ যা বলেছিলেন, তিনিও বলছিলেন তাই-ই কিন্তু বোঝা গেল, কজ্নিশেভ এবং তার গোটা দলটার উপর তিনি রুষ্ট, এ রোষ পরিব্যাপ্ত হচ্ছিল সমস্ত দলটায় এবং অপর পক্ষ থেকে একই রকম যদিও অনেক শিষ্টতা সম্মত আক্রোশের উদ্রেক করছিল। শুরু হল চেঁচামেচি এবং মুহূর্তের মধ্যে এমন তালগোল পাকিয়ে উঠল যে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য অনুরোধ করতে হল গুবেনির্য়া প্রমুখকে।
‘ব্যালট, ব্যালট! যে অভিজাত, সেই এটা বুঝবে। আমারা রক্ত দিই… মহারাজের আস্থা.. অভিজাত মুখের ইসাব-পরীক্ষা হবে না। উনি হিসাবনবিশ নন…আরে, সেটা কোন প্রশ্ন নয়…ভোট! নোংরামি!… শোনা গেল চারদিক থকে ক্ষিপ্ত আক্রোশের চিৎকার। দৃষ্টি আর মুখের ভাব ছিল তাদের কথার চেয়েও বেশি ক্ষিপ্ত ও আক্রোশপরায়ণ। মাপোসহীন বিদ্বেষ প্রকাশ পাচ্ছিল তাতে। লেভিন একেবারেই বুঝতে পারছিলেন না, ব্যাপারটা কি নিয়ে, ফ্লেভ ম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভোট নেওয়া হবে কি হবে না, এ প্রশ্নটা যে উত্তেজনায় বিতর্কিত হচ্ছিল তাতে অবাক লাগল তাঁর। যে ন্যায়সূত্র অনুসারে কজ্নিশেভ পরে তাঁকে যা বুঝিয়েছিলেন, যথা—সাধারণ কল্যাণের জন্য গুবের্নিয়ার মভিজাতপ্রমুখকে পদচ্যুত করা দরকার। আর পদচ্যুত করার জন্য ভোট পাওয়া চাই সংখ্যাধিক্যে; সংখ্যাধিক ভোটের জন্য ফ্লেরভকে ভোটদানের অধিকার দেওয়া প্রয়োজন; আর ফ্লেরভকে অধিকারী বলে স্বীকৃতি করাতে হলে আইনের ধারাটা ব্যাখ্যা করা আবশ্যক। সেটা তাঁর মনে ছিল না।
‘একটা ভোটেই সমস্ত ব্যাপারটার ফয়সালা হয়ে যেতে পারে, সমাজসেবায় লাগতে চাইলে এ ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া, সঙ্গতিশীলতা অনুসরণ করা উচিত’, উপসংহার টেনেছিলেন কজ্নিশেভ।
সেটা কিন্তু লেভিনের খেয়াল ছিল না। এসব সজ্জন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের এমন বিশ্রী, ক্রুদ্ধ উত্তেজনায় দেখা তার পক্ষে কষ্টকর হচ্ছিল। কষ্টটা থেকে রেহাই পাবার জন্য তিনি বির্তকের অবসান পর্যন্ত অপেক্ষা না করেই বেরিয়ে গেলেন ছোট হলে। সেখানে ব্যুফের কাছে পরিচারকরা ছাড়া আর কেউ ছিল না। বাসন মোছা এবং ডিশ ও পানপাত্রগুলিকে যথাস্থানে রাখায় ব্যস্ত পরিচারকদের দেখে তাদের শান্ত সজীব মুখ লক্ষ করে অপ্রত্যাশিত একটা লঘুতা বোধ করলেন লেভিন, যেন গুমোট একটা ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন খোলা বাতাসে। সন্তষ্ট চিত্তে পরিচারকদের দিকে তাকিয়ে তিনি পায়চারি করতে লাগলেন আগুপিছু। একজন পরিচারকের পাকা গালপাট্টা, তাকে টিটকারি দিচ্ছিল যে, অল্পবয়সীরা অবজ্ঞাভরে তাদের সে যেভাবে ন্যাপকিন ভাঁজ করা শেখাচ্ছিল, সেটা ভারি ভালো লাগল লেভিনের। বৃদ্ধের সাথে লেভিন কথা বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় অভিজাতদের অছিগিরি সংক্রান্ত সজীব এক বৃদ্ধ যার দায়িত্বে গুবের্নিয়ার সমস্ত অভিজাতদের নাম ও পিতৃনাম জেনে রাখা, তিনি এগিয়ে এসে বললেন, ‘বড় ভাই আপনাকে খুঁজচ্ছেন, কনস্তান্তিন দ্দ্মিত্রিচ। ভোট শুরু হচ্ছে।’
লেভিন হলঘরে এলেন, পেলেন সাদা বল, বড় ভাই কজ্নিশেভের পেছনে পেছনে গেলেন টেবিলের কাছে। সি্ভ্য়াজস্কি সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন একটা গুরুগম্ভীর বিদ্রূপাত্মক মুখে, দাড়ি মুঠো করে তা শুকছিলেন। কজ্নিশেভ বাক্সে হাত ঢোকালেন—কোথায় যেন রাখলেন নিজের বলটা, লেভিনের জন্য পথ ছেড়ে দিয়ে কজ্নিশেভকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায় ফেলব?’ জিজ্ঞেস করেছিলেন তিনি আস্তে করে আশেপাশের লোকেরা যখন কথা বলছিল। তিনি আশা করেছিলেন যে তার প্রশ্নটা কারো কানে যাবে না। কিন্তু যারা কথা বলছিল, চুপ করে গেল তারা অন্যায় প্রশ্নটা তাদের কানে গিয়েছিল। ভুরু কোঁচকালেন কজ্নিশেভ।
কঠোর স্বরে তিনি বললেন, ‘এটা প্রত্যেকের নিজ নিজ মতামতের ব্যাপার।’
কেউ-কেউ হেসে ফেললেন। লাল হয়ে উঠলেন লেভিন, আচ্ছাদনের তলে হাত ঢুকিয়ে বলটা ফেললেন ডান বাক্সে। কেননা বলটা ছিল তার ডান হাতে। বলটা ফেলার পর তার স্মরণে এল যে হাতটাই ঢোকানোর কথা। ঢোকালেন কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গিয়েছিল, আরো বেশি থতমত খেয়ে চলে গেলেন একেবারে পিছনের সারিতে।
পক্ষে একশ ছাব্বিশ নির্বাচক, বিপক্ষে আটানব্বই অনির্বাচক! শোনা গেল ‘র’ উচ্চারণে অক্ষম সেক্রেটারির গলা। পরে উঠল হাসি। বাক্সে পাওয়া গেছে বোতাম আর দুটো বাদাম। ভোটের অধিকার পেলেন ফ্লেভ, জিতল নতুন দল।
